বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে

আপডেট: জুলাই ২৫, ২০১৭, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


ইউজিসি (ইউনিভারসিটি গ্র্যান্ড কমিশন) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগ-পদোন্নতি ও পদায়ন ইত্যাদি বিষয়ে একটি অভিন্ন নীতিমালা করার লক্ষ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছেনজ্জযা শিক্ষক সমাজ যৌক্তিক নয় বলে মনে করেন। সভা করে তারা এই ইউজিসির এই পদক্ষেপকে অগণতান্ত্রিক বলে সমর্থন জানান নি। শিক্ষক সমাজ সভায় এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেছেন, ‘এটা স্বায়ত্তশাসনের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।’ তারা আরো বলেছেন, আমলাদের অথবা আমলা মন্ত্রীদের শিক্ষকদের মুক্তচিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং তাদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর ঘৃণ্য মানসিকতার এটি একটি অপকৌশল। যারা এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী নন। এমন কী বঙ্গবন্ধু যে মহান মূল্যবোধের আলোকে ১৯৭৩ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্যে অ্যাক্ট করেছিলেন, ইউজিসির এমন আচরণ বঙ্গবন্ধুর মূল্যবোধের ওপর পেরেক মারতে উদ্যত হয়েছে। শিক্ষকেরা বলেছেন, ‘শিক্ষক সমাজ দুর্নীতিমুক্ত এবং মুক্তচিন্তার অনুশীলক। আমলাদের কারসাজিতে ইউজিসির এমন অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত অবশ্যই জাতির মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন চিন্তা ও কর্মের ওপর আধিপত্য ও প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠার সোপান তৈরি করতে উদ্যত। তারা একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্বায়ত্তশাসনরে রূপরেখার ওপর পরিকল্পিত আঘাত হেনে তাঁকে অসম্মান জানানোর আয়োজন পরিপূর্ণ করতে যাচ্ছে বলে সভায় বিভিন্ন আলোচক মন্তব্য করেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে একাত্তরে অনেক আত্মত্যাগে অর্জিত হয়। এ দেশের সাধারণ মানুষও সুস্থচিত্তে  এমন অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ মেনে নিতে পারে না। শিক্ষকরা দাবি জানিয়েছেন, ‘এই আত্মঘাতী উদ্যোগ এখনই বন্ধ করা হোক। না হলে আগামী নির্বাচনে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। এর ফলশ্রুতি শুভ হবে না।’ কারণ শিক্ষকেরাই জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করেন। তাদের সান্নিধ্যে অবস্থান করে যুবসমাজজ্জযারা ভোটারও। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকেরা স্ব স্ব দেশের নানা উন্নয়ন পরিকল্পনায় সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত। তাদের গবেষণায় বিশ্ব নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হচ্ছে। অধিকাংশ শিক্ষকই ছাত্রের প্রতি যতœশীল। দক্ষ মানুষ গড়ার চেষ্টা করেন। যে দেশে মুক্ত মানসে উত্তর প্রজন্ম গড়ার সুযোগ থাকে না সে দেশ চিরকালই পরনির্ভরশীল। আজকে যারা আমলা তাদেরও এই শিক্ষকেরাই বর্তমান অবস্থানে উপনীত হতে সহযোগিতা ও উৎসাহিত করেছেন। দেশের পররাষ্ট্র নীতিসহ নানা রাজনীতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক রূপরেখা প্রণয়ন তারাই করেন। সেই শিক্ষকদের ওপর ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপরাধপ্রবণ’ আমলাদের প্রভূত্ব করার খায়েশ লজ্জাস্কর এক অধ্যায়ের সূচনা করবে। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাধাও সৃষ্টি করবে এই নীতিমালা গ্রহণ করলে। আমলারা যে শিক্ষকদের কাছে লেখাপড়া করেছে, তাদেরই প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে এই অসম্মানের আয়োজন করতে যাচ্ছে। তাতে দেশময় একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সরকার বিব্রত ও বিপর্যস্ত হবে। সেই সুযোগে আমলারা পরিকল্পিতভাবে দেশবিরোধীদের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে জাতিকে আবার বিভ্রান্ত করতে সুবিধা পাবে। এ ভাবেই সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্গে বর্তমান সরকারের নির্বাচনের অগ্রযাত্রাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। নিশ্চয়ই তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ এবং সংশ্লিষ্টদের ভুল বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করেছে। সরকারকেও সিদ্ধান্ত নিতে হলে চতুর্দিক ভেবেচিন্তে করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আমরা জানি, বর্তমান সরকার যখন বিচার বিভাগকে ক্রমাগত স্বায়ত্তশাসন দিতে রষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কর্মসূচি গ্রহণ করছেন, তখন আমলারাই বেশি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। সরকার যেহেতু বিচার বিভাগকে স্বায়ত্তশাসন দিতে একটি সভায় আলোচনার সময় আমলাদের ঐদ্ধত্য দেশবাসী পর্যবেক্ষণ করেছে। পূর্বের আইনে যেহেতু বিচার বিভাগের ওপরও তারা প্রভূত্ব করতো, সেই প্রভূত্ব খর্ব হলে তাদেরও ক্ষমতার রশিতে খানিকটা টান পড়বে এবং একজন বিচারক তাদের দুষ্কর্মের অভিযোগে শাস্তি দেবেন, এটা তারা মেনে নিতে পারেনি। আজো না। বরং আতঙ্কিত হয়েছিলো। সরকারের দৃঢ়তায় সেখানে ব্যর্থ হয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের ওপর তাদের দুষ্টু হাতের ছায়া বিস্তার করেছে। সেটা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির সময়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দীর্ঘ সময় আন্দোলন করতে হয়েছে। আমলারাই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœসহ শিক্ষকদের মানসিকভাবে উৎপীড়ন করেছে। তারা নানা পর্যায়ে সরকারি অর্থ গ্রহণের এবং পদোন্নতির সুযোগ নেবে, কিন্তু তাদের শিক্ষকেরা নিতে পারবে না। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের যে খবরদারি, সেটা প্রভূ-ভৃত্যের মতো। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’ আমলারা মানে না এই অমোঘবাণী। মানে না। মানে না বলেই এ দেশের শিক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। সেটাও ওই একই কারণে ঘটে। উত্তরপত্রে কতো নম্বর দিতে হবে সেটাও নির্দেশ করে আমলারা। শিক্ষানীতিও প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আদেশ জারি করে আমলারা। নীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সুস্থ ও সাহসী পরিকল্পনার অভাব। অভাব বলেই এই দেশে একমুখি শিক্ষা ব্যবস্থা অনুপস্থিত। ফলে তৈরি হচ্ছে সশস্ত্র জঙ্গি, ধর্মান্ধ আর দেশ বিরোধী সাম্প্রদায়িক দল। অনুৎপাদনশীল খাতে টাকা বরাদ্দ হয় অপরিকল্পিতভাবে। নির্ধারিত সময়ে তারা প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে ফেলে রাখে এ জন্যে যে, আগামী অর্থ বছরে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করা যাবে। কারণ হিসেবে বলবে, দ্রব্যমূল্য ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং বিদেশ থেকে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আসেনি। তাদের জীবন যাত্রাও বৈষম্যের খতিয়ান স্পষ্ট। যে সমাজ ও পরিবার থেকে তাদের অভিযাত্রা, তার তুলনায় সহ¯্র গুণ স্বতন্ত্র তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোথাও যাবেন, তাকে কেউ পাত্তাই দেবে না। পুলিশের কনস্টেবল যতোটা আদরণীয় তার তুলনায় শিক্ষকদের সম্মান, সামাজিক গুরুত্ব অনেক অনেক নিচে। আমলাদের ক্ষমতা এতোটাই সীমাহীন, এতোটাই প্রভূত্ববাদী যে তা ধর্মের মতো অনুকরণীয় এবং আদর্শিক হয়ে উঠেছে। এটা যতোদিন না ভাঙছে, নির্মূল হচ্ছে, ততোদিন কিছুতেই উন্নয়নের রূপরেখা বাস্তবায়ন হবে না। হয় না। তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়েও মহারাজার তুল্য মান্য-গণ্য। আমাদের দেশের মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরাও তাদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের কাছে অনেকেই নতজানু। অথচ তারা সংসদে কতো আইন প্রণয়ন করেন। কিন্তু আমলাদের প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠা আর জননিপীড়নমূলক ক্ষমতার দৌরাত্ম্য খর্ব করার আইন প্রণয়ন করেন না। আগে তাদের পদোন্নতি-পদায়নের বিষয়ে নীতিমালা করতে হবে। পরীক্ষা নিয়ে এবং কাজের পারফমেন্স দেখে তাদের পদোন্নতি দিতে হবে। সরকারের ভয় কিসে এবং কেনো? সামান্য কয়েকটা আমলাই যদি দেশের হর্তাকর্তা বনে যায়, তাহলে দরকার কি মন্ত্রী-সংসদ সদস্য আর ইউজিসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর? ও সব আমলাদেরই করায়াত্ত্বে থাক। দেশবাসী পুলিশ আর আমলাতন্ত্রের খপ্পরে খাবি খাচ্ছে।
আসলে এই দেশটি দীর্ঘকাল সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। মানসিকতাও আমাদের সেভাবে গড়ে উঠেছে। উঠতে-বসতে রবীন্দ্রনাথের সেই ‘পুরাতন ভৃত্য’-র মতো মানসিকতায় অভ্যস্থ হয়েছি আমরা। নতজানু হয়ে সেবা দিয়ে নিজের জীবনটা উৎসর্গ করতে হবে, তবেই সে সেরা সেবকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার সৌভাগ্যলাভ করবে। নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে ‘কেষ্টা’ তার প্রভূর জীবন রক্ষা করলে, গিন্নিও খুশি হয়, কিন্তু কেষ্টার সেবা মূল্যায়ন করে না। বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশার অধিবাসীও যেনো আমলাদের কাছে সেই ‘কেষ্টা’। এর অবসান দেশবাসী চায়। এ থেকে উত্তরণও প্রত্যাশা করে। না গণতন্ত্র নামের শব্দটি আজ আমলাদের আচরণেই তামাশা বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মানুষ ওই স্বৈরতন্ত্রের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করবে কি ভাবে যদি মুক্তচিন্তার ওপর খবরদারি চলে? সে কারণে দেখা যায়, পাঁচ বছর বিএনপি সংসদে নেই, দশ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বেও নেই, ২০০১-এ নির্বাচনের পর একাত্তরের কায়দায় গণনিপীড়ন করলো, ২০১৪-এর নির্বাচনে অংশ না নিয়ে দেশময় বোমাবাজি করলো, নিরস্ত্র মানুষ পুড়িয়ে মারলো, তারপর তো তাদের মুসলিম লীগের মতো অবস্থা হওয়ার কথা। সেটা তো হয়ইনি, উল্টো তাদের অপকথা-অপরাজনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেনো? মানুষ আসলে বোধ হয়, সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িকতা আর ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতি বেশি অনুগত।
শিক্ষকদের তো অস্ত্রও নেই, অনুগত ক্যাডারও নেই। নেই আর্থ-সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষকেরা কোথাও সুপারিশ করলেও কারো পিয়নের চাকরিও হয় না। বিধায়, তাদের যেমন চালানো যাবে, তেমনি চলবে। না হলে শাস্তি দেবে। কারা? আমলারা। ঘুসখোর-দুর্নীতিবাজেরা। অপরাধপ্রবণরা।
তাহলে কি দেশের শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে? নিয়োগ-পদোন্নতির নীতিমালা যদি বাইরের কেউ নির্ধারণ করে, তাহলে সিনেট-সিন্ডিকেট আর একাডেমিক কাউন্সিলের প্রয়োজন কী? আমরা লক্ষ্য করেছি, শিক্ষকদের ওপর সরকারের আস্থাহীনতার কারণে নানা কমিটিতে আমলাকে সদস্য করা হয়। বিশেষ করে অর্থ ও সিন্ডিকেটে। ওদের কোনো নীতি নির্ধারণীতে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষককে সদস্য হিসেবে রাখা হয়? ওদের কোনো কাজের জবাবদিহিতা নেই। মন্ত্রী-সংসদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর আছে। আর আছে শিক্ষকসহ অন্যান্য পেশার অধঃস্তন কর্মচারীর। ওরা শাস্তি দেবে, নীতি নির্ধারণ করবে, ওদের মতো করে, সেই ‘কালোকানুনে’ করবে বিচার। এ ভাবে কি দেশের কল্যাণ-উন্নয়ন সম্ভব? এই তো সেদিন একজন প্রকৌশলীকে ঘুস গ্রহণের সময় হাতেনাতে ধরেছে দুর্নীতিদমন কমিশন। কী হবে ওই দুর্নীতিবাজের, সেটা বিচার বিভাগ নির্ধারণ করবেন। তার সমগোত্রীয় অনেকেই কিন্তু তাকে রক্ষার জন্যে দৌড়-ঝাঁপ করবে। অপরাধীর পক্ষে সাফাই গাওয়া আরেক অপরাধ। সেটা দমনের জন্যেও আইন প্রণীত হওয়া জাতির প্রত্যাশা করে। কেবল অপরাধের অভিযোগে মন্ত্রী-সংসদ সদস্য নিন্দিত হবেন, শাস্তি পাবেন, এটা প্রত্যাশিত নয়। কেনো বছর পেরিয়ে গেলেও সাগর-রুণি আর তনুর মতো অনেকের হত্যার চার্জসিট আজাব্দি হয়নি? সেটার জবার কে দেবে? না দেয়ার পেছনে কারসাজি আমলাদেরই কেউ প্রচ্ছন্নভাবে ক্রিয়াশীল। ইচ্ছে করলে তাদের সরকার তাদের আদালতে হাজির করে বিলম্বের কারণটা জেনে নিতে পারেন।
এখন আবার শিক্ষকদের ওপর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইউজিসি কর্তৃপক্ষকে মোটিভেট করে অধীনত্বের নীতিমালা করতে উদ্যত হয়েছে। তারা যে সফল হবে না, সেটা আগাম বলে দেয়া যায়। কোনো অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই গ্রহণযোগ্য নয় বলে শিক্ষক সমাজ মনে করে