বিপর্যস্থ চামড়ার বাজার

আপডেট: August 5, 2020, 12:10 am

নিজস্ব প্রতিবেদক


কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এমন পরিস্থিতি ঘটেনি এর আগে। দাম না থাকায় চামড়া কিনে বেকায়দায় ব্যবসায়ীরা। এবছর শুধু মৌসুমী ব্যবসায়ী নয়, ধরা খেয়েছেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরা। সেই ক্ষোভে কেউ কেউ পদ্মানদীতেও ফেলেছেন পশুর চামড়া।
জানা গেছে, কোরবানিতে প্রকারভেদে প্রতিটি গরুর চামড়া ১০০ থেকে ৪০০ টাকা। আর বড় গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ২০ টাকায় বেচাকেনা হয়েছে। দাম না পেয়ে দুঃখ-ক্ষোভে ছাগলের চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলেছেন ব্যবসায়ীরা। গত বছরের তুলনায় এবার চামড়ার দাম ২০ থেকে ২৯ শতাংশ কমিয়ে নির্ধারণ করেছিলো সরকার। সেই দামও পাওয়া যায়নি চামড়া বিক্রির সময়।
এবারও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা বেশি দামেই চামড়া কিনেছিলেন। ফলে তারা ধরাও খেয়েছেন। আর প্রকৃত চমড়া ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেনি ঠিকমতো বাজার। চামড়া কিনে তার ধরা খেয়েছেন। তবে কোনো কোনো ব্যবসায়ী চামড়া লবণজাত করে রেখেছেনÑ পরে বিক্রি করে দাম পাওয়ার আশায়। তবে দ্বিধাদ্বন্দে¦ রয়েছেন তারাও। পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ী।
মৌসুমী ব্যবসায়ী আবদুস সালাম জানান, বিভিন্ন দামে ২৫ হাজার টাকার পশুর চামড়া কিনেছিলাম। সঙ্গে দুজন শ্রমিক ও একটি অটোরিকশা ছিলো। ৯ হাজার ৭০০ টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি জানান, এবছর চামড়ার যে অবস্থা গেলো এর আগে কখনো এমন অবস্থা হয় নি। গত বছর লোকসান হয়েছিল তবে কম। সরকার নির্ধারিত দাম বেশি হলে চামড়া কিনবো, না হলে আর ব্যবসা করবো না।
জানা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। রাজধানীতে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৩৫-৪০ টাকা। আর রাজধানীর বাইরে দেশের অন্যান্য জায়গায় দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ২৮-৩২ টাকা। ছাগলের চামড়ার দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ২৮-৩২ টাকা।
অথচ রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত দামও দিতে চাইছিলেন না চামড়া ব্যবসায়ীরা। পশুর চামড়া দেখার পর তারা ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করেন। নিম্ন দরের কারণে কারও মধ্যেই কোনো দরকষাকষি ছিল না।
ব্যবসায়ীদের চামড়া কেনায় আগ্রহ কম থাকায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি আকৃতির গরুর চামড়া ৫০ থেকে ১৫০ টাকায় কিনতে দেখা গেছে। আর বড় আকৃতির গরুর চামড়া কেনা হয়েছে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকায়। সবচেয়ে বড় চামড়াটি বিক্রি হয়েছে ৫০০ টাকায়। এছাড়া ছাগলের চামড়ার দাম দেওয়া হয়েছে ১০ টাকা থেকে ৩০ টাকা।
নগরীর বুধপাড়া এলাকার আবদুর রাজ্জাক জানান, মৌসুমী ব্যবসায়ীদের তেমন পাড়া-মহল্লায় ঢুকতে দেখা যায়নি। কিন্তু গত বছর তাদের হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল। এবছর ভিন্ন চিত্র। যে দুই একজন আসছে তারা আবার দাম বলতে চান না। ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার মূল্যের গরুর চামড়া বিক্রি করেছি মাত্র সাড়ে ৩০০ টাকায়। এছাড়া ছাগলের চামড়া গড় দাম ৩৫ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রৌফ বলেন, তিনবছর ধরে রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ীদের বকেয়া টাকা ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে আছে। যে কারণে পুঁজি সঙ্কটে ভুগছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদ বলেন, সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে সেই দামে চামড়া কেনার টাকা নেই। ফলে কম দামে চামড়া কিনতে হয়েছে।
তিনি বলেন, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা ঢাকায় ট্যানারি মালিকদের কাছে পাঠান না। তারা কেনার পর সেই চামড়া আবার প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু এবার তাদের কাছ থেকে চামড়া কেনার আগ্রহ নেই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের। এ কারণে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ দফতর জানিয়েছে, কোরবানির আগে জেলায় গরু-মহিষ ছিল প্রায় এক লাখ। আর ছাগল ছিল দুই লাখ ২৮ হাজার। অন্যান্য পশু ছিল ৪২ হাজার। সবমিলে কোরবানির জন্য পশু ছিল তিন লাখ ৭০ হাজার। জেলায় আড়াই লাখের মতো পশু কোরবানি হওয়ার কথা। তবে প্রকৃত হিসাবটা এখনও প্রস্তুত হয়নি।