বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

বিজয় দিবসটি একান্তভাবে বাঙালির

আপডেট: December 13, 2019, 1:31 am

নিজস্ব প্রতিবেদক


বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেরই স্বাধীনতা অথবা জাতীয় দিবস আছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা দিবস তো আছেই তার সাথে আছে একটি বিজয় দিবস, যা অন্য কোনো দেশের আছে বলে জানা নেই। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ব্যতিক্রমি ঘটনা এবং তার একান্ত নিজস্ব। যে কোনো বিষয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে পরিশ্রম, ত্যাগ স্বীকার আর দীর্ঘ প্রস্তুতি নিতে হয়। এসবের সাথে বাংলাদেশের এই বিজয় ছিনিয়ে আনতে দেশের ত্রিশ লাখ মানুষকে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে, আড়াই লাখ মা-বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। এ বিজয়টা দেশের বিজয়, এ বিজয়টা দেশকে দখলদার পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের হাত হতে মুক্ত করার বিজয়, এই বিজয় দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিজয়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মানুষ এই বিজয়ের ৪৮ বছর পূর্তি উদযাপন করবে। বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও যখন দেশ এই বিজয় দিবস উদযাপন করবে তখন যে দলটির নেতৃত্বে দেশের মানুষ একাত্তরে দেশকে মুক্ত করতে যুদ্ধে গিয়েছিল সেই দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায়। এই কয়েক বছর এটি অনেকটা বাংলাদেশের মানুষের বাড়তি পাওনা, কারণ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে নিয়মমাফিক স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস পালন করা হয়েছে ঠিক কিন্তু তাতে এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের মূল অনুভূতি বা স্পিরিট উপস্থিত ছিল না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে প্রথমে যে কাজটি করেন তা হচ্ছে আমাদের পবিত্র সংবিধানের মূল ভিত্তি বলে যাকে স্বীকার করা হয় সেই সংবিধানের প্রস্তাবনাকেই পাল্টে ফেলেছিলেন। ১৯৭২-এর সংবিধানের প্রস্তাবনায় শুরুতেই লেখা ছিল ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি।’ জিয়া ১৯৭৮ সালে এক আদেশ বলে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ পরিবর্তে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের’ শব্দ কয়টি প্রতিস্থাপন করেন। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে সংবিধানের সেই যে ব্যবচ্ছেদের শুরু তা জিয়ার শেষ দিন পর্যন্ত চলেছে। তার মৃত্যুর পর এরশাদও তা মোটামুটি বজায় রাখেন। জিয়ার এই ব্যবচ্ছেদের একমাত্র কারণ ছিল বাঙালির দীর্ঘদিনের ‘মুক্তির জন্য সংগ্রামকে’ অস্বীকার করা এবং এটি স্থাপিত করা যে বাঙালির ইতিহাসের শুরু একাত্তরে ২৭ মার্চ যখন তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। তিনি স্বজ্ঞানে বাঙালির দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের ইতিহাসকে অস্বীকার করার অপচেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাস পাল্টানোর চেষ্টা এক ধরনের চরম মূর্খতা ।
১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত বাঙালির এই দীর্ঘ পথচলাকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পরবর্তীকালের সকল শাসক। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এলে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে পালন শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের পুনরায় ক্ষমতায় ফিরাটাও ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফেরার এমন দৃষ্টান্ত শুধু উপমহাদেশেই নয় খুব কম দেশেই পাওয়া যাবে। বিজয় দিবস শুধু একটি দিন নয়। এদিনটি আমাদের পিছনে ফিরে তাকানোর দিন। আজ থেকে ৪৮ বছর আগে বাঙালি কেন যুদ্ধে গিয়েছিল সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার দিন। এটি বাঙালির জাতিসত্তার পুনঃআবিষ্কারের দিন। এটি অতীত ভুল-ভ্রান্তি হতে শিক্ষা নেয়ার দিন। এটি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের ঋণের কথা স্বীকার করার দিন। ২০১৪ সালের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে সকল শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
সূত্র: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুল মান্নানের প্রবন্ধ সংক্ষেপ