বিটিভি’র পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র অনুমোদনে উদ্বেলিত রাজশাহীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন ।। বিকশিত হবে সংস্কৃতি, ঘটবে কর্মসংস্থান

আপডেট: মার্চ ১৭, ২০১৭, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


রাজশাহীতে বিটিভির পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র একনেকে অনুমোদন হওয়ায় উদ্বেলিত রাজশাহীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের কারণে সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নতুনভাবে স্বপ্ন দেখছেন। তাদের প্রত্যাশা, পূর্নাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপিত হলে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধশালী রাজশাহীর পরিচিতি সারা দেশসহ পুরো বিশ্বে নতুন মাত্রা পাবে। আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান ঘটবে বিপুলসংখ্যক সংস্কৃতিকর্মী, কলা-কুশিলব ও এ অঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠির।
জানা গেছে, রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্রের আন্দোলন শুরু হয় ১৯৯০ সালে। রাজশাহীর সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সে সময় আন্দোলনকারীদের অভিনব কর্মসূচি সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। তাদেরকে এ আন্দেলেনের সাথে সম্পৃক্ত করে। ওই সময়ের কর্মসূচির মধ্যে ছিল নগরীতে ১৫ মিনিটের সর্বাত্মক হরতাল, বিভিন্ন পেশাজীবীদের ধর্মঘট ও হরতাল, এক মিনিটের জন্যে রাজশাহী স্তব্ধ ইত্যাদি।
আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে তৎকালীন সরকার রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টুডিও স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই সময় নগরীর কাজিহাটায় পুরাতন আনসার ক্যাম্প মাঠে ৩.৮৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণের পর আর কোন অগ্রগতি হয় নি। সিদ্ধান্তটি আর বাস্তবায়ন করে নি তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এরপর ২০০১ সালের ১৩ জুন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ টেলিভিশন রাজশাহী উপকেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন। ওই সময় তিনি এ উপকেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন স্টেশনে রূপান্তর করা হবে বলেও ঘোষণা দেন।
এরপর ২০১০ সালের এপ্রিলে মাসে অনুষ্ঠিত তথ্য মন্ত্রণালয় সস্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ টিভি স্টেশন স্থাপনের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পরের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শেষে রাজশাহীতে একটি পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন স্টেশন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এরপর পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে। সর্বশেষ এই স্টেশনটি পূর্ণাঙ্গ করার জন্য ২০১৪ সালের মাঝামাঝি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এদিকে পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় রাজশাহীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস। রাজশাহীর বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যভিনেতা ও রাজশাহী শিল্পকলা অ্যাকাডেমির সাবেক কালচারাল অফিসার আবদুর রশিদ বলেন, রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ আন্দোলনের কর্মসূচিগুলো ছিলো অভিনব। এ আন্দোলনের সঙ্গে প্রথম থেকেই সম্পৃক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে থেকে উৎসাহ যুগিয়েছেন। সোচ্চার কণ্ঠে দাবি তুলেছেন রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনের। একারণে আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপিত হলে এ এলাকার সংস্কৃতিকর্মীরা কাজের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটবে।
নাট্য আন্দোলন মঞ্চ, রাজশাহীর আহবায়ক কামার উল্লাহ সরকার কামা বলেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে রাজশাহী সমৃদ্ধ একটি শহর। পুরাতন বিভাগীয় শহর হওয়াতে রাজশাহীর হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপিত হবার সিদ্ধান্তে আমরা গর্বিত। এর ফলে রাজশাহীর সংস্কৃতি বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশ, প্রচার ও প্রসার ঘটবে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও রাজশাহীর সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। ১৯৯০ সাল থেকে এ দাবির জন্য রাজশাহীবাসী আন্দোলন করছেন। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার রাজশাহীবাসীর এ দাবিকে সম্মান করে নি। ২০০১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রথম উপকেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। সর্বশেষ তিনি পূর্ণাঙ্গ টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছেন। একারণে রাজশাহীর মানুষের পক্ষ থেকে আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদে রাজশাহী অঞ্চলের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) রাজশাহীসহ ৫টি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র স্থাপনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। চলতি মাসের ১৪ মার্চ মঙ্গলবার রাজধানীর শেরে বাংলানগর এনইসি সম্মেলনকক্ষে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়।
বৈঠক শেষে পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তাফা কামাল প্রেস ব্রিফিঙে অনুমোদিত প্রকল্প সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের ৫টি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের আওতায় চিন সরকারের আর্থিক সহায়তায় রাজশাহীসহ রংপুর, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে বিটিভির পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে চিন সরকার দেবে ৯৮৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বাকি ৪০২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বাংলাদেশ সরকার যোগান দেবে। ২০১৭-২০২২ মেয়াদে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শেষ হবে।