বিলের মুখ বন্ধ রেখে চাঁদার ফাঁদ

আপডেট: অক্টোবর ৬, ২০১৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

Raj.Godagari-Photo-5.10
নিজস্ব প্রতিবেদক
মোটা অংকের চাঁদার দাবিতে বিলের পানি আটকে রেখেছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। বন্যা নেমে যাওয়ার এক মাস পরও বিলের মুখ বন্ধ করে রেখে কৃষক ও ইটভাটা মালিকদের সঙ্গে চাঁদা নিয়ে দরকষাকষি চালাচ্ছেন এসব প্রভাবশালীরা। প্রভাবশালীরা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। কৃষকদের জিম্মি করে ও তাদের চাষাবাদ আটকে রাখায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এলাকায়। বিষয়টি এলাকার সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরীর কানে গেলেও কোনো প্রতিকার হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সরেজমিনে এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের দক্ষিণ কোলঘেষে মাটিকাটা ইউনিয়নের সাহাব্দিপুর ও হরিশংকরপুরসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করে গত আগস্ট মাসে। নিচু এসব জমিতে পানি জমলেও বন্যা কমে গেলে হরিশংকরপুর এলাকার পানি নিস্কাশনে তৈরি একটি ব্রিজের নিচ দিয়ে পানি দ্রুত নেমে যায়। কিন্তু বন্যা নেমে গেলেও জমি ও ভাটা মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায়ের জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বাদরুল আলম টকেন মেম্বার, তার ছেলে সেকটার, লেনিন মাস্টারসহ আরো কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা নিজেদের ‘এমপির লোক’ পরিচয় দিয়ে ব্রিজের নিচে কাঠের কপাট ও বালির বস্তা দিয়ে নিষ্কাশন মুখটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে পদ্মার পানি নদীর তলে চলে গেলেও বিলে পানি আর নামতে পারে নি।
এলাকার কৃষক সবেদ আলী ও মামুন আলীসহ বেশ কয়েকজন কৃষক বলেন, আমরা বিলে আউশ ও  বোনা আমন চাষ করি। কিছুটা পানি জমলেও তাতে ধানের ক্ষতি হয় না। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ নেতারা নিষ্কাশন মুখটি বন্ধ করে দিয়ে পানি আটকে রেখেছে। এতে গত দেড় মাস ধরে পানি আটকে থাকায় ধানেরও ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। বোনা ধান পেকে গেলেও পানি থাকায় ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছে। এখন আওয়ামী লীগ নেতা দলের ও এমপির নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদা না পাওয়ায় নিস্কাশন মুখটি খুলতে দিচ্ছে না। ফলে এসব জমিতে এখনো পানি জমে আছে। পানি নেমে যাওয়ার পর যেসব কৃষক বিলের মধ্যে বোরো ধান, পেঁয়াজ, গম, আলু সহ বিভিন্ন ধরণের লটকানা ফসল চাষের পরিকল্পনা করেছিলেন তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
সম্প্রতি বিল এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিলে প্রায় হাজার একরজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধ নিষ্কাশন মুখটি খুলে দিলে একঘণ্টার মধ্যে বিলের সব পানি পদ্মায় নেমে যাবে। কিন্তু  আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন তারা চাঁদা না পেলে গেট খুলতেই দেবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইটভাটা মালিক জানান, এই বিলের মধ্যে ৪টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটাতে কয়েক হাজার মানুষ কাজ করে। আওয়ামী লীগ নেতারা এসব ইটাভাটা মালিকদের কাছ থেকেও কয়েক লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেছেন। ভাটা এলাকাগুলো পানিতে ডুবে থাকায় তারাও কাজ শুরু করতে পারছেন না। জিয়া  ইকো ব্রিকস নামের একটি স্বয়ংক্রিয় ভাটার একজন কর্মকর্তা জানান, কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে তারা ভাটাটি করেছেন। এখানে বিদেশি টেকনিশিয়ানও আছেন। মৌসুম শুরু হলেও তারা কাজই শুরু করতে পারছেন না পানি জমে থাকায়। এতে তাদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে কৃষকরা আরো জানান, এর আগেও এসব আওয়ামী লীগ নেতা কৃষক ও ভাটা মালিকদের জিম্মি করে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিলেন। এবারও তারা সেই একই উদ্দেশ্যে গত দেড় মাস ধরে বিলের গেট বন্ধ রেখে চাঁদার জন্য চাপ দিচ্ছেন। গেট না খুললে কয়েকশ কৃষকও চাষাবাদ থেকে বঞ্চিত হবেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাটিকাটা ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বাদরুল আলম টকেন বলেন, এই বিলে মাছ থাকায় আমরা পানিটা আটকে রেখেছি। নিলাম দিয়ে যে টাকাটা পাওয়া যাবে, তা দিয়ে স্থানীয় মসজিদ মাদ্রাসার উন্নয়ন করা হবে। চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। তবে তিনি স্বীকার করেন পানি আটকে থাকায় এলাকার কৃষকদের ক্ষতি হচ্ছে।  স্থানীয় সাংসদের অনুমতি নিয়েই তারা পানি আটকে রেখেছেন বলে দাবি করেছেন।
তবে রাজশাহী-১ আসনের ( গোদাগাড়ী-তানোর) সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, আমি কাউকে পানি আটকে রাখতে বলি নি। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এর সত্যতা পেলে সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ