বিলুপ্তির পথে বাঘার ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট মোগল আমলের মসজিদ

আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২০, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

আমানুল হক আমান, বাঘা


রাজশাহীর বাঘায় মোগল স্থাপত্যরীতিতে তৈরি নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম নারীদের জন্য নির্মিত একটি মসজিদ। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এ মসজিদের স্থাপত্যরীতিতে মোগল ভাবধারার ছাপ সুস্পষ্ট। মসজিদের ভেতরে প্রবেশ পথের মূল দরজার উপরে ফারসি ভাষায় পাথরে খচিত শিলালিপি নিয়ে রয়েছে আলোচিত ঘটনা। মসজিদটি বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। পুনরায় সংস্কার করে মসজিদ চালুর দাবি এরাকাবাসীর।

রাজশাহী শহর থেকে ৪৯ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ কোনে বাঘা উপজেলা সদরে হযরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলা (রহ.) এর পুত্র হযরত শাহ আব্দুর হামিদ দানিশ মন্দ (রহ.) মাজার সংলগ্ন এলাকায় এ মসজিদ অবস্থিত। পাশেই রয়েছে হযরত জহর শাহ (রহ.) এর মাজার। মসজিদ দেখতে বছরজুড়ে এখানে আসেন পর্যটক ও দর্শনার্থীরা। তবে পর্যটকদের আকর্ষণ ধরে রাখা বা ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে টিকে থাকা এ স্থাপনা সংরক্ষণে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।

৩ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের অবস্থান প্রায় ৩০ ফুট উচ্চ টিলার ওপর। বর্গাকার মসজিদটির দৈর্ঘ্য ২৭ ফুট, প্রস্থ ১৩ ফুট। চারপাশের দেয়াল ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি চওড়া। উত্তর ও দক্ষিণ লম্বাকৃতির মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে খিলান আকৃতির প্রবেশ পথ। মসজিদের ইট ধূসর বর্ণের। এ ইটের দৈর্ঘ্য ১০ ইঞ্চি, প্রস্থ ৬ ইঞ্চি এবং চওড়া দেড় ইঞ্চি। বর্তমান যুগের ইটের চেয়ে এর আকৃতি একেবারেই আলাদা। দর্শনার্থী ও নামাজিদের ওঠা-নামার জন্য মসজিদের পূর্বদিকে রয়েছে প্রবেশ পথ।

ঐতিহাসিক তথ্য মতে, প্রায় ৫০০ বছর আগে ৫ জন সঙ্গীসহ সুদূর বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য বাঘায় এসেছিলেন হযরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলা (রহ.)। তিনি বসবাস শুরু করেন, পদ্মা নদীর কাছে কসবে বাঘা নামক স্থানে। আধ্যাত্মিক শক্তির বলে এ এলাকার জনগণের মধ্যে ইসলাম প্রচারের ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন। এ সময়ে শাহদৌলার অনেক অলৌকিক কীর্তি দেখে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা তার কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেয়।
বাঘা ওয়াকফ এস্টেটের দেয়া তথ্য মতে, হযরত শাহদৌলা (রহ.) এর পুত্র হযরত শাহ আব্দুল হামিদ দানিশ মন্দ (রহ.) এর মৃত্যুর পর তার তৃতীয় পুত্র মাওলানা শাহ আব্দুল ওয়াহাব (রহ.) বাঘার খানকার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ওই সময় দিল্লি সম্রাট শাজাহানের প্রেরিত শাহী ফরমান যোগে ৪২টি মৌজা মাদদ মাস স্বরূপ দান লাভ করেন (১০৩০ হিজরি)। তখন শালিমানা ছিলো ৮ হাজার টাকা। হযরত আব্দুল ওয়াহাবের মৃত্যুর পর তার দুই পুত্রের মধ্যে হযরত শাহ মোহম্মদ রফিক (রহ.) ১০২৮ হিজরিতে ২০৩৭ আনা শালি আনার সম্পত্তি ওয়াকফ করেন। ওয়াকফ এস্টেটের মোতয়াল্লি (৬ষ্ঠ রইস) সাইজুল ইসলামের আমলে রইশ পরিবারের ও বাইরের পর্দানশিন নারীদের জন্য মসজিদ নির্মাণ করেন। তারা এ মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে টিকে থাকা এ শৈল্পিক স্থাপনার শরীরজুড়ে এখন শুধুই অযত্ন আর অবহেলার ছাপ। মসজিদের দেয়ালের কিছু কিছু অংশের পলেস্তারা ধসে পড়েছে। তবে বর্তমানে এ মসজিদে আর নামাজ আদায় হয় না।

ওয়াকফ এস্টেটের বর্তমান মোতওয়াল্লি খন্দকার মুনসুরুল ইসলাম রইশ বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ঐতিহাসিক নিদর্শনের তালিকাভুক্ত করেছে। মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুরোনো নকশা অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারের দায়িত্ব এখন তাদের। মসজিদের ভেতরে প্রবেশ পথের উপরে ফারসি ভাষায় পাথরে খচিত শিলা লিপিটি চুরি হয়ে যায়। যারা এই চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল, কিছুদিন পর প্রথমত একজনের পায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পরে পাথরটি মসজিদের ভেতরে রেখে যায়। এরপরে আরো একজন একইভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। চিকিৎসায় পা কেটে ফেলেও ভালো হয়নি। পরে দু’জনই মৃত্যুবরণ করে। তাদের জীবদ্দশায় পাথর চুরির ঘটনা তাদের মুখ দিয়েই বেরিয়ে আসে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ