বিধি লঙ্ঘন করে সেমি ডিপটিউবওয়েল চালানোর অভিযোগ ।। বিএমডিএ’র তদন্ত শুরু

আপডেট: জুন ৭, ২০১৭, ১:১১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে সেমি ডিপটিউবওয়েল চালানো হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের অসাধু কয়েকজন কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে ডিপটিউবওয়েলটি চলমান রয়েছে। সেমি ডিপটিউবওয়েলে সংশ্লিষ্ট বিদুৎ বিভাগ নির্ধারিত যে মানের হর্স পাওয়ার ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ বিভাগকে বিলের টাকা ফাঁকি দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সেমি ডিপটিউবওয়েলের মালিক। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধিকরণ শাখা-১ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নির্বাহী পরিচালককে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার জোতজয়রাম মৌজার তালপুকুর নামক স্থানে বিধি লঙ্ঘন করে সেমি ডিপটিউবওয়েল স্থাপনের এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার প্রতিকার চেয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে ওই এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম এর প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বরেন্দ্র অঞ্চলের পাঁচটি উপজেলায় গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এরপরে ২০১৪ সালের জুনে জোতজয়রাম মৌজায় হুমায়ুন কবির নামের এক ব্যক্তি অগভীর নলকূপ স্থাপন করেন। এ নলকূপের আওতায় তিনি ওই এলাকার বিভিন্ন কৃষকের দেড়শ বিঘা জমিতে পানি সরবরাহ শুরু করেন। এছাড়া অগভীর নলকূপে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত হর্স পাওয়ার বিদ্যুৎ ব্যবহারের সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তা লঙ্ঘন করে এ অগভীর নলকূপটিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ২৫ হর্স পাওয়ার বিদ্যুৎশক্তি।
অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, উপজেলায় মোট গভীর ও অগভীর নলকূপ রয়েছে ৯৬টি। সেচকার্যে ব্যবহৃত অগভীর নলকূপের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ২টাকা ৮১ পয়সা বিদ্যুৎ বিল নির্ধারিত রয়েছে। অগভীর নলকূপটি ২০১৪ সালের জুনে স্থাপনের পর থেকে ৯৪ হাজার ৩৬০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। কিন্তু গভীর নলকূপের ২৫ হর্স পাওয়ার বিদ্যুৎশক্তি ব্যবহার করায় বিদ্যুৎবিল বাণিজ্যিকভাবে নির্ধারিত হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু গভীর নলকূপের হর্স পাওয়ার (২০ এর ওপর হর্স পাওয়ার) ব্যবহার করার পরেও হুমায়ুন কবির অগভীর নলকূপের নির্ধারিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছেন। অগভীর নলকূপের হর্স পাওয়ার দেখিয়ে তিনি উল্লিখিত ইউনিটের বিপরীতে বিদ্যুৎ বিভাগকে তিন লাখ ৭৫ হাজার চারশ ৮৫টাকা ফাঁকি দিয়েছেন। এছাড়া হুমায়ুন কবির উপজেলার কদমহাজির মোড়ে তার দোকানে তিন হর্সপাওয়ার পাম্প স্থাপন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রতিঘণ্টায় একশ টাকার বিনিময়ে পানি সরবরাহ করছেন। তাছাড়া আরো দুটি সেচপাম্পের মালিকানা রয়েছে তার।
এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, জোতজয়রাম-৩ মৌজায় বিএমডিএ পরিচালিত গভীর নলকূপের অপারেটর হুমায়ন কবির। অভিযোগ রয়েছে, অপারেটর হবার সুবাদে বিএমডিএ’র বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সখ্যতা রয়েছে। আর একারণে বিএমডিএ’র গভীর নলকূপটি তিনি বন্ধ রেখে নিজের মালিকনাধীন অগভীর নলকূপটি থেকে কুষকদের পানি সরবরাহ করছেন। এর ফলে বিএমডিএ আর্থিকভাবে ক্ষত্রিগ্রস্ত হলেও লাভবান হচ্ছেন তিনি। হুমায়ন কবির অগভীর নলকূপ স্থাপনের আগে বিএমডিএ’র স্থাপিত গভীর নলকূপের ২০১৪ সালের পূর্ববর্তী বছরগুলোর হিসেবে দেখলেই বিষয়টির প্রমাণ মিলবে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা।
অপরদিকে সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করে গোপনে কীভাবে হুমায়ুন কবির অগভীর নলকূপটি স্থাপন করলেন- বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলামের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিএমডিএ তদন্ত শুরু করেছে। গত ২২ মে বিএমডিএ’র সহকারী প্রকৌশলী জিল্লুল বারী ঘটনাটি তদন্ত করতে যান। তিনি তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে সহকারী প্রকৌশলী জিল্লুল বারী বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার প্রেক্ষিতেই বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছে। জোতজয়রাম মৌজায় হুমায়ুন কবিরের অগভীর নলকূপের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে সব বিষয়গুলোই উঠে এসেছে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে- সে ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মতামত দেবেন।
অভিযোগের ব্যাপারে হুমায়ন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি স্পেশাল পাওয়ারের মাধ্যমে অগভীর নলকূপ বসানোর অনুমতি নিয়েছি। সে সময়ের উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (আতাউর) রহমান অগভীর নলকূপটি স্থাপনের ব্যাপারে সুপারিশ করেন। এছাড়া অগভীর নলকূপে বেশি হর্স পাওয়ার ব্যবহারের প্রসঙ্গটি তিনি অস্বীকার করেন।
অগভীর নলকূপে বেশি হর্স পাওয়ার ব্যবহার করে কম বিদ্যুৎ বিল প্রদানের অভিযোগ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) গোদাগাড়ী জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী অহিদুর রহমান বলেন, এ ব্যাপারে মোবাইল ফোনে কথা বলবো না। সংশ্লিষ্ট অগভীর নলকূপের মালিক হুমায়ুন কবির বিদ্যুৎ বিল কম দেন এবং অনুমতির বাইরে বেশি হর্স পাওয়ার ব্যবহার করেন কী না- এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়গুলো জানতে হলে সরাসরি আমার কার্যালয়ে আসতে। মোবাইল ফোনে এ সংক্রান্ত কোন তথ্য আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব না।
এ ব্যাপারে বিএমডিএ’র নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশিদ বলেন, নিষেধাঞ্জার পরেও কীভাবে অগভীর নলকূপ বসানো হলো, এটি আমার বোধগম্য না। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনার সঙ্গে বিএমডিএ’র কেউ সম্পৃক্ত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কীভাবে অগভীর নলকূপটি বসালেন, তাও অনুসন্ধান করে দেখা হচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ