বিলীনের মুখে ঐতিহ্যবাহী সোনাদিঘি দখলমুক্ত করতে এক মাসের আলটিমেটাম

আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০১৭, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


নগরীরঐতিহ্যবাহী সোনাদিঘির একাংশ দখল করা হয়েছে নির্মাণ রেঁস্তোরার রান্নাঘর -সোনার দশ

রাজশাহী নগরীর ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অংশ সোনাদিঘি। এ দিঘির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নগরজীবনের দীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান পেরিয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের বহু সাক্ষি ঐতিহ্যবাহী এ দিঘিটি। কিন্তু প্রভাবশালীমহল দীর্ঘদিন থেকে এ দিঘিটি দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে। সময়ের ব্যবধানে এ দিঘির বিশাল অংশ দখলে নিতে সক্ষমও হয়েছে। বর্তমানে এ দখল প্রক্রিয়া আরো জোর গতিতে চলছে। আর এ দখলের প্রতিবাদে এবং ঐতিহ্যবাহী এ দিঘিটি পুনরুদ্ধারে সোচ্চার হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সংগঠন। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার সকালে দিঘিটি দখলমুক্ত করতে মানববন্ধন করে একমাসের আলটিমেটাম দিয়েছেন রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদ ও রাজশাহী নাগরিক সমন্বয় কমিটির ব্যানারে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এদিকে ঐতিহ্যবাহী সোনাদিঘি ভরাট করে চুক্তিভঙ্গ করে সিটি সেন্টার’ নির্মাণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দিঘির বেশকিছু অংশ ভরাট করে ফেলা হয়েছে। তার ওপর পাইলিং করে বসানো হয়েছে ২০ থেকে ২৫টি পিলার। এর ফলে অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এ দিঘিটি। অথচ ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার প্রথম কাজ হবে শহরের প্রাণকেন্দ্রে সোনাদিঘি সংস্কার করে আগের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। সোনাদিঘিকে ঘিরে অত্যাধুনিক কিছু পরিকল্পনা ঘোষণা করে নগরবাসীকে স্বপ্নও দেখিয়েছিলেন তিনি।
ওই সময় তৎকালীন মেয়র লিটন বলেছিলেন, সোনাদিঘিকে সংস্কার করে নীল পানির লেকে পরিণত করা হবে। লেকে থাকবে মিনি প্যাডেল বোট। আর দিঘির চারদিকে থাকবে পায়ে চলার পথ। মাঝখানে থাকবে সুদৃশ্য কৃত্রিম আইল্যান্ড। থাকবে ন্যাচারাল পাখির রাজ্য। দিঘিতে শাপলা-পদ্ম ফুল ফোটানোর ব্যবস্থাও থাকবে। তাতে নগরবাসী অন্যরকম সৌন্দর্য্য উপভোগ করবেন। এর পাশে অর্থনৈতিক জোন হিসেবে নির্মাণ হবে ১৬ তলা বিশিষ্ট ‘সিটি সেন্টার’। পরিকল্পনা এগিয়েও নিচ্ছিলেন সে ভাবে। কিন্তু জনাব লিটন সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব হস্তান্তরের পর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রভাবশালীমহল দিঘিটি দখলে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এই সিটি সেন্টারের নির্মাণ কাজ এখন চলছে। যদিও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এখন সিটি সেন্টার নির্মাণকারীরাই চুক্তির বাইরে গিয়ে দখল করে নিচ্ছে দিঘির বিশাল অংশ। পাশাপাশি দখল আর দূষণ তো আছেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৬ তলা সিটি সেন্টারের ১৩ তলা পর্যন্ত কাঠামো নির্মাণ হয়েছে। সিটি সেন্টারটি পূর্ব দিকে আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। দিঘির পশ্চিম-দক্ষিণ কোণের বেশকিছু অংশ ভরাট করে এরই মধ্যে ২০ থেকে ২৫টি পিলার বসানো হয়েছে। মাটি থেকে প্রায় পাঁচ ফুট পর্যন্ত ওপরে উঠেছে পিলারগুলো। এর ওপর নির্মিত হবে ভবন। পুরো দিঘিতে ময়লা-আবর্জনা ভাসছে। এভাবে দখলে-দুষণে প্রাণ হারাতে বসেছে সোনাদিঘি।
দিঘির পশ্চিম দিকে মোঘলস বিরিয়ানি নামে একটি রেঁস্তোরার রান্নাঘর তৈরি করা হয়েছে। এর কিছু অংশ মাটি দিয়ে ভরাট করা। আর কিছু অংশ পানির ওপরেই বাঁশের কাঠামো দিয়ে তৈরি করা। সোনাদিঘি দখল করে রান্নাঘর কেন, জানতে চাইলে ওই রেঁঁস্তোরার মালিক নজরুল ইসলাম সোহানের ভাই মিজানুর রহমান সোহাগ বলেন, শুনেছি পুরো দিঘিটিই ভরাট হবে। তাই ময়লা পড়ে যে অংশটি ভরাট হয়েছে, আমরা সে অংশে রান্নাঘর বসিয়েছি।
সোনাদিঘির পার্শ্ববর্তী এলাকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাসিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বাগমারা আসনের সরকারদলীয় সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের প্রতিষ্ঠান এনা প্রোপার্টিজ সিটি সেন্টারের নির্মাণকাজ করতে গিয়ে প্রথমে সোনাদিঘির পশ্চিমপাড়ের কিছু অংশ কৌশলে ভরাট করে। এরপর তারা সেখানে বাঁশের খুঁটি ও বেড়া দিঘির ভেতরের অংশে বেঁধে বালু ফেলে। তখন দূর থেকে বেড়াটি দেখলে মনে হতো সোনাদিঘিকে রক্ষা করতেই এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন সেই বালুর ওপরেই ভবন নির্মাণের জন্য পাইলিং করে পিলার বসানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প অনুযায়ী ঐতিহ্যবাহী সোনাদিঘি ও মসজিদকে ঠিক রেখে ১৬ তলা সিটি সেন্টারটি নির্মাণ করার কথা। ভবনটি থেকে সিটি করপোরেশন পাবে মাত্র ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান পাবে ৭৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ সম্পদ। অভিযোগ উঠেছে, সিটি সেন্টারের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এতো বেশি অংশ পাওয়ায় কৌশলে তারাই সোনাদিঘি ভরাট করে ভবনের পরিধি বৃদ্ধি করছে। এতে তারা নিজেরা লাভবান হবে।
তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে এনা প্রোপ্রার্টিজের রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক সারোয়ার জাহান বলেন, ‘আমরা শুধুমাত্র ডেভলপার। আমরা নিজে থেকে দিঘি ভরাট করতে পারি না। রাসিক আমাদের অনুমতি দিয়েছে। আমরা শুধু প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছি। দিঘির ওই অংশটিতে সিটি সেন্টারের সঙ্গে সংযুক্ত একটি একতলা ভবন হবে। সেখানে শুধু বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ থাকবে।’
নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রাসিকের নির্দেশনার কথা বলা হলেও রাসিক বলছে অন্য কথা। রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘সোনাদিঘির ওপর ভবন হচ্ছে- এটিই জানি না। পুকুর-দিঘি-জলাশয় ভরাটের ক্ষেত্রে দেশে আইন হয়েছে। এর ফলে যেভাবে দখলের অভিযোগ করা হচ্ছে- সেটা যদি বাস্তবে হয়, তাহলে সেটি অন্যায়। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো। প্রয়োজনে সরেজমিনে গিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
অপরদিকে গতকাল শনিবার সকালে সোনাদিঘির দক্ষিণপাড়ে রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদ ও রাজশাহী নাগরিক সমন্বয় কমিটির উদ্যোগে ঐহিত্যবাহী সোনাদিঘি ও ভুবনমোহন পার্ক দখলমুক্ত করা, হোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ, সাইনবোর্ড ফি প্রত্যাহারসহ নাগরিকদের ১০ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন, রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ও রাজশাহী নাগরিক সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক শামসুদ্দিন। মানববন্ধনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন, রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী নাগরিক সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব সেকেন্দার আলী।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সোনাদিঘি রাজশাহীর অতি পুরাতন একটি দিঘি। সোনাদিঘি রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে লালন করে। দিঘিটি রাজশাহী তথা রাজশাহীর নাগরিকগনের পরিচয় বহন করে। আমরা সোনাদিঘি পাড়ের বাসিন্দা। আমরা এর কাছে ঋণী। আমরা এই দিঘির পানি খেয়েছি এর পানিতে সাঁতার কেটে এবং এর পাড়ে খেলাধুলা করে বড় হয়েছি। আমরা কোনভাবেই এই সোনাদিঘিকে দখল করতে দিব না, আমরা যেকোনো মূল্যে এই সোনাদিঘিকে সেই পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনব। সোনাদিঘি ভরাট করে যারা ভবন তৈরি করছে তাদের প্রচলিত আইনে বিচার করতে হবে। মানববন্ধন থেকে সোনাদিঘি দখলকারীদেরকে ৩০ দিনের সময় বেধে দেয়া হয়, এই সময়ের মধ্যে দখলকারীরা নিজ দায়িত্বে সকল স্থাপনা সরিয়ে না নিলে নগরবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে ওই সব স্থাপনা ভেঙে গুড়িয়ে দিবে।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন, ভাষাসৈনিক মোশারফ হোসেন আখুঞ্জি, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী, বাংলাদেশ শিক্ষক কর্মচারী ঐক্য ফ্রন্টের নেতা ও মহানগর আ’লীগের সহসভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা, সাংবাদিক মুস্তাফিজুর রহমান খান, রাজশাহী মেট্রোপলিটন প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা সাজাহান আলী বরজাহান, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রাজশাহী শাখার সভাপতি কল্পনা রায়, নিপ্পন নৃত্যশিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হাসিব পান্না, সাংস্কৃতিককর্মী মিনহাজ উদ্দীন মিন্টু, রেঁস্তোরা মালিক সমিতির সভাপতি রিয়াজ আহাম্মেদ খান, পরিবেশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম টুকু, আরডিএ মার্কেট কমিটির সহসভাপতি আজম আলী, সিটি করপোরেশন গোস্ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আতাহার আলী প্রমুখ। মানববন্ধন কর্মসূচি পরিচালনা করেন, রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান মিঠু।
বরেন্দ্রের বাতিঘর সূত্রে জানা গেছে, ১৯২১ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের সম্মুখে নতুন মিউনিসিপ্যাল পাকা ভবন (একতলা) নির্মিত হয়। একই সময়ে এই ভবনটির পূর্ব পার্শ্বে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা একটি বৃহৎ দিঘি খনন করা হয়। এই দিঘি হচ্ছে সোনাদিঘি নামে রাজশাহী পরিচয় বহন করে। দিঘিটি খননের মূল উদ্দেশ্য ছিল শহরবাসীর জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ