‘বিশ্বজুড়ে খাবার পানিতে বাড়ছে আণুবীক্ষণিক প্লাস্টিক তন্তুর ঝুঁকি’

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৭, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে নয়া দিল্লি পর্যন্ত বেশিরভাগ বাসা-বাড়ির পানিতেই এখন আণুবীক্ষণিক প্লাস্টিক তন্তু বা মাইক্রোস্কোপিক প্লাস্টিক ফাইবারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।ওয়াশিংটনভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওআরবি মিডিয়ার এক গবেষণায় এমন দাবি করা হয়েছে।
নিউ ইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব মিননেসোটার গবেষকদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ৫টি মহাদেশের কয়েকটি শহরের ১৫৯টি বাড়ির ট্যাপের খাবার পানি পরীক্ষা করে। এই গবেষণায় ৮৩ শতাংশ বাড়ির খাবার পানিতেই আনুবীক্ষণিক প্লাস্টিক তন্তু পাওয়া গেছে। এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবন দর্শন কেন্দ্র, ওয়াশিংটনের পরিবেশ রক্ষা সংস্থার সদর দফতর ও নিউ ইয়র্কের ট্রাম্প গ্রিলও ছিল।
গবেষকরা জানান, ট্যাপের পানিতে যদি এসব তন্তু থাকে তবে নিশ্চিতভাবেই এই পানি দিয়ে তৈরি খাবার যেমন, রুটি, পাস্তা, স্যুপ কিংবা শিশুর খাবারেও এর উপস্থিতি নিশ্চিত।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় সাগর, মাটি, বায়ু ও বিশুদ্ধ পানিতেও এখন প্লাস্টিক দূষণ হচ্ছে। কিন্তু ট্যাপের পানিতে এর উপস্থিতির বিষয়টি এবারই প্রথম। বিজ্ঞানীরা বলেন, তারা এখনও জানেন না ঠিক কিভাবে বসতবাড়ির পানিতে এই তন্তুর উপস্থিতি। এর ক্ষতিকারক দিক নিয়েও নিশ্চিত নন তারা। ধারণা করা হচ্ছে স্পোর্টসড্রেস, কিংবা কার্পেটের মতো সিনথেটিক কাপড় থেকে এর উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই তন্তুর মাধ্যমে বিষক্রিয়া হতে পারে। মানবদেহের ক্ষতিসাধনও হতে পারে।
প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুষদের সহযোগী ডিন রিচার্ড থমসন বলেন, প্রাণিবিজ্ঞানের গবেষণায় এটা স্পষ্ট যে প্লাস্টিক থেকে এমন রাসায়নিক দ্রব্য বের হয় যা অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য ক্ষতিকর।
গবেষণা দলের মাইক্রোপ্লাস্টিক বিষয়ক গবেষক শেরি ম্যাসন বলেন,‘প্রাণীকূলের প্রভাবের ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য আছে। তাই তাদের ওপর যদি প্রভাব ফেলে, আমাদের ওপর প্রভাব ফেলাই স্বাভাবিক।’
গবেষণায় স্থান ও আয় অনুযায়ী পার্থক্য দেখা যায়। ট্রাম্প গ্রিলে পাওয়া ফাইবারের পরিমাণ ইকুয়েডরের কোয়েটোতে পাওয়া তন্তুর পরিমাণের সমান। এছাড়া বোতলজাত পানিতেও এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও আণুবীক্ষণিক প্লাস্টিক তন্তু বিষয়ে কোনও মানদ- নেই বলে জানিয়েছেন পরিবেশ রক্ষা সংস্থার এক মুখপাত্র। তাদের পরিবেশ দূষণকারী পদার্থ বা উপাদানের সম্ভাব্য তালিকাতেও এমন তন্তুর উপস্থিতির কথা জানা নেই।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের সদস্য দেশগুলোকে বিশুদ্ধ পানি পানের নিশ্চয়তা দেওয়া প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩টি ট্যাপের ৯৪ শতাংশ পানিতেই প্লাস্টিক তন্তু পাওয়া যায়। একই অবস্থা লেবাননের বৈরুতে। এছাড়াও ভারতের দিল্লিতে ৮২ শতাংশ, উগান্ডা কামপালায় ৮১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় ৭৬ শতাংশ, ইকুয়েডরের কোয়েটোতে ৭৫ শতাংশ ও ইউরোপে ৭২ শতাংশ পানিতেই প্লাস্টিক তন্তু পাওয়া গেছে।
নিউইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটির জিওলোজি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ম্যাসন এই গবেষণার রূপরেখা নির্ধারণ করেছেন। ইউনিভার্সিটি অফ মিননেসোটায় এগুলো পরীক্ষা করেছেন গবেষক ম্যারি কসাথ। তিনিই এবছর একটি জার্নালে গবেষণাটি জমা দেবেন।
গবেষণায় তিনি বলেন,‘ট্যাপের পানিতে প্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এটাই প্রথম বৈশ্বিক গবেষণা। এখানে মানুষের প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষতি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। এতে করে আরও বড় আকারে গবেষণা করা ও পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।’
পরিবেশ বিষয়ক পরামর্শমূলক সংস্থা ডিফাফের প্রধান নির্বাহী হুসাম হাওয়া বলেন, ড. ম্যাসনের রূপরেখা অনুযায়ী বিজ্ঞানী, সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা এই স্যাম্পল সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু এটা একদমই প্রাথমিক গবেষণা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ট্যাপের পানিতে প্লাস্টিক কিভাবে এলো এত দ্রুত সেটা বলা যাবে না। কিন্তু অন্যান্য রাসায়নিকের উপস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। হংকংয়ের এডুকেশন ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞানী লিংকন ফোক বলেন,‘মানবদেহের ওপরে এই গবেষণা একদমই সদ্যজাত শিশুর মতো অবস্থায় আছে।’
ওআরবি’র এই গবেষণায় সমাধানের চেয়ে প্রশ্ন বেশি উঠেছে বলে মনে করেন নিউ ইয়র্কের সাবেক ওয়াটার কমিশনার অ্যালবার্ট আপেলটন। তিনি বলেন,‘এটা কি শরীরের প্রভাব ফেলে, কোষে প্রভাব ফেলে, এর কি ক্ষতিকর দিক আছে, এটা থেকে তৈরি খাবারেরই বা কেমন প্রভাব?’
গবেষণা থেকে জানা যায় প্রতি বছর ৩০ কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ মাত্র একবার ব্যবহার করা হয়েছে, কখনও তা এক মিনিটেরও কম সময়ের জন্য। কিন্তু শত শত বছর ধরে এটি পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলবে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৫০ সাল থেকে এখন পযন্ত ৮৩০ কোটি টন প্লাস্টিক উৎপাদন করা হয়েছে।
গবেষকদের দাবি, সমুদ্রপৃষ্ঠে কয়েক হাজার কোটি টন মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা ও ক্যালিফোর্নিয়াতে বিক্রিত মাছেও এই ফাইবার পাওয়া যায়। কিন্তু খাবার পানিতে প্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
লস এঞ্জেলেসের পানি বিভাগের মুখপাত্র দাবি করেন, আমাদের পরীক্ষায় এমন কোনও প্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি। তবে লস এঞ্জেলেসের প্রতি তিনটি বাড়ির পানির মধ্যে দুটিতেই এমন প্লাস্টিকের প্রমাণ পেয়েছে ওআরবি।
কোয়েটোর পানিতে প্লাস্টিক পাওয়া গেছে জানার পর সেখানকার বাসিন্দা মার্সিডিস নোরোনা বলেন,‘এটা খুবই খারাপ। আমি শুনেছি এখান থেকে নাকি ক্যান্সারও হতে পারে। আমি হয়তো বাড়িয়ে বলছি। কিন্তু আমি খুবই আতঙ্কিত।’
২০০১ সালের পর থেকে ৬৩ শতাংশ মার্কিনি দূষিত পানি নিয়ে চিন্তিত। উগান্ডার লেক ভিক্টোরিয়ার জেলে জেমস সেরেকো বলেন,আমরা এর আগে কখনোই এমন কিছু শুনিনি। কিন্তু ৫০০ মিলি লিটার পানিতে চারটি ফাইবার পাওয়া গেছে! পুরো যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া তন্তুর পরিমাণ অনেক বেশি। ক্যাপিটলে প্রতি ৫০০ মিলিতে ফাইবারের পরিমাণ ১৬। অবশ্য, এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংগঠন ট্রাম্প গ্রিলের পক্ষ থেকে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।
প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, প্লাস্টিক তন্তুর একটি উৎসের কথা আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। তা হলো সিনথেটিক কাপড়। প্রতিবার ধোয়ার সময় এখান থেকে ৭ লাখ তন্তু নির্গত হয় বলে দাবি তাদের। এই হিসেব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ময়লা পানির ক্ষেত্রগুলো অর্ধেকের বেশি গ্রহণ করে নেয়। বাকিটা পানির সরবরাহতে যুক্ত হয়। যার অর্থ প্রতিদিন ৬৪ হাজার পাউন্ড তন্তু বের হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই তন্তুগুলো পানির সঙ্গে মিশে বসতবাড়ির পানির লাইনে প্রবেশ করছে। ম্যাসন বলেন,‘আমরা কারও না কারও ব্যবহৃত পানি ঘুরে ফিরে ব্যবহার করছি।’ আরেকটি উৎস হতে পারে বাতাস। ২০১৫ সালে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে প্যারিসের বাতাসে বছরে ৩ থেকে ১০ টা সিনথেটিক তন্তু ভেসে বেড়ায়। পারিস এ ক্রেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক জনি গ্যাসপেরি বলেন, আমরা ভাবি যে শুধু লেকের পানি কিংবা অন্যান্য পানিতে এসব প্লাস্টিক থাকতে পারে। কিন্তু প্যারিসের বাতাসেও আমরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্লাস্টিকের উপস্থিতি দেখতে পাই। এতে করে বোঝা যায় বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিভাবে প্লাস্টিক তন্তু পৌঁছে যাচ্ছে। অর্বের গবেষণায় অবশ্য মাটির নিচ থেকে তুলে আনা পানিতেও প্লাস্টিক তন্তু পাওয়া গেছে। দিল্লি ও জাকার্তায় পাওয়া পানিতে প্রশ্ন উঠে এক মিলিমিটারের ১০ ভাগের এক ভাগ দৈর্ঘ্যের এই তন্তুগুলো কি মাটির নিচ থেকেই আসছে নাকি তুলে আনার কোনও পদ্ধতির কারণে দূষিত হচ্ছে?
কিন্তু আমরা এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানি না। আমরা জানি না,এটা কতটা ক্ষতিকারক। প্লাস্টিক ফাইবারগুলো মানুষসহ প্রাণীদেহের হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে। এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকো-টক্সিলজিস্ট তামার গ্যালাওয়ে বলেন,‘আমরা আগে কখনোই এটা নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন ছিলাম না।’
শহরগুলো কেবল এই সমস্যা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। কাপড় ধোয়ার বিষয়টা এখন সবাই চিন্তা করছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ কার্তিক চন্দ্রন মনে করেন, এখন ধীরে ধীরে কাপড় পরিষ্কারের কারণে আরও বেশি প্লাস্টিক ফাইবার নির্গত হতে পারে এবং ব্যয় বাড়তে পারে।’ কাপড় পরিষ্কার সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, তার আরও পরিবেশবান্ধব সামগ্রী তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। নতুন ফিল্টার, ওয়াশিং মেশিনসহ বেশ কিছু পণ্য এখন এই উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে কোন প্রক্রিয়াটি বেশি কার্যকর। উত্তর আমেরিকা গ্রেট লেকে প্রথম মাইক্রোস্কোপিক প্লাস্টিক খুঁজে পান গবেষক ম্যাসন। কিন্তু ট্যাপের পানিতে এমন উপস্থিতিতে বিস্মিত তিনিও। তিনি বলেন,‘আমাদের খাবার পানিতেও এটা আছে? আমি কখনো এমনটা ভাবে পারিনি।’-বাংলা ট্রিবিউন