বিবিসি বাজারের রূপকার কাশেম মোল্লাকে মনে রাখে না কেউ

আপডেট: ডিসেম্বর ১১, ২০১৬, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী



মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ঈশ্বরদীর ঐতিহাসিক বিবিসি বাজারের রূপকার কাশেম মোল্লা অনাদরে অবহেলায় না ফেরার দেশে চলে গেলেও তিনি বিখ্যাত হয়ে রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিবিসির খবর শুনিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করা সেই কাশেম মোল্লা আজ শুধুই একটি ইতিহাস। যার দুঃসাহসিক ভূমিকায় বিবিসির খবর শোনানোর মধ্য দিয়ে একটি এলাকার নাম হয়েছে বিবিসি বাজার, যার কারণে মুক্তিযুদ্ধে অন্যরকম সাহস পেয়েছিল এই এলাকার মুক্তিকামী হাজারো মানুষ, আজ তার কথা স্মরণ করারও কেউ নেই।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই ৪৫ বছরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া অনুদানের ৩০ হাজার টাকা ও জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের দেয়া ৫০ হাজার টাকার অনুদান ছাড়া আর কিছুই জোটেনি কাশেম মোল্ল¬ার ভাগ্যে। মুক্তিযুদ্ধের সময় রেডিওতে বিবিসির খবর শোনানোর কারণে পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনে তার পা ভেঙে পঙ্গুত্ব বরণ করেন তিনি, অথচ জীবিত অবস্থায় তো নয়ই মৃত্যুর পরও তার ভাগ্যে জোটেনি ‘মুক্তিযোদ্ধা’র সার্টিফিকেট। জীবিত অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে ধরণা দিয়েও কাশেম মোল্লার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেয়ার সৌভাগ্য হয়নি। সরকারি-বেসরকারি এমনকি লন্ডনের ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং সেন্টার (বিবিসি রেডিও) কর্তৃপক্ষ কাশেম মোল্ল¬ার চিকিৎসাভার বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তার নিজ হাতে লাগানো ঐতিহাসিক সেই কড়ই গাছটি শাখা প্রশাখা বিস্তার করে বিশাল আকৃতি ধারণ করেছে, তার একমাত্র চায়ের দোকানের অস্তিত্ব না থাকলেও এখন বড় বড় দোকানপাট বিপণি বিতানের বিস্তার লাভ করে এখন রীতিমত বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে ‘বিবিসি বাজারে’ । অথচ এই বিবিসি বাজারের রূপকার কাশেম মোল্ল¬া নেই সেই বিবিসি বাজারে। মৃত্যুর একবছর এখনো পূর্ণ হয়নি অথচ এখনি তাকে ভুলতে বসেছে এলাকাবাসি, বিবিসি বাজারে তার নামে একটি স্মৃতিচিহ্ন স্থাপনের দাবিও এখন উপেক্ষিত। মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে পঙ্গুত্ববরণকারী কাশেম মোল্লা বিনা চিকিৎসায় অনাদরে অবহেলায় ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।
যেভাবে শুরু : কাশেম মোল্ল¬ার ছিল ফিলিপস ৩ ব্যান্ডের একটি রেডিও। ১৯৬২ সালে বিয়ের পর শখ করে এটি কিনেছিলেন তিনি। এই রেডিওটিই তাকে একসময় বিখ্যাত করে তোলে, যা তার মৃত্যুর পরও এলাবাসী তাকে স্মরণ করেন শ্রদ্ধাভরে। এখন যে স্থানটি রূপপুর বিবিসি বাজার হিসেবে খ্যাত, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার তরুণ কাশেম মোল্ল¬ার সেখানে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান ছিল। তার রেডিওর নব ঘোরাতে ঘোরাতে পেলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও বিবিসি। সেদিন আবেগে তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন ‘ও ভাই শুনে যাও স্বাধীন বাংলার খবর, বিবিসির খবর।’ সেদিন থেকে রূপপুর গ্রামের মানুষ যেন ভেঙে পড়লো কাশেম মোল্ল¬ার দোকানে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে এলো ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গান, বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠ আর যদি একট গুলি চলে….., তারপর একে একে স্বাধীনতা যুদ্ধের খবরা খবর। প্রতিদিন সন্ধ্যা হতে না হতেই সেই চায়ের দোকানে এলাকার লোকজন জড়ো হতো বিবিসির খবর শুনতে। একপর্যায়ে কাশেম মোল্ল¬ার চায়ের দোকানে প্রতিদিন শত শত মানুষ এসে ভিড় করতো রেডিও বিবিসিতে মুক্তিযুদ্ধের খবর শোনার জন্য। সেসময় পাক হানাদার বাহিনীর নিষেধাজ্ঞায় কেউ প্রকাশ্যে খবর শুনতে পেত না অথচ মুক্তিযুদ্ধে ‘অন্যরকমভাবে’ অংশগ্রহণকারী কাশেম মোল্ল¬া বিখ্যাত হয়ে রয়েছেন সাহস করে বিবিসির খবর শুনিয়ে।
পাক হানাদার পাকিস্তানিদের ক্যাম্প থেকে রূপপুরের এই স্থানটি দূরে হওয়ায় সন্ধ্যায় লোক সমাগম হতো। সেসময় রূপপুরের মত অজো গ্রামে রেডিওর সংখ্যাও কম ছিল, কাশেম মোল্ল¬ার চায়ের দোকানে বিবিসির খবর শোনা যায় একথা এক এক করে প্রচার হয়ে যাওয়ার পর আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষ আসা শুরু করে রূপপুরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাত ৮ টা ১৫ মিনিট থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত এই ১৫ মিনিট বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ শোনার জন্য প্রতিদিন ৪ থেকে ৫শ’ মানুষ জড়ো হতো। রাস্তায় কারো সঙ্গে দেখা হলে কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসতো ‘বিবিসি যাচ্ছি’। এভাবে এক এক করে ওই কাশেম মোল্ল¬ার রূপপুর একসময় সবার অজান্তেই হয়ে গেলো বিবিসি বাজার। ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ে এই এলাকার মানুষ ঘরের দরজা বন্ধ করে কেউবা খাটের নিচে লুকিয়ে বিবিসির বাংলা সংবাদ শুনতো। কারণ বিবিসির খবর শোনাকে সেসময় ‘অপরাধ’ হিসেবে ধরা হতো এবং এজন্য পাকিস্তানি হানাদার সামরিক শাসক দু’বছরের কারাদ-ের আদেশ পর্যন্ত জারি করেছিল। এমনকি বিবিসির খবর শোনার কারণে অনেক মানুষকে হত্যাও করা হয়েছিল। কাশেম মোল্ল¬া সেই সময় সাহস করে তার চায়ের দোকানে রেডিওতে শোনাতেন বিবিসির বাংলা সংবাদ। পাকহানাদার বাহিনী এখবর জানার পর কাশেম মোল্ল¬ার দোকানে এসে তাকে শারিরিকভাবে নির্যাতন করে তার পা ভেঙে দেয়।
কেউ কথা রাখেনি : মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই ঈশ্বরদীর পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর গ্রামের ওই স্থানটি হয়ে গেল ‘বিবিসি বাজার’। ১৯৯২ সালে বিবিসির সুবর্ণ জয়ন্তীর অংশবিশেষ ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং সেন্টার থেকে বিবিসির বাংলা বিভাগের প্রধান সিরাজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম এসেছিলো ঈশ্বরদীর বিবিসি বাজারে। বিবিসির তৎকালীন বাংলাদেশ সংবাদদাতা আতাউস সামাদ, ভারতের ব্যারি ল্যাংরিজসহ বিবিসির বেশ কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক-কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়েছিলেন কাশেম মোল্ল¬ার বিবিসি বাজারে। সেদিন বিবিসি বাজারে কাশেম মোল্ল¬ার সম্মানে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন প্রচুর সাংবাদিক ও সুশীল সমাজ। বিবিসির কর্মর্তাদের মুখে ঈশ্বরদীবাসী শুনেছিলেন কাশেম মোল্ল¬ার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তার ভাগ্যের চাকা বদলে দেয়ার কথা। সিরাজুর রহমান আশ্বাস দেন কাশেম মোল্ল¬ার একটা ভালো ব্যবস্থা করার। কিন্তু ওই আশ্বাস পর্যন্তই।
ঐতিহাসিক সেই কড়ই গাছ : রূপপুরের বাসিন্দা স্থানীয় স্বর্ণকলি বিদ্যাসদনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মনিরুল ইসলাম বাবু বলেন, দিন বদলেছে, রূপপুরের অনেক পরিবর্তন এসেছে। কাশেম মোল্ল¬ার নিজ হাতে লাগানো সেই ঐতিহাসিক কড়ই গাছের চারপাশ দিয়ে সারি সারি দোকান, বিল্ডিং, মার্কেট- বিবিসি বাজার বলেই যার পরিচিতি। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় সেই বিবিসি বাজারে এখন নেই কাশেম মোল্ল¬ার কোন দোকান। বর্তমান প্রজন্মের কেউ এখন চেনে না কাশেম মোল্লাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে মানুষটির অবদানের জন্য এই বিবিসি বাজার, আজ তার কথা মনে রাখে না কেউ। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের তোয়াক্কা না করে অসীম সাহসে শত সহস্র মানুষকে রেডিও অন করে বিবিসি শুনিয়ে যে মানুষটি পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন দেশ স্বাধীনের ৪৫ বছর পরে এখন আর তার খবর নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না কারোর।
প্রতিক্রিয়া : রূপপুরের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রশিদুল্ল¬াহ বলেন, কাশেম মোল্ল¬ার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে অন্ততঃ সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আমরা সুপারিশ করেছিলাম কিন্তু নানা কারণে তাকে সেই সম্মানটুকু দিতে পারিনি আমরা। ঈশ্বরদী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমান্ডার (তথ্য ও প্রচার) ফজলুর রহমান ফান্টু এ প্রসঙ্গে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কাশেম মোল্ল¬ার সাহসী ভূমিকার জন্য তাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি আগেই দেয়া উচিত ছিল। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার আব্দুল খালেক দুঃখ প্রকাশ করে বলেন তাকে জীবিত অবস্থাতেই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া উচিৎ ছিল কিন্তু আমরা তা পারিনি।