বিদ্যাসাগরের অবদান

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২২, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


আমার বয়স ছ বছর তিন মাস চৌদ্দদিন পূর্ণ হবার সময় দেশ ভাগ হয়ে গেল। এর মূলে ছিলো ধর্মীয় সংস্কৃতির জটিল সমস্যা। তখন বোঝার বয়স হয়নি। পরে সামান্য বুঝেছি। আমার বাবা ছিলেন শিক্ষক। আমাদের পরিবার ছিলো শিক্ষাসংশ্লিষ্ট। আমার অগ্রজ-অগ্রজারা সন্ধ্যা হলেই হারিকেন জ্বালিয়ে পাটিতে বসে পড়তে বসতেন। আমিও তাদের সঙ্গ দিতাম। আমার মাথার ওপরের সবাই চলে গেছেন। আমি কেবল বাকি আছি। কে জানে, কখন নিষ্প্রভ হয়ে আসবে দৃষ্টির সামনের সামান্য আলো।

একটা হারিকেনে, আমি উটকোসহ, চারজনে পড়াশোনা বিঘ্নিত হবার জন্য কোন্দল হতো। মাঝে মাঝে বাবা এসে আমাদের কিছু উপদেশের কথা বলতেন। বলতেন বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত তাঁর পাঠের ইতিহাস। বলতেন, দারিদ্র্য লাঞ্ছিত জীবনে রাজপথের বারোয়ারি আলোয় কিভাবে পাঠ সমাপণ করতেন বিদ্যাসাগর। মনে হতো সেকি কিংবদন্তি; নাকি সত্য; এখন বুঝছি, তা ছিলো সত্যেরও অধিক। যা বোঝা বা বোঝানো কঠিন।

২০২০ সালে বিদ্যাসাগরের জন্ম দ্বিশতবর্ষ অতিক্রান্ত হয়েছে, সেপ্টেম্বরে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। প্রাকৃতিক করোনা নাকি মানসিক দৈন্য, তার পরিসংখ্যান কে নেবে! অথচ তিনি হতে পারতেন করোনা নিবারণের অন্যতম চাবিকাঠি। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি বর্ধমানের ম্যালেরিয়া ক্লিস্ট মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, মানবধর্ম কাকে বলে। জমিদারের আহ্বানকে আমল না দিয়ে দরিদ্র মুসলিম পল্লীতে অবস্থান নিয়ে তিনি সেবাধর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাছাড়া কলকাতা থেকে দূরে কর্মটাড় স্টেশনের সাঁওতাল পল্লীতে ঘরবানিয়ে প্রকৃত মাটির সন্তানদের সান্নিধ্যে অনাড়ম্বর জীবন যাপনের অকৃত্রিম স্বাদ পেতে চেয়েছিলেন তিনি।

কোনো ধর্মের প্রতি বিদ্যাসাগরের প্রগাঢ় আকর্ষণ ছিলো- তা বুঝা কঠিন। তবে তিনি যে মানবধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তা তাঁর সারাজীবনের কর্মধারা অনুসরণ করলে সহজেই বুঝা যায়। কর্মজীবনের শেখর পর্যায়ে উন্নীত হবার অধিক বিলম্ব ছিলোনা তাঁর। তিনি অতি অল্প বয়সেই (মাত্র ৩১ বছর বয়সেই) সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। মানুষকে ভালোবাসা এবং মানবাধিকার রক্ষার পথ থেকে বিচ্যুত হলে তাঁর জন্য শেখর পদ অবধারিত ছিলো। তিনি আত্মতৃপ্তিতে আপোস করেননি।

নিশ্চিত প্রায় অনাহার বরণ করার পালা তিনি শুরু করেছিলেন, জীবন-সূচনা থেকেই। মাছ-মাংস-দুধ তিনি গ্রহণ করেননি। এটা ছিলো তাঁর নিজস্ব বিবেচনা-যে, এতে অনেকটা অধিকার হরণ করা হয়। এখন প্রায় সব সমাজসেবী মানবসেবার নামে মানুষের রক্ত পান করে। রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের চারিত্র মাহাত্ম্য অবলোকন করে মিথ্যা বলেন নি: “আমাদের এই অবমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন অখ- পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, আমরা বলিতে পারিনা।”

রবীন্দ্রনাথ কবি, তিনি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিদ্যাসাগরের চারিত্রমাহাত্ম্য অনুধাবন করে ‘অক্ষয় মনুষ্যত্বের অধিকারী’ ব্যক্তির বাংলার মাটিতে জন্ম সম্পর্কে বিস্মিত হয়েছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর চরিত্রের মাহাত্ম্য তাকে মহিমান্বিত করেছে।

সমাজ ও জীবনের অগ্রগতির জন্য যে-সব বিষয় তিনি অগ্রগণ্য মনে করেছিলেন, তার মধ্যে ছিলো শিক্ষা ও নারী। জীবন কেন্দ্রিক শিক্ষাকে তিনি ছোট করে দেখার সুযোগ রাখেননি। তাঁর বেড়ে ওঠার কালে বাংলাদেশে শিক্ষায় ইংরেজি জানার তেমন সুযোগ ছিলোনা। বলতে গেলে নিজ চেষ্টায় তিনি ইংরেজি শিখেছিলেন, আর সংস্কৃত শিখেছিলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তথা সংস্কৃত কলেজের শিক্ষক সমভিব্যবহারে। মাতৃভাষার বাইরে দুটি ভাষা শেখার সুযোগ তিনি পান। সংস্কৃত এবং ইংরেজি ছাড়া আরবি ভাষার বৈশিষ্ট্য তিনি আয়ত্ত করেছিলেন বলে উৎকৃষ্ট শিল্পসম্মত বাংলাভাষার ‘যথার্থ প্রথম শিল্পী’ হওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ২৪শে ভাদ্র মেদিনীপুরে বিদ্যাসাগর স্মৃতিমন্দির রচনা কালে লিখেছিলেন:
“হে বিদ্যাসাগর, পুর্ব দিগন্তের বনে উপবনে
নবউদ্বোধনগাথা উচ্ছসিল বিস্মিত গগণে।
যে বাণী আনিল বহি নিষ্কলুষ তা শুভরুচি,
সকরুণ মাহাত্ম্যের পূণ্য গঙ্গাস্নানে তাহা শুচি।
ভাষার প্রাঙ্গনে তব আমি কবি তোমারি অতিথি
অবিস্মরণীয়। দেশ, পত্রিকা, ২রা পৌষ ১৩৬১।
রবীন্দ্রবাণী যে অমূলক ছিলো না, তার প্রমাণ নতুন করে দেয়ার প্রয়োজন আছে কী?
আধুনিক বাংলা ভাষার বয়স এবং অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। একটা বিষয় বোধকরি কেউ অস্বীকার করে না যে বিদ্যাসাগর ভাষাকে অস্বাভাবিক করে গেছেন।

‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ চারটি শব্দের সমন্বয়ে বিদ্যাসাগর এমন হৃদয়সংবেদী রূপ উপস্থাপন করেন, যা নিয়ে মানুষ এখনো সংশয়ে থাকেন। রচনাটি কার! রবীন্দ্রনাথের নয় তো! বর্ণ পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে তিনি বাংলাভাষার মাহাত্ম্য যেভাবে তুলে ধরেন তার তুলনা তিনি নিজেই। তাইতো কবি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘ভাষার প্রাঙ্গণে আমি তব কবি তোমারি অতিথি।’ উনিশ শতকের ব্যক্তির ইতিহাসকে সামাজিক উপন্যাসে উজ্জীবনকারী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দুঃখ করে বলেছিলেন, বাঙালি, বিশেষ করে নারী সমাজের জন্য বিদ্যাসাগর যা করেছিলেন, তার তুলনা কোথায়? অথচ ধর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করা মানুষ যে পরিমাণ সমাদর পান, বিদ্যাসাগর তা পাননি। এর মূল কারণ, মানুষ অলীক বিষয় নিয়ে যে পরিমাণ আত্মক্ষয় করে, বাস্তব জীবন গড়ার পরিধিতে ততখানি মূল্য দেয়না।

বিদ্যাসাগর উনিশ শতকে নারী মুক্তির নীরব আন্দোলনে যে শ্রম দিয়েছিলেন, তার প্রকৃত সম্মান তাঁকে দেয়া যায়নি। এখানেই আমাদের দুর্বলতা দৃশ্যমান। আমরা অলৌকিকতা নিয়ে জীবনের সাথে ধস্তাধস্তি করি, বাস্তব নিয়ে ততটুকু করিনা। বিদ্যাসাগর বাস্তব জীবনের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। তিনি কতখানি কামিয়াব হয়েছেন, তা হয়তো মেপে বোঝানো যাবেনা; কিন্তু জীবন যে জীবনই, তা তিনি প্রমাণ করে গেছেন, সাধারণ্যে শেষ জীবন কাটিয়ে। বিদ্যাসাগর নারীকে যথাযথ সম্মান দিয়েছেন। তিনি তাঁর কষ্টার্জিত সম্পদের প্রায় অর্ধাংশ ছেলের স্ত্রীকে ওয়াকফ করে যান, যেন পারিবারিক বিড়ম্বনায় না পড়ে পুত্রবধু। কেবল কাছের আত্মীয় নয়, দূর সম্পর্কের আত্মীয়ারাও তাঁর দানের অংশীদার ছিলেন।

শিক্ষা, বিশেষ করে গ্রামীণ নারী শিক্ষা বিষয়ে তাঁর অবদান সর্বজনীন। আমরা আজ বাতাসের মধ্যে অবস্থান করে যেমন বাতাসের অবদান বুঝিনা, তেমনি এই যে নারী শিক্ষার সুলভতা, তা তো বিদ্যাগরের নিঃস্বার্থ অবদান। তাঁকে সামনে রেখে সমকাল তেমন মুখর হয়নি। তবে রবীন্দ্রনাথ অন্তর থেকে যে প্রয়াস পেয়েছিলেন তাঁকে সামনে রেখে, তাই দিয়ে আমাদের শূন্যতা পূরণ করে যাচ্ছি।

বিদ্যাসাগরের সামনে মানবধর্ম সবচেয়ে বড় ছিলো বলে প্রচলিত ধর্মের প্রতি তেমন মনোযোগী হননি। তবে বিধবা বিবাহ বিষয় তিনি ধর্মবিষয়ক গ্রন্থগুলো এফোঁড়-ওফোঁড় করতে ছাড়েন নি। এতে তথাকথিত ধর্মরক্ষার ধ্বজাধারীদের আক্রোশ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন নি। এখনো নানা আকৃতিতে সে আক্রোশ প্রদর্শিত হয়। অথচ তাঁর রচিত শিক্ষা পরিবেশক বাংলা বই যে অসামান্য ছিলো তা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

শৈশবে আমি বিদ্যাসাগরে মোহিত ছিলাম। আজও বিদ্যাসাগর স্মরণে আছি, মানব কল্যাণে তাঁর নিঃস্বার্থ অবদানের জন্য। আগেই বলেছি, তিনি প্রচলিত ধর্মের পথে ধাবিত হননি। যে জীবন তিনি পেয়েছিলেন, প্রাকৃতিক বন্ধনে তাকে কিভাবে যথার্থ করা যায়, তাই ছিলো তাঁর সমগ্রজীবনের সাধনা। আমরা মূঢ় তাই তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দিতে পারিনি। আজকের দিনে তাই বোধকরি আমাদের বড়ো ভাবনার বিষয়।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ