বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করে জঙ্গিদের সংগঠিত করত মাহাফুজ

আপডেট: জুলাই ৯, ২০১৭, ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


নতুন নতুন অ্যাপস তৈরি করে রাজশাহী অঞ্চলে জঙ্গিদের সংগঠিত করতো দুর্ধর্ষ জঙ্গিনেতা সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ (৩২)। সে নিজে বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে জঙ্গিদের সংগঠিত করে বেড়াত। তবে সে কখনোই কোনো মোবাইল ফোন অপারেটরের নম্বর বা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করত না। আইটিতে পারদর্শী মাহফুজ নিজেই নতুন নতুন অ্যাপস তৈরিতে পটু। নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যের বোমা বানাতেও তার নাকি জুড়ি নেই। তার আইটি সম্পর্কিত দক্ষতার কাছে হার মেনেছে পুলিশও। তবে গতকাল শনিবার তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে চার সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে সর্বশেষ মাহফুজ উদ্ভাবিত ‘অরবোট’ নামে একটি অ্যাপের সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর এ অ্যাপ দিয়েই সে জঙ্গিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করত। অভিযানের সময় জঙ্গিদের হামলা মোকাবেলায় পুলিশের বাছাই করা চৌকস সদস্যদের নিয়ে ‘স্পেশাল অপারেশন টিম’ (এসওটি) গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ টিমই এ অ্যাপসের সন্ধান পায়। পুলিশের সংশ্লিষ্ট একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এদিকে গত ১২ জুন রাজশাহীর তানোরের ডাঙ্গাপাড়ায় গ্রেফতারকৃত তিন জঙ্গির সঙ্গেও হাতকাটা মাহফুজ এ অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলত। এ তিন জঙ্গি হল, ইব্রাহিম ও তার ভাই ইসরাফিল ও রবিউল। এর মধ্যে ইসরাফিলের ভায়রা ভাই হচ্ছে হাতকাটা মাহফুজ। মাহফুজের মাধ্যমেই তারা জঙ্গি নেটওয়ার্কে জড়ায়। এর আগে গোদাগাড়ীর বেনীপুর গ্রামের একটি বাড়িতে জঙ্গি আস্তানা গড়ে তুলে মাহফুজ। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অপারেশন সানডেভিল পরিচালনা করে পুলিশ। অপারেশনে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত আশরাফুল ও আল আমিন ছিল দুর্ধর্ষ জঙ্গিনেতা মাহফুজের ঘনিষ্ঠ শিষ্য। সেখানে বিস্ফোরিত বোমাগুলো মাহফুজেরই তৈরি ছিল। সে তখন পুলিশের কাছে ছিলো মোস্ট ওয়ান্টেড। নব্য জেএমবির অস্ত্র কেনা, গ্রেনেড তৈরি ও সরবরাহসহ আইটি শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল মাহফুজ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
উত্তরাঞ্চলে জঙ্গি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে জড়িত পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ১১ মে অপারেশন সানডেভিলে নিহত গোদাগাড়ী উপজেলার বেনীপুর গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের বাড়িতে যাতায়াত ছিল নব্য জেএমবির শীর্ষ সোহেল মাহফুজের। সোহেল মাহফুজ সাংগঠনিক নাম। তার আসল নাম আবদুস সবুর খান। কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার সাদিপুর গ্রামে তার বাড়ি। বাবার নাম রেজাউল করিম, মা মনোয়ারা বেগম।
নিহত জঙ্গি সাজ্জাদের মেয়ে সুমাইয়া আত্মসমর্পণের পর রিমান্ডে পুলিশকে এ তথ্য জানিয়েছে। সুমাইয়া পুলিশকে জানান, তাদের বাড়ি থেকে উদ্ধার ইম্প্রোভাইজড এক্সক্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) বোমাগুলো বানিয়েছিল সোহেল মাহফুজ। দুই মাস আগে ফসলি মাঠের ভেতর বানানো তাদের নতুন বাড়িতেই সোহেল মাহফুজ দু’বার গেছে। ওই আস্তানায় আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত আল-আমিন (২১) ও আশরাফুলকে (২৫) বোমা বানানো ও অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিত মাহফুজ। বেনীপুরের জঙ্গি বাড়িতে অভিযানের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলার প্রধান আসামি সোহেল মাহফুজ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে, ২০১৪ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে আদালতে নেয়ার পথে তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার মূল পরিকল্পনাকারীই হল এই সোহেল মাহফুজ। পুরনো জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের আমলে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিল সোহেল মাহফুজ। পরে জেএমবির শীর্ষ ৬ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হলে সংগঠনটির আমির হয় সাইদুর রহমান। ওই সময় জেএমবির শূরা (নীতি নির্ধারণী) কমিটির সদস্যপদ পায় মাহফুজ। ২০১০ সালের দিকে সাইদুর রহমান গ্রেফতার হয়। এরপর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে উত্তরাঞ্চলে জেএমবিকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল মাহফুজ। নারায়ণগঞ্জে নিহত নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। এরপর সে নব্য জেএমবিতে যুক্ত হয়। এখন সে নব্য জেএমবির অস্ত্র কেনা, গ্রেনেড তৈরি এবং সরবরাহসহ আইটি শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের তথ্য বলছে, গত বছরের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় গ্রেনেড সরবরাহ করেছিল সোহেল মাহফুজ। গত বছরের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পর আটক দুই জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল মাহফুজের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, জেএমবির প্রতিষ্ঠাকালীন শূরা সদস্য হিসেবে নাম ছিল সোহেল মাহফুজের। ২০১০ সালে নিষিদ্ধ এ সংগঠনটির আমির সাইদুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর মাহফুজ নিজেকে আমির হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু কারাগারে থেকেও সাইদুর আমিরের পদ ছাড়তে না চাওয়ায় তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। পরে মাহফুজ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে আত্মগোপনে থেকেও জেএমবির নতুন একটি গ্রুপ তৈরি করে। বোমা তৈরি করতে গিয়ে সোহেল মাহফুজের বাম হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে এক হাত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে দক্ষ। ছাত্রজীবনে সোহেল মাহফুজ ছাত্র শিবিরের সদস্য ছিল।
পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, হলি আর্টিজানে হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো সোহেল মাহফুজই সরবরাহ করেছিলেন। জেএমবির সাবেক শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের আমলে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া সোহেল মাহফুজকে অনেক দিনে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুঁজছিলেন বলেও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে আদালতে নেয়ার পথে তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন গ্রেফতার এই সোহেল মাহফুজ। তার জঙ্গিবাদে হাতেখড়ি হয় শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের আমলে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ