বিশ্ববিদ্যালয় আইন: প্রায়োগিক সমস্যা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক


বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তথা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪০টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৫টি। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বমোট সংখ্যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। দেশ পরিচালনার জন্য যেমন আমাদের একটি সংবিধান আছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় আইন এবং অধ্যাদেশ। দেশের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় একই আইন বা অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এমন কথা বলা যাবে না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ প্রণয়নের মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে সময়ের ব্যবধানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় এমন কিছু সমস্যা দেখা দেয় যা সমাধানের জন্য ১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবার পর মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার স্বার্থে ১৯৯২ আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং একটি যুগোপযোগী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের খসড়া ২০১০ সালের জুলাই মাসের সংসদ অধিবেশনে গৃহীত হয়। বর্তমানে দেশের সবগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০ আইনেই পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ চালু হওয়ার ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শৃঙ্খলা অনেকটা ফিরে এসেছে, দেশের যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা শাখা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। তাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষার মান অনেকটা উন্নত হয়েছে। তবে একথা ঠিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর সবগুলো ধারার প্রয়োগ খুব সহজ ব্যাপার নয়। প্রায়োগিক কিছু সমস্যা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। আইনে বলা হয়েছে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ৭ বছরের মধ্যে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে তাদের কার্যক্রম চালাতে হবে। এই আইনটি যদি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, সে ক্ষেত্রে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবে। ২০১০ আইনে বলা হয়েছে অনুমোদন প্রাপ্ত প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাননীয় চ্যান্সেলর অনুমোদিত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং ট্রেজারার থাকতে হবে। আইনের এই ধারাটিও যদি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেমে যাবে। এটি বাস্তব সমস্যা।
এবার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুন একটু ভিন্নতর। দেশে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪০টি। স্বাধীনতাপূর্বকালে প্রতিষ্ঠিত পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় ১৯৭৩ অ্যাক্ট দ্বারা। অ্যাক্টের বাংলা করা হয়েছে অধ্যাদেশ। অবশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন দ্বারা। প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য তাদের নিজ নিজ আইন আছে। সে আইন সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত। আইন দ্বারা যে সমস্ত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়, সেখানে আইনের প্রায়োগিক সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম। তবে যে সমস্ত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হয়, সেখানে অধ্যাদেশের কিছু কিছু ধারায় প্রায়োগিক সমস্যা আছে। উদাহরণ হিসেবে এ মূহূর্তে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ধারাটি আলোকপাত করছি।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে নানারকম প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমরা জানি ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে আইন দ্বারা পরিচালিত হতো, সে আইনগুলোকে আমরা বলতাম ‘কালো আইন’। উক্ত আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোন রকম স্বাধীনতা ছিল না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণমুখি অধ্যাদেশ প্রণয়নের দাবি ওঠে। অধ্যাদেশের দাবিতে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে শুরু হয় আন্দোলন। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন’। ১৯৭২-৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসর মনোয়ার হোসেন। তখন আমি ছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির একজন নির্বাচিত সদস্য। সেই সুবাদে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তার সাথে আমারও গভীর সম্পৃক্ততা ছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশটি মোটেই সহজলভ্য ছিল না। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশটি। আমরা জানি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিক্ষকদেরকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন, শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার প্রতি তিনি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন। যার ফলে বিশ্ব¦বিদ্যালয় অ্যাক্ট/অধ্যাদেশ-১৯৭৩ মহান জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে অধ্যাদেশটি বর্তমানে কি অবস্থায় আছে তা পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ প্রসঙ্গ তুলে ধরছি। বাংলাদেশের এই দুটো বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেটের মাধ্যমে উপাচার্য নির্বাচনের যে বিধি ছিল, সে বিধি প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছে। বিধি অনুযায়ী প্রতি চার বছর পর সিনেটের মাধ্যমে উপাচার্য নির্বাচিত হবার কথা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটের মাধ্যমে সর্বশেষ উপাচার্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালে। এরপর ১৭/১৮ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটের মাধ্যমে আর কোন উপাচার্য প্যানেল তৈরি হয় নি।
এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মহোদয়কে অস্থায়ীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়। মাননীয় চ্যান্সেলর তাঁর নিজ ক্ষমতাবলে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছিলেন তবে শর্ত ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য মহোদয় সিনেটের অধিবেশন ডেকে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনজনের একটি উপাচার্য প্যানেল তৈরি করে চ্যান্সেলর মহোদয়ের কাছে পাঠাবেন এবং সে প্যানেল থেকে মাননীয় চ্যান্সেলর যে কোন একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দান করবেন।
বিলম্বে হলেও প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিক সিনেটের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি প্যানেল মাননীয় চ্যান্সেলরের কাছে পাঠিয়েছিলেন। প্যানেলে প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিকের নাম ছিল। যেহেতু তিনি অস্থায়ীভাবে কর্মরত উপাচার্য ছিলেন, তাঁকেই মাননীয় চ্যান্সেলর চার বছর মেয়াদে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দান করেন। এর ফলে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশটি গতি পায়।
প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিকের গতিশীল নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভালোই চলছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ যখন বুঝতে পারেন প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিক সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে আরও এক টার্ম উপাচার্য হতে আগ্রহী, প্রগতিশীল শিক্ষকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে মারাত্মক বিভাজন দেখা দেয়। শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন কোনোরকমে পার করা গেলেও সিনেট কর্তৃক উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয় এবং এক পর্যায়ে প্রগতিশীল শিক্ষকদের বেশ কিছু সদস্য সিনেট সভা বর্জন করে বিষয়টি আদালতে নিয়ে যান। আদালত থেকে নির্দেশ আসে বিষয়টির মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত কর্মরত উপাচার্য প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিকের মেয়াদ শেষ হলেও তিনি তাঁর কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।
কিন্তু এর মধ্যে সমগ্র জাতি লক্ষ্য করেছে মাননীয় চ্যান্সেলর মহোদয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর আক্তারুজ্জামান সাহেবকে অস্থায়ীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দান করেছেন।
তবে এ সব ঘটনার মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকদের মধ্যে ঐক্যের যে ফাটল ধরেছে, জাতির জন্য তা দুর্ভাগ্যজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবার মত মেধা এবং অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষকেরই রয়েছে। বিশেষ করে জীবনে একবার উপাচার্য হবার প্রত্যাশা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের থাকতেই পারে। এটা তাদের মর্যাদার বিষয়। সম্প্রতি উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে পুনর্নিয়োগের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেড়ে গেছে, এর ফলে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে অভিজ্ঞ সিনিয়র শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা এবং নৈরাশ্য বেড়ে যাবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটের মাধ্যমে উপাচার্য নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সিনেটের মাধ্যমে উপাচার্য নির্বাচনের বিষয়টি অকার্যকর হয়ে যাবে কিনা, এখন তা দেখবার বিষয়। আইন আছে অথচ তার প্রয়োগ নাই, উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমনটি হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। ১৯৭৩ অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ব্যাপারে প্রায়োগিক সমস্যা যদি হয়েই থাকে, সে ক্ষেত্রে পার্লামেন্টের মাধ্যমে ১৯৭৩ অধ্যাদেশটিকে সংশোধন করে নেয়া যেতেই পারে।
লেখক: উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী; সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
nbiu.edu@gmail.com