বিশ্ববিদ্যালয় হোক আরো জ্যোর্তিময় আরো প্রভাময়

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৭, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়। তার পরিধি সর্বময়। সম্মানও সমাজ স্বীকৃত। মেধাবী ছাত্ররাই পরবর্তী জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষক হন। তারা স্বাধীনভাবে এবং মুক্তমনে দেশের কল্যাণ ও উন্নয়ন চিন্তা করে একটি জনগোষ্ঠিকে ক্রমাগত আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যান। এমনটাই মানুষের প্রত্যাশা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন ও কল্যাণ চিন্তা, দিকনির্দেশনা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা করেন। সরকার সে আলোয় রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও কল্যাণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। আমাদের মতো দেশগুলো দলীয় স্বার্থ এবং নানা ভেদবুদ্ধির কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারো পরামর্শের তোয়াক্কা করেন না। তারা নিজেদের মতো করেই  দেশ ও সমাজ পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক সময় জনসাধারণের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে পড়ে ক্ষমতাচ্যুত হন। বাংলাদেশে যেমন ১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদ তারপর বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালে গণ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধে পদত্যাগ করে জাতীয় নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ওই বছরই ফেব্রুয়ারি মাসে ভোটারবিহীন ভোটে বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করছিলেন এবং গণরোষে পতিত হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে জাতীয় নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সে বছর বিরোধী পক্ষ আওয়ামী লীগসহ দেশের অন্যান্য দল ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিলো। ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হতেই দেননি। অর্থাৎ জামাত-বিএনপি’র চক্রান্ত বাস্তবায়ন হতে দেননি। কিন্তু আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে যে নির্বাচন করেছিলো, সে নির্বাচনে কাউকে অংশগ্রহণে বাধা দেয়নি, তার বিরুদ্ধে জামাত-বিএনপি ছাড়া আর কেউ নাশকতা করেনি। হত্যা-ধর্ষণ এবং বোমা ছুঁড়ে পুড়িয়ে মারেনি। বরং নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপি নেত্রী যুদ্ধাপরাধী দল জামাতের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্বাচন বর্জন করলেও ভোটকেন্দ্র ছিলো সবার জন্যে উন্মুক্ত, সকলেই নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তার সমর্থন ব্যক্ত করে এসেছিলো। আর বেগম জিয়া ক্ষুব্ধ কণ্ঠে অশ্লীল ভাষায় ঝগড়া করেছিলেন। এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসীদের মধ্যে পার্থক্য। বিএনপির সৃষ্টিই কেবল ক্ষমতায় আসীন হওয়া, গণনিপীড়ন করা, জনকল্যাণ নয়। তাই তারা জনবিচ্ছিন্ন আদর্শহীন এবং দেশের স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধ বিরোধী একটি দল। তারা যতোবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, ততোবারই জনরোষে পদত্যাগ করে নিজেদের ব্যর্থতার এক কালো খতিয়ান রেখে গেছেন। তাদের দলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপাচার্য ও গবেষক আছেন, যারা সব সময়ই অপকর্ম, মিথ্যেচার আর নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে জনমানসকে বিভ্রান্ত করতে সদা পারদর্শিতা দেখান। নিজেরা নির্বাচনে অংশ না নিলেও সে দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে আত্মতুষ্টিলাভ করে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তাদের সমর্থক আছেন, তারাও সে তালে নাচতে গিয়ে পরাস্থ হয়ে বেকায়দায় পড়েন। এ সব খবর দেশবাসী প্রতিদিন সংবাদপত্রে পড়ে এবং টেলিভিশনের বদৌলতে উপভোগও করে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যখন দুর্নীতি, দুষ্কর্মে জড়িয়ে পড়েন, তখন সাধারণ মানুষ আশাহত হন। তাদের স্বপ্ন ভাঙে। মানুষের আশা, বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্যোর্তিময়ী প্রভায় বিকশিত। কিন্তু শিক্ষক এবং কর্তৃপক্ষের অসততা কিংবা অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার তথ্যে ভীষণ কষ্ট পায়।
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ঢাকায় মাটি কিনে সেখানে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অবস্থানের সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করেন। তাদের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এই কর্তৃপক্ষ রাজশাহী সদর আসনের মাননীয় এমপি জননেতা ফজলে হোসেন বাদশার বরাদ্দ দেয়া এককোটি টাকা ব্যয়ে শহীদ ড. শামসুজ্জোহার কবর সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রশাসন ভবনের পশ্চিমে এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দক্ষিণে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক স্তম্ভ নির্মাণেরও উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডের ভেতরে একাত্তরের অজ্ঞাত শহীদের কবরটি স্থানান্তর করেননি। সেই শহীদের কবরস্থানে অনেক ছাত্র জুতো ফিতে বাধে, অনেকেই মুড়ি-চানাচুর খেয়ে ঠোঙাটা কবরের ভেতরে ছুঁড়ে দিয়ে অসম্মান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে এই কবরটি স্থানান্তর করলে অন্তত মুক্তিযুদ্ধে যারা স্বজন হারিয়েছেন, তারা শান্তি ও স্বস্তি পেতেন। সে কাজটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনো কর্তৃপক্ষ সম্পন্ন করেননি। কেনো করেননি তার সদুত্তোর তারাই ভালো দিতে পারবেন।
সম্প্রতি ঢাকায় জমি কেনা ও সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্যে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’, ‘দৈনিক প্রথম আলো’সহ স্থানীয় পত্রিকায় পরিবেশিত হয়েছে। দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলোর পরিবেশিত সংবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্তৃপক্ষের মর্যাদাকেও ভূ-লুণ্ঠিত করেছে। মানুষ বিস্মিত হয়েছে এই মর্মে যে, তারা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যা ভাবেন, সেখানকার শিক্ষক-কর্তারা তার বিপরীত। ঘটনা সত্যি হোক আর না-ই হোক, দেশময় তো এই অভিযোগের সংবাদ পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ দেশবাসীর প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জ্ঞানচর্চা করবেন, একটি শিল্প-শিক্ষা আর আর্থ-রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়া জাতিকে উন্নতির পথে নিয়ে আলোর নিশান জ্বালাবেন। এই বিশ্বাস-আস্থা ও শ্রদ্ধার জায়গাটি আমরা নিজেদের দুষ্কর্মের জন্যে হারাচ্ছি। ক্রমাগত মানুষ শিক্ষকদের ভীষণ অনাস্থা ও অবিশ্বাস করছে। তারা কোচিং নিয়ে ব্যস্ত। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেখে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। পরীক্ষার রেজাল্ট দিতে বছর পার করেন। শিক্ষার্থীরা পড়ে অনিশ্চয়তার ভেতরে। দেশের সর্ব্বোচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কত্তারা এবং তার সঙ্গে কতিপয় সুযোগ সন্ধানি শিক্ষক-কর্মকর্তা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের গোপন লক্ষ্যে যে দুষ্কর্ম প্রতিদিন করছেন, তার খতিয়ান দিলে মহাভারত রচিত হবে। সুযোগ সন্ধানিরা কত্তাদের যে পরামর্শ দেন, সে অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে তারা আজকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছেন। এটা সত্যি লজ্জার বিষয়। ভীষণ কষ্টের ও প্রতিবাদেরও। সকল শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী সমাজের লজ্জা। শিক্ষকেরা কি তাহলে নিজেরা দুর্নীতিগ্রস্ত এবং তার ফলশ্রুতিতে এমন দুর্নীতিবাজ তৈরি করছেন? এ জন্যে এ কথা উচ্চারণ করতে হচ্ছে যে, দেশে যারাই ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত। শিক্ষিতরাই নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। আবার অনেকেই শিক্ষক হয়েই নিজেদের আকাশ তো দূরে থাক, মহাকাশের বাসিন্দা ভাবেন। তারা আর মাটির মানুষকে দেখতে পান না। দেখার চেষ্টাও করেন না। পদ-পদবি নিয়ে, ছাত্রদের কম-বেশি নম্বর দেয়ার ক্ষমতা পেয়ে যার পর নাই দুষ্কর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তাদের গবেষণার কাজ নেই, নেই লেখালেখি, শুধু পদ-পদবি আর শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভূত্ব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় যুক্ত হওয়া। লোভ আর তোষামোদী-মোসাহেবীতে তারা কেউ কেউ অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ সব  কোনো চোর-বাটপার প্রবণতা হতে পারে, কিন্তু কোনো শিক্ষকের না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে যা ভাবছে দেশবাসী, তার ভেতরের চিত্র ভয়ঙ্কর। স্বাভাবিক সমাজ-পরিবার থেকে তারা স্বতন্ত্র। এ যেনো জনবিচ্ছিন্ন সামরিক ছাউনির কত্তাদের আচরণ। জনগণের সঙ্গে যোগসূত্র নেই। তাই কি সংবাদপত্র এমন ক্ষোভ প্রশমন করেছে।
এমন হতে পারে, সংবাদপত্রগুলো অনুমানের ওপর কিংবা কারো কান কথায় এমন অসম্মানজনক তথ্য পরিবেশন করেছে। আবার অনেকে বলছেন, সাংবাদিকদের কী দায় পড়েছে এ ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করবেন? এক পক্ষ কি অপর পক্ষের পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাধাচ্ছেন? সেটাও বা মানবে কেনো মানুষ? কারণ যারা সংবাদ পরিবেশন করেছেন, তারা তো রীতিমতো তথ্য-উপাত্ত নিয়েই করেছেন। জমির দলিলের নম্বর, তারিখ, যার কাছে জমি কেনা হয়েছে তার নাম, আবার টেন্ডার ব্যতিরেকে তাকেই দিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করানো হচ্ছে, এ সবই পরিবেশিত সংবাদে লিপিবদ্ধ হয়েছে। আবার অনেকে বলছেন, বর্তমান কর্তৃপক্ষ সৎ-নিষ্ঠাবান এবং দক্ষ প্রশাসক। কেউ বলছে, এ প্রশাসন আঞ্চলিকতায় গভীর আস্থাশীল হওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়িয়েছেন, যাকে কেবল সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গেই মেলানো যায়। এ রকম মিশ্র প্রতিক্রিয়া জনমনে প্রতিনিয়ত আমাদের এই ছোট্ট মফস্বল শহরে শোনা যাচ্ছে। এ সব সংবাদ পরিবেশিত হওয়ার পর আমরা অনেকেই শিক্ষক ক্লাবে গিয়েছিলাম। সেখানে সাধারণ শিক্ষকদের বিশেষ করে যে সব শিক্ষক এই প্রশাসনের দ্বারা কারণ দর্শাও নোটিশ পেয়েছেন, যারা ফেসবুকে মন্তব্য করার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন, যারা নারী কেলেঙ্কারির অপবাদে চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাদের কিছু সমর্থক শিক্ষকের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষকও বর্তমান প্রশাসনের ওপর ভীষণ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্মার্টকার্ডের জন্যে ৪ শো টাকা বেতন থেকে কেটে নেয়ায় অনেকে সেটাকেও কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির খতিয়ান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ তারা ঢাকা-চট্টগ্রামে নাকি ওই স্মার্ট কার্ড করতে অর্ধেকেরও কম মূল্য ব্যয় হয় বলে তথ্য নিয়ে এসেছেন। এখন কোন্টা যথার্থ, কোন্টা বে-ঠিক সে দোটানায় আমাদের মতো অতিসাধারণেরা পড়ে কেবল শুনেই যাচ্ছি, সঠিক কথা তো বলতে পারছিনে। তবে জনমত বলে একটা কথা আছে। সেটাকে আস্থায় নিলে তাদের বক্তব্যের খানিকটা তো যথার্থ বলে আমরা মনে করি। প্রবাদে আছে ‘যা রটে তা কিছুটা বটে।’ অর্থাৎ যে অভিযোগ সংবাদপত্রে পরিবেশিত হয়েছে, তার কিছু সত্যি না হলে কেনো এবং কোন্ উদ্দেশ্যে এমন সংবাদ পরিবেশিত হলো? যদি সাংবাদিকেরা মিথ্যে কথা লিখে থাকেন, তাহলে আইসিটি আইনে তাদের বিরুদ্ধে অভিযুক্তরা মামলা করতে পারেন। মিথ্যে হলে অভিযোগ করাটাই সঙ্গত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকেরা অন্তত সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্তাদের সমর্থন দেবেন বলে আশা করা যায়। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার সবাই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজে’র সদস্য। অবশ্য মাননীয় উপাচার্যের বিরুদ্ধে কেউ কেউ অভিযোগ করেন, তিনি ২০০৮-এ ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ জন শিক্ষককে সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় গঠিত তত্ত্বাবধায় সরকারের পুলিশ গ্রেফতার করলে সন্তোষ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সে সময়ের উপাচার্য কর্তৃক গঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গঠিত ‘শান্তি কমিটি’র সদস্য পদ গ্রহণ করেছিলেন। শোনা যায়, দু-একটি সভায় উপস্থিত হয়ে তিনি দেশের ভাব-গতি তার প্রতিকূলে মনে হওয়ায় আর সভায় যাননি। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, সামরিক সরকার দীর্ঘস্থায়ী হবে, ওই দলের শুরু থেকে সদস্য ও সমর্থক না হলে উপাচার্য হওয়া যাবে না। সে বছর আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রেফতারের পর প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের অধিকাংশ শিক্ষকই ওই গ্রেফতারের প্রতিবাদে নৈমিত্তিক ছুটি নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নাকি দলের সে সিদ্ধান্তও মানেননি। শিক্ষক গ্রেফতারের পর কয়েকজন সাহসী শিক্ষক সশস্ত্র বাহিনীর ত্রাসের মুখেও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষক গ্রেফতারের প্রতিবাদ এবং তাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়ে একটি প্রেস বিবৃতি তৈরি করে অনেকের সামনে ধরেছিলেন স্বাক্ষর নেয়ার জন্যে। মাত্র ১১ জন শিক্ষক ব্যতীত কেউ সে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেননি। আজকের উপাচার্যসহ এখন যারা উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য হওয়ার স্বপ্নে শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নিজেদের জীবন-বৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন, তারাও কেউই স্বাক্ষর করেননি। বরং সেদিন স্বাক্ষর সংগ্রহকারীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তারা ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এই রূঢ় সত্যের তিক্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমি নিজেও যুক্ত। আমাকেও সেদিন এটা ভুল, ওটা কেনো লিখেছেন, কার হুকুমে এ সব করছেন, আপনি এ সব করার কে ইত্যাদি নানা প্রশ্নের বাণ তারা ছুঁড়েছিলেন। একাত্তরেও এমন সুযোগ সন্ধানীর দেখা আমরা পেয়েছি। দুঃখের বিষয় হলেও হয়তো সত্যি যে, এই ওরাই এখন ভিসি কিংবা প্রোভিসি হবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় পরামর্শে মহামান্য আচার্য সে পরামর্শের অনুগামী হবেন। এরা যদি পদ-পদবি লাভ করেন, তাহলে আজকে যা সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে, তা না হলেও সংকটে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমর্থক খুঁজে পাবেন না। পাবেন তাদের, যারা ২০০৮এর মহাসংকটেও প্রতিদিন অর্থ সংগ্রহ, বিবৃতিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন,তারা। তারাই সেদিন বন্দি শিক্ষকদের ঈদ-পূজোয় জেলখানায় মিষ্টি-সেমাই-বিরানী পৌঁছে দিয়েছিলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের পথে সকল ঝুঁকি-উপদ্রব সহ্য করে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যাবেন। এটাও নির্ভেজাল সত্যি। আমাদের উপ-উপাচার্য একজন ভালো মানুষ হিসেবে আমাদের জানা। তিনি টিআইবি’র কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্তও ছিলেন। সুতরাং তার ভাবমূর্তি সংবাদপত্র ক্ষুণœ করলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। দেশবাসী ন্যায় ও সত্যের সঙ্গে থাকবো।
বিশ্বের সব দেশের রাজনীতিকদের মতো আমাদের দেশেও অনেকেই নানা কু-কর্মের হোতা তারা। অপরাধ, ঘুস-দুর্নীতি, দখলবাজি ইত্যাদির সঙ্গে অনেকেরই খাতির। জোর দস্তি। তারা বিশ্ববিদ্যালয়েকে বেকার সমস্যার প্রধান ক্ষেত্র মনে করেন। যদি কখনো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদ ফাঁকা হয়, তাহলে যতো সংখ্যক পদ পূরণের জন্যে বিজ্ঞাপিত হয়েছিলো, তার চেয়ে বেশি তালিকা তারা সহাস্যে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করে তার দলের কর্মীদের বেকারত্ব মোচনের জোর দাবি জানান। নিয়োগ কর্তারা তখনই পড়েন বিপদে। ওদিকে ধান্দাবাজ নেতারা চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা নেন, এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তপক্ষকে বলেন বেকার সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করতে। বিশ্ববিদ্যালয় পঠন-পাঠন, গবেষণা আর মুক্তচিন্তা, অবাধ আলোচনা সর্বোপরি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও রাজনীতিক চিন্তা ও কর্মের উন্মুক্ত শান্তির ময়দান। সেখানে চাকরির জন্যে নেতৃত্ব কিংবা দল নানা রকম প্রতিবন্ধকতা ও হুমকি-ধামকির আয়োজন করেন, সেটা অপ্রত্যাশিত। সেটা রাজনীতির অঙ্কে মেলে না। মেলে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে। রাজশাহীর মতো একটি ছোট শহরে কেবল কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে, সে অনুপাতে শিল্প-কারখানা এবং বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে এখানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধিটা চোখে পড়ে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এমন কি খুলনায়ও পড়ে না। সেখানে তারা কোনো না কোনো কাজ জুটিয়ে নেয়। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষক, নার্স, পুলিশ, কলেজ শিক্ষকসহ নানা পদে কয়েক লক্ষ বেকারকে নিয়োগ দিয়েছেন। অনতিবিলম্বের দুই লক্ষাধিক পদে নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পদ্মাসেতু ইত্যাদির কাজ নিজস্ব অর্থায়নে করছেন। এই দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থিরা পিছিয়ে দিয়ে পরনির্ভরশীল করতে তৎপর ছিলো, তারা এখন রাজনীতির বাইরে। সংসদেও নেই। কারো কারো যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার হয়েছে। তাদের চেলারা আত্মগোপনে থেকে সন্ত্রাসী কর্মকা- চালাচ্ছে। এই সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাসী, জঙ্গি আর ঘুসখোর-দুর্নীতিবাজদের রুখে দাঁড়ানো প্রতিদিনের মূল কাজ। চাকরি নিতে এবং দিতে হলে তাদেরই নির্বাচিত করতে হবে যারা দেশবিরোধী-জঙ্গি-সন্ত্রাসী বিরোধী প্রতিটি কর্মসূচি সফল করতে রাজপথে এবং সমাজ-পরিবারে চিন্তা ও কাজ করেন তাদের গুরুত্ব দিতে হবে। সুযোগ সন্ধানী ‘ঋতুর পাখি’দের কাজ করে প্রমাণ করতে হবে তারা দলের ত্যাগী ও সাহসী কর্মী, তারপর তাদের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। তাদের দলের নেতৃত্বে আসীন করাটাও নেতাদের নিবুর্দ্ধিতা। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে ছেড়ে খুনি ও ষড়যন্ত্রকারী মোস্তাককে ধরে বঙ্গবন্ধু যে ভুল করেছিলেন, এটাও সে রকম একটি রাজনীতিক ভুল। এদের আগে রাজপথে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীদের গুরুত্ব দিতে হবে। এই শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা চাকরি নেবেন ও দেবেন তাদেরও সেটা ভাবতে হবে, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের মর্যাদার ও তার গুরুত্বের কথা। এ সব বিবেচনা যাদের নেই তারা চাকরিচ্যুত করতে সিদ্ধহস্ত রাবি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কোনো কিছু অর্জন তাদের দ্বারা সম্ভব নয়, যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের লক্ষ্যে সাড়ে তিনশো কোটিরও বেশি টাকা বর্তমান সরকার বরাদ্দ দিয়েছেন। সে টাকা কারা সঠিকভাবে ব্যয় করে বিশ্ববিদ্যালয়কে সার্বিকভাবে উন্নয়নের পথে উপনীত করবেন তাদের চিন্তা ও ধান্দার গোপন খোঁজ-খবর নিয়ে সে পদে যোগ্যদের দায়িত্ব দিতে হবে। নয়তো এবার সাড়ে সাত কোটি টাকার জালিয়াতি ও কেলেঙ্কারির তথ্য সংবাদপত্রে পরিবেশিত হয়েছে, তখন সাড়ে তিনশো কোটি টাকার জাতিয়াতি ধরা পড়বে। অনেক সিভিদাতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নন, পরিবার জামাত-মুসলিম লিগ নয়তো রাজাকার। এখন করে বিএনপি। সমুদয় বিষয় বিবেচনায় রেখে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি এবং সরকারের উন্নয়নের ধারা গতিশীল করার ওপর গুরুত্ব যারা দেবেন তারা দুষ্প্রাপ্য নন, সরকারের পাশে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল গতিশীল কর্মের সঙ্গেই আছেন। আজ থেকেই শুরু হোক সেই কাজ যা দেখে ও শুনে দেশের মানুষ বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের সম্পর্কে পূর্বের ভালো ধারণা অক্ষুণœ রাখতে পারবেন। তার জন্যে শিক্ষককে শিক্ষক হতে হবে। এটাই আজকের আন্তরিক আহ্বান। মানুষ যেনো আগের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষা এবং পরিবেশ সম্পর্কে সুস্থ ও শুভ চিন্তা করার সুযোগ পায়। নতুবা এ ধরনের জালিয়াতিদের অপরাধের কারণে সমগ্র শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং পুরো প্রতিষ্ঠান অমর্যাদা শিকারে পরিণত হবে। আমরা কি অপরাধপ্রবণ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে অবিশ্বাসীদের এমন গুরুদায়িত্ব পুনর্বার দিতে চাই? আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় হোক দক্ষ ও দেশপ্রেমিক মানুষ গড়ার অন্যতম আবাসস্থল। আলোর অনির্বাণ জ্যোতি বৃদ্ধির অঙ্গীকারে আরো সুদৃঢ় আরো সাহসী সৈনিক।