বিপন্ন গণতন্ত্রে প্রযুক্তি যেন এক সর্বরোগহর বটিকা!

আপডেট: জানুয়ারি ২১, ২০১৭, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

জয়ন্ত ঘোষাল


আমরা সবাই ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে বেশ চিন্তিত। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই বিজেপি সরকারের নানা সিদ্ধান্ত, কাজ করার ধরন, এ সব দেখে বার বার মনে হচ্ছে ভারতীয় সমাজব্যবস্থার মধ্যেই যে বহুত্ববাদ, যে পরমতসহিষ্ণুতার ঐতিহ্য আছে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপরেই বোধহয় নানা ভাবে আঘাত আসছে। এত দিন বড় গলায় বলতাম, গ্রিক সভ্যতা নয়, ভারতীয় সভ্যতার আদিপর্বেই লুকিয়ে আছে গণতন্ত্রের ঐতিহ্যের ইতিহাস। হেরোডোটাস নয়, ভারতীয় বৈদিক যুগ থেকে কৌটিল্য, আকবর থেকে মহাত্মা গাঁধী বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ভাবনা ছিল। আজ এত বছর পর হিন্দু জাতীয়তাবাদের নামে কি এক নতুন ধরনের জেনোফোবিয়ার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা?
ঠিক এই রকম যখন মনের অবস্থা তখন হঠাৎই একটা বই হাতে এল অপ্রত্যাশিত ভাবে। লেখকের নাম ডেভিড ভ্যান রে ব্রাউক (উধারফ ঠধহ জবু ইৎড়ঁপশ), বেলজিয়ামের লোক তিনি। তিনি এ-১০০০ নাগরিক শীর্ষ সম্মেলন নামে একটি সংস্থা চালু করেছেন। বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে তিনি জনপ্রতিনিধিত্ব মূলক গণতন্ত্রের জন্য প্রচার চালিয়ে ইউরোপের বিদ্বৎসমাজের নজর কেড়ে নেন। এই প্রজন্মের রাজনীতি বিষয়ক এক বিশিষ্ট লেখক তিনি। তাঁর লেখা কঙ্গো-দ্য-এপিক হিস্ট্রি অফ আ পিপল মোট ১৯টা পুরস্কার পেয়েছে আর পাঁচ লক্ষ বই বিক্রি হয়েছে।
যাই হোক, এ হেন ডেভিডের যে বইটি আমাকে ভাবিয়েছে তার নাম অঁমঁংঃ ঊষবপঃরড়হং ঞযব ঈধংব ভড়ৎ ফবসড়পৎধপু। এই বইটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টি সংক্ষেপে আপনাদের জানানোর চেষ্টা করি। ডেভিড বলছেন, একটা সময় ছিল যখন গোটা দুনিয়ার মানুষ কোনও কোনও ব্যক্তিশাসনের স্বৈরতন্ত্রে ক্ষুব্ধ ও হতাশ হলেও গণতন্ত্রের উপর আস্থা হারাননি। ডড়ৎষফ ঠধষঁবং ঝঁৎাবু কয়েক বছর আগে পৃথিবী জুড়ে এক সমীক্ষা চালায়। ৫৭টি দেশের ৭৩ হাজার মানুষের ওপর সমীক্ষা চালানো হয়। পৃথিবীর প্রায় শতকরা ৮৫ ভাগ জনসংখ্যার উপর এই সমীক্ষা হয়। সমীক্ষায় শতকরা ৯১.৬ ভাগ লোক বলেছিলেন যে তাঁরা গণতন্ত্রের উপর এখনও আস্থাশীল।
আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানুষ ফ্যাসিবাদের হিংস্রতা দেখেছে কাছ থেকে। ফ্যাসিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং উপনিবেশবাদের পরিণতি দেখে মানুষের মনে গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেখা যায় কেবলমাত্র ১২টি সার্বভৌম রাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিক ভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। এর পর এই সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৭২ সালে ৪৪টি রাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রাপ্তির তালিকায় ছিল। ১৯৯৩ সালের মধ্যে সংখ্যাটি হয় ৭২ এবং ১৯৫টি দেশের মধ্যে ১১৭টি দেশে নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু এখন? লেখক বলছেন, গণতন্ত্রের প্রতি উৎসাহ দ্রুত কমছে। গত দশ বছর ধরে গণতন্ত্রের বদলে শক্তিশালী নেতাকে পুষছে। ইউরোপের এই প্রবণতা সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়ে আমিও চাক্ষুষ করেছি। যেমন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিন বিতাড়ণ। শুরু হয় ক্রুশ্চেভ জমানা থেকেই। কিন্তু এখন রাশিয়া শক্তিশালী পুতিনের দ্বারস্থ, আবার পুতিন তার শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের জন্য স্তালিনকেও নানা কৌশলে জনসমক্ষে ফিরিয়ে আনছেন। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হচ্ছে জবংঃধষরহরংধঃরড়হ. স্তালিন শক্তিশালী জাতি রাষ্ট্র গঠনের প্রধান নির্মাতা ছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের বল্কানাইজেশনের পর আবার শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের পুতিনের রাজনীতিতে স্তালিনও তাই স্বাগত। ইতালির প্রাক্তন রাষ্ট্রনেতা কার্লোস্কি-র আলোচনাতে না-ই বা গেলাম। গ্ল্যামার বিতর্ক পেজ থ্রি হলোগ্রাম ইত্যাদি ইত্যাদি সব মিলিয়ে এক ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ইউটোপিয়া। মানুষ সেই স্বপ্নবিলাসের শিকার হয়ে গণতন্ত্রের কাঠামোর প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেছে।
এই লেখা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে ভারতের মতো ঐতিহাসিক গণতন্ত্রের ঐতিহ্যম-িত দেশে মোদীর জনপ্রিয়তার রহস্যের মধ্যেও কি মানুষের এই সংসদ ও তথাকথিত গণতন্ত্রের প্রতি অনাস্থাই লুক্কায়িত?
ডেভিড বলছেন, যে কোনও শাসনের দু’টি দিক থাকে- একটি হল শাসনের বৈধতা বা লেজিটিমেসি, অন্যটি হল সুশাসনের দক্ষতা। যাকে বলে প্রশাসনিক ‘এফিসিয়েন্সি’। নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক এই বৈধতা অর্জন করে জনগণের ভোটে কিন্তু এই বৈধতা চিরস্থায়ী হয় না। প্রতিনিয়ত জনমতের কষ্টিপাথরে সেই শাসনকে পরীক্ষা দিতে হয়। সে পরীক্ষায় ফেল করলে ডেভিড ক্যামেরুনের মতো বিদায় নিতে হয়। তবে লন্ডনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতের ফারাক হচ্ছে, ওখানে ডেভিড ক্যামেরুন ব্রেক্সিট নিয়ে গণভোটে গিয়েছিলেন। আমাদের দেশে শাসক জনপ্রিয়তা হারালে জরুরি অবস্থায় গিয়ে একনায়কতন্ত্রের কাছে আশ্রয় নেন।
অনেক সময় শাসক মনে করেন তিনি যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তা সাধারণ মানুষের স্বার্থেই। এতেই মানুষের কল্যাণ। মোদী যেমন নোটবাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবছেন। এই শাসক প্রবণতা সম্পর্কে লেখক বলছেন, শাসককে মনে রাখতে হবে গণতন্ত্র শুধু ‘ফর দ্য পিপল’ নয়, ‘বাই দ্য পিপল’-ও বটে। নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের অভিমত আগাম নেননি মোদী। এমনকী, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার স্বশাসন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আবার অনেক সময় যখন শাসক বোঝেন যে তিনি শাসনের বৈধতা হারাচ্ছেন তখন তিনি দ্রুত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে নাটকীয় চমক দিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে সাংঘাতিক কর্মক্ষম যোগ্য সরকারের ছবি তুলে ধরতে চান। এ ব্যাপারে সোশ্যাল মিডিয়া ও আজকের সংবাদমাধ্যমের সাহায্য নেয়া হয়। অনেক সময় বাজেট বা সাধারণ ভাবে জনপ্রিয় আমআদমির জন্য সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, এমন বার্তা শাসক দিতে চান। এ জন্য ভারতীয় বহু চিন্তাবিদ ‘পপুলার’ বা জনপ্রিয় সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক ‘পপুলিস্ট’ সরকারের ফারাক করছেন। ‘পপুলিজম’ আর ‘পপুলারিটি’ এক নয়। অনেক সময় যোগ্যতার ছবি তুলে ধরার জন্য শাসক দল প্রযুক্তির সাহায্য নেয়। যেন টেকনোক্র্যাসি এক সাঙ্ঘাতিক সমাধান। বিপন্ন গণতন্ত্রে টেকনোক্র্যাসি যেন এক সর্বরোগহর বটিকা!
লেখক বলছেন, গোটা পৃথিবীতেই দেখা যাচ্ছে বহু দেশে ভোট পড়ার শতকরা পরিমাণ কমছে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তির সুপারম্যান ভাবমূর্তির মোহজালে মানুষ বিপুল ভোট দিচ্ছে এক গণ উন্মাদনায়। কিন্তু কোনও উন্মাদনাই চিরস্থায়ী হতে পারে না। কারণ সেটা ভিড়-তন্ত্র, সড়নড়পৎধপু, গণতন্ত্র নয়!
(আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে)