বিফ নিষিদ্ধ করে কী ক্ষতি হচ্ছে ভারতের অর্থনীতিতে?

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৭, ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন


ভারতে সোয়া তিন বছর আগে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক রাজ্যে বিফ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বহু লাইসেন্সপ্রাপ্ত মিট প্রোসেসিং কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে – এবং পশুহাটগুলোতে গরুমোষের কেনাবেচাতেও আরোপ করা হয়েছে নানা বিধিনিষেধ।
পাশাপাশি গোরক্ষার নামে ভারতের নানা প্রান্তে চলছে গবাদি পশু বহনকারী গাড়ি আটকে হামলা, জুলুম ও গণপিটুনি।
ফলে মাত্র তিন বছর আগেও যে ভারত বিফ রফতানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানে ছিল, সেই শিল্পে এখন তীব্র হতাশার ছায়া – আর মাংসের জন্য গরু-মোষ বেচতে না-পেরে গ্রামের খামারিরাও প্রবল বিপদে।
ভারতের শাসক দল বিজেপির এই গোরক্ষা নীতি দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সরেজমিনে সেটাই দেখতে গিয়েছিলাম উত্তর ভারতে মোষ কেনাবেচার সবচেয়ে বড় মান্ডিগুলোর একটা- হরিয়ানার ফিরোজপুর ঝিরকায়।
উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা আর রাজস্থান – এই তিন রাজ্যের সীমানায় বলে ওই সব মুলুক থেকেই এই পশুহাটে মোষ নিয়ে আসেন ব্যাপারিরা।
কিন্তু কুরবানির ঈদের ঠিক আগে যেমন ব্যস্ত কেনাকেটা দেখব ভেবেছিলাম, তার তুলনায় ব্যবসায় রীতিমতো ভাঁটার টান। গোরক্ষার নামে জুলুমবাজি আর সরকারি নীতির জাঁতাকলে পড়া খামারিদের গলায় প্রবল বিষাদের সুর।
কাছেই চক রঙ্গালা গ্রামের চাঁদ কুরেশি প্রবল হতাশার সুরে বলছিলেন, সরকার তাদের মতো কিষাণ ও খামারিদের ব্যবসা একেবারে চৌপাট করে দিয়েছে। অনেক কষ্টে, অনেক খরচ করে একটা মোষকে পালনপোষণ করে তারা বিক্রির জন্য আনছেন – কিন্তু বাজারে দাম মিলছে না, কারণ রাস্তায় গুন্ডাবাজির ভয়ে ক্রেতারাই কেউ আসছে না।
আখতার হোসেন পাশ থেকে যোগ করেন, গত দুতিনবছর ধরেই এই জুলুমবাজিটা শুরু হয়েছে – আর তাদের সঙ্গে যেটা চলছে সেটা চরম অন্যায় ছাড়া কিছু নয়।
কেউ কেউ আবার পরিষ্কার বলছেন, বিজেপি যখন থেকে ক্ষমতায় এসেছে তখন থেকেই তাদের এই দুর্দশার শুরু।
“আগে পাঞ্জাব, রাজস্থান কাঁহা কাঁহা মুলুক থেকে লোকে পশু নিয়ে আসত এই মান্ডিতে – এখন রাস্তায় ধরে হেনস্থা করা হবে, এই ভয়ে তারা সবাই মুখ ফিরিয়েছেন ফিরোজপুর ঝিরকার হাট থেকে।”
হামলার ধরনটা কীরকম, তারও বিস্তারিত বর্ণনা দেন তারা। তাদের কথায়, “পুলিশ আর গোরক্ষক বাহিনীর মধ্যে সাঁট থাকে। আমাদের লোকজন যখনই মাল নিয়ে যায়, তারা মোষের গাড়ি আটকে মারধর শুরু করে দেয়, গাড়ির কাঁচ ভাঙে – পাঁচ বা দশহাজার টাকা পেলে তবেই ছাড় মেলে।”
“না-দিলে পুলিশ থানায় নিয়ে গিয়ে আরও হেনস্থা করে। আর এরা নিজেদের কেউ বলে বজরং দল, কেউ শিবসেনা বা কেউ আরএসএস – কেউ আবার নিজেদের পরিচয় দেয় মানেকা গান্ধীর পশুপ্রেমী সংস্থার সদস্য বলে।” এর ওপর প্রতিটা পুলিশ চৌকিতেই তাদের হাতে গুঁজে দিতে হয় একশো বা দুশো টাকার ঘুষ।
ধারাবাহিক এই নির্যাতনে সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাটা হল – তথাকথিত এই গোরক্ষক বাহিনী যে সব গাড়ি আটকাচ্ছে, তার প্রায় কোনওটাতেই কিন্তু গরু নিয়ে যাওয়া হয় না – নিয়ে যাওয়া হয় মোষ।
মোষের মাংসে নিষেধাজ্ঞা নেই ভারতের প্রায় কোনও রাজ্যেই – তারপরও এই মোষের মাংসের কারবারটাই বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে এই গোরক্ষকদের তান্ডবে।
অল ইন্ডিয়া মিট অ্যান্ড লাইভস্টক এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, অর্থাৎ ভারতের মাংস রফতানিকারকদের সংগঠনের নেতৃস্থানীয় সদস্য ও মুখপাত্র ফাউজান আলাভি অলিগড়ে নিজের কারখানায় বসে দু:খ করছিলেন, “এই কাউ ভিজিল্যান্টে-রা আসলে এখন বাফেলো-ভিজিল্যান্টে হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গোরক্ষকরা হয়ে উঠেছে মোষ-রক্ষক!”
“অথচ গরুর মতো মোষের কোনও ধর্মীয় মাহাত্ম্য নেই – বরং মোষকে হিন্দুরা মৃত্যুর দেবতা যমের বাহন হিসেবেই দেখে। কিন্তু এখন সেই মোষকে বাঁচানোর নামেও চলছে জুলুমবাজি – আর পশুপ্রেমীরাও যোগ দিয়েছে সেই ব্ল্যাকমেলিঙে।”
সরকার, পুলিশ আর গোরক্ষকের এই ত্রিমুখী আক্রমণে এক কথায় অসহায় বোধ করছেন গ্রামের সাধারণ খামারি থেকে শুরু করে মাংস রফতানি শিল্পের কর্ণধার, সবাই।
অর্থনীতিবিদ রতন খাসনবিশ বিবিসিকে বলছিলেন, এর ফলে দেশের রফতানি যেমন কমছে – তেমনি অকেজো গরু-মোষ মাংসের জন্য বেচতে না-পেরে গরিব কৃষকও কিন্তু বিরাট বিপদে পড়ছে।
তার কথায়, “প্রথমত মাংস রফতানি-কেন্দ্রিক অর্থনীতির আকারটা কিন্তু এ দেশে মোটেই ছোট নয়, উত্তরপ্রদেশের মতো অনেক রাজ্যে তার ওপর বহু লোকের রুটিরুজি নির্ভর করে। কিন্তু এখন সেটা নিরুৎসাহিত হচ্ছে বলেই সেই খাতে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ক্রমশ কমছে, আর তথ্যই সে কথা বলছে।”
“দ্বিতীয়ত এর আর একটা সমস্যা আছে, আর সেটাও শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক। এই গরু-মোষ আপনি যদি মারতে না-পারেন তাহলে দুধ দেওয়া বন্ধ করার পরও সেগুলোকে অকারণে আপনাকে খাইয়ে যেতে হবে, যেটা ব্যক্তিগত বাজে খরচ। অথবা রাস্তায় ছেড়ে দিলে সামাজিক খরচ – সেগুলো উপদ্রব করবে, কেউ হয়তো দয়া করে কখনও খেতে দেবে!”
আসলে এই মাংস রফতানি নিয়ে দেশের গর্ব করাটা যে তার একেবারেই পছন্দ নয়, ক্ষমতায় আসার ছমাস আগেই এক বণিকসভার বৈঠকে সেটা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
তখনকার সরকারকে রীতিমতো কটাক্ষ করে তিনি সেদিন বলেছিলেন, “তাদের স্বপ্ন হল সারা দুনিয়ায় মাংস-মটন রফতানি করে দেশে পিঙ্ক রিভলিউশন বা গোলাপি বিপ্লব আনা। ভারত মাংস রফতানিতে প্রথম হলে আপনাদের হৃদয়ে কী হয় জানি না, আমার তো বুকের ভেতরে অঝোরে অশ্রুপাত হয়!”
এই প্রতিশ্রুতি তিনি অবশ্য রেখেছেন – ক্ষমতায় আসার পর তার সরকার যে সব নীতি নিয়ে চলছে তাতে মাংস রফতানিতে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ভারত দুনিয়ায় এক নম্বর থেকে তিনে নেমে এসেছে, এখন তারা ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ারও পেছনে।
ফাউজান আলাভির মতে এই পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দেয় সমস্যাটা আসলে কত গভীরে। অথচ সরকারের এক পয়সা ভর্তুকি ছাড়াই এই শিল্পটা ভারতে তরতর করে নিজের পায়ে এগোচ্ছিল, তাদের আক্ষেপ সেখানেই।
“আর তা ছাড়া ডেয়ারি উৎপাদনেও ভারত দুনিয়ার এক নম্বর, আর মাংস শিল্প যেহেতু ডেয়ারি শিল্পেরই বাইপ্রোডাক্ট – তাই এ দেশে বিপুল সম্ভাবনা ছিল দুয়েরই। মাংস রফতানিতে ভারত এ বছর চারশো কোটি ডলারের মতো ব্যবসা করেছে, অথচ সব ঠিকঠাক থাকলে অনায়াসে সেটা পাঁচশো কোটি ডলার হতে পারত”, বলছেন মি আলাভি।
আর ফিরোজপুর ঝিরকা মান্ডির সাধারণ কিষাণ-খামারিদের আর্থিক অবস্থায় কী ধরনের প্রভাব ফেলছে সরকারের এই নীতি?
তারা বলছেন একটা মোষকে বড় করে তুলতে তিন বছরে অন্তত বিশ থেকে বাইশ হাজার টাকা খরচ – কিন্তু মান্ডিতে এখন পনেরো হাজার টাকার বেশি দামই মিলছে না।
মান্ডির ব্যাপারিরা বলছেন তাদের পঁচাত্তর শতাংশ ব্যবসাই বন্ধ হয়ে গেছে, টিঁকে আছে বড়জোর চার আনা। কারখানা-শিল্পবিহীন ওই এলাকায় একটাই ছিল রোজগারের রাস্তা, সরকার সেটাও ছিনিয়ে নিয়ে মানুষকে ভাতে মারছে বলে তাদের অভিযোগ।
ফিরোজপুর ঝিরকার এই পশুহাট থেকে মাত্র ষাট কিলোমিটার দূরেই রাজস্থানের আলোয়াড় – সেখানকার বাসিন্দা পহেলু খান গাড়িতে চাপিয়ে মান্ডিতে গবাদি পশু নিয়ে আসার সময়েই গত মার্চ মাসে গোরক্ষকদের হামলায় প্রাণ হারান।
পহেলু খান হত্যাকান্ডের পর গোরক্ষকদের ওপর রাশ টানার দাবিতে তুমুল হইচই হয়েছিল – কিন্তু পাঁচ মাস পরেও অবস্থা রয়ে গেছে যে কে সেই। রাস্তায় তাদের জুলুম কমেনি, আর কিষাণও বুঝে উঠতে পারছেন না অকেজো গরু-মোষ নিয়ে করবেনটা কী!
অর্থনীতিবিদ রতন খাসনবিশ সতর্ক করে দিচ্ছেন, ভারতে একেই পশুখাদ্যের ব্যাপক সঙ্কট আছে – আর এই বিপুল সংখ্যক গরু-মোষ অথর্ব ও অনুৎপাদী হয়ে পড়লে তাদের বাঁচিয়ে রাখাটাই বিরাট এক সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
“ভারতে পশুখাদ্য বা ফডারের যোগান কম – ফলে দামও খুব বেশি। বেশির ভাগ কৃষকের পক্ষেই সেটা কেনা সম্ভব হয় না, তাই গরু-মোষগুলো শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়াও। আগে কিছু পিঁজরাপোল ছিল, বা কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শেষ বয়সে এই গরু-মোষগুলোর দেখাশুনো করত – কিন্তু তাদের সংখ্যাও এখন ভীষণ কমে গেছে”, বলছিলেন মি খাসনবিশ।
মাংস রফতানিকারক ফাউজান আলভিও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, “ভারত থেকে বিফ বলে যা রফতানি হয়, তা কিন্তু গরুর মাংস নয়, বাফেলো বা মোষের। আর এই মোষ বা ওয়াটার বাফেলোর সংখ্যায় ভারত সারা পৃথিবীতে এক নম্বর।”
“কিন্তু এই মোষও যদি কেনাবেচা না-করা যায়, তাহলে এই শিল্পর সঙ্গে জড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষের রুটিরুজিই শুধু বিপন্ন হবে না – বিপদে পড়বেন কৃষকরাও। গবাদি পশুর কেনাবেচায় এত বিধিনিষেধ আসলে একটা কৃষক-বিরোধী নীতি ছাড়া কিছুই নয়!”
ভারতে এখনও যেহেতু ৬০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপরেই নির্ভরশীল, তাই কোনও কৃষকবিরোধী নীতিই শেষ পর্যন্ত টিঁকবে না – এটাই এখন তাদের শেষ আশা।
কিন্তু অর্থনীতিতে মন্দার স্পষ্ট ছাপকে উপেক্ষা করেই বিজেপি এখনও তাদের গোরক্ষার নীতিতেই অটল রয়েছে – আর গরু-মোষ বেচতে না-পেরে পশুমান্ডিতে পড়ছে খামারিদের দীর্ঘশ্বাস!