বিশ্বস্বাস্থ্য দিবসের প্রত্যয় ,বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও কিছু প্রস্তাবনা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২১, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

সৈয়দ আলী:


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
খ) প্রশাসনিক অফিসার/ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তৈরিকরন: এমবিবিএস পাস করার পর, বিসিএস উত্তীর্ণ হ’লে তারা সরকার নিয়ন্ত্রিত হাসপাতাল/ স্বাস্থ্য বিভাগের স্থাপনাগুলিতে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে যারা এমপিএইচ/ ইএমপিএইচ/ পিএইচডি /স্বাস্থ্যে ডিপ্লোমা ডিগ্রি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অথবা যে সব বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হতে স্বাস্থ্য বিষয়ক ডিগ্রি অর্জন করবেন তারা সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের উচ্চতর পদের জন্য বিবেচিত হবেন। পেশাগত দল (Professional group) ব্যবহারিক অথবা পেশাগত দল (Professional group) গবেষণা, প্রকাশনা এবং পাঠদান দল থেকে নেয়া সমীচীন হবে না। তবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে প্রয়োজন- এমন ক্ষেত্রে ক-এর (১) ও (২) এবং খ- দলের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত।
গ) জেনারেল প্র্যাকটিশনার তৈরিকরণ : উপরোক্ত প্রতিষ্ঠান সমূহে যে ডাক্তার প্রয়োজন তার বাইরে অনেক ডাক্তার থাকবে যারা কোনো দিন বিসিএস উত্তীর্ণ হবে না এবং বিভিন্ন কারণে এমবিবিএস পাসের পর কোনো ডিগ্রি অর্জন করতে না পেরে জেনারেল প্র্যাকটিশনারই থেকে যাবেন। এই দলভুক্ত ডাক্তারদের কিভাবে ভাল জেনারেল প্র্যাকটিশনার তৈরি করা যায় এবং সরকারিভাবে অন্ততঃ কিছুদিন/কয়েক বছর উপ-জিলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে/ ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের নিয়োগ দেয়া যায় সে দিকে নজর দিতে হবে। ২৩ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত ১৩৫ টি মেডিকেল কলেজে মোট রেজিস্টার্ড মেডিকেল ডাক্তার ছিল ৫৪ হাজার ১৬৪। আমাদের দেশে ১৮৪৭ জন নাগরিকের জন্য একজন ডাক্তার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে বাংলাদেশে ডাক্তার রোগিরর অনুপাত হ’ল ৫.২৬ জন ডাক্তারের জন্য ১০,০০০ জন নাগরিক, ভারত ৭.৭৭, পাকিস্তান ৯.৭৫, শ্রীলঙ্কা ৯.৫০, নেপাল ৬.৫, মায়ানমার ৮.৬ এবং মালদ্বীপ ২২.৩। বাংলাদেশে ১০,০০০০ রোগির অনুকূলে ৫.৮ জন নার্স আর ভারতে ২১.০৭, শ্রীলঙ্কা ২১.১৫, নেপাল ২৬.৮৫, ভুটান ১৫.০৯, মায়ানমার ৯.৭৯, পাকিস্তান ৫ এবং যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত আফগানিস্থানে ৩.০২ জন।
২১ জুলাই ২০১৯ এর হিসেবে বাংলাদেশে এমবিবিএস ও বিডিএস (ডেন্টাল সার্জন) সহ মোট রেজিস্টার্ড ডাক্তারের সংখ্যা ৮৬,৮০০ জন। এর মধ্যে মাত্র ২০,০০০ ডাক্তার সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত, যা ১০,০০০ জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র ১.২ জন ডাক্তার মাত্র। স্বাস্থ্য বুলেটিন ২৩ জুলাই, ২০২০ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল ২০০৬ হ’তে ২০১৮ পর্যন্ত মোট ৫৪১৬৪ (২৫,৭৩৯ পুরুষ এবং ২৮,৪২৫ নারী) জন ডাক্তার রেজিস্ট্রিভুক্ত হয়েছে। .১১ ফেব্রুয়ারি , ২০২১ পর্যন্ত মোট ৬৬ হাজার ৯ শত ৫৮ আটান্ন জন নার্স রেজিস্টার্ড করা আছে। প্রতি ১০,০০০ (দশ হাজারে) জনগণের জন্য ৫.৮ জন নার্স কর্তব্য পালন করছে। জনগণের দোরগোঁড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ১৯৫ দেশের তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩ তম। আর এ এলাকায় শ্রীলঙ্কা ও চীনের পিছনে।
২৬ জুলাই ২০২১ কোভিড- ১৯ মহামারী ঠেকাতে চিকিৎসা ও অন্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে আরও চার হাজার ডাক্তার ও চার হাজার নার্স মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়োগ দানের প্রক্রিয়া শুরু করেছ। এতে স্বাস্থ্য সেবা আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বলে সবার আস্থা বাড়ছে।
এখানে সহজেই অনুমেয় যে আমাদের দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে কতজন ডাক্তার (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) প্রয়োজন। আমাদের এখানে কারিগর আছে প্রতিষ্ঠান নেই। যে একটা প্রতিষ্ঠান বিসিজিপি (বাংলাদেশ কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনারস) আছে তা ১৯৮৫ সাল থেকে ধিমেতালে চলছে। বিপিএমপিএ (বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনারস অ্যাসোসিয়েসন) এটাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ‘বিসিজিপি’ এর সভাপতি ছিলেন, প্রবীণ ভাষা সৈনিক, বিশিষ্ট লেখক, প্রবীণ শল্যচিকৎসক, ২০১৮ সালে একুশের পদকপ্রাপ্ত প্রফেসর ডাক্তার মির্জা মাজহারুল ইসলাম। তিনি গত ১১ অক্টোবর ২০২০ সকাল ৭.১৫ ঘটিকায় বারডেম জেনারেল হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত রোগে ৯৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। আরবিপিএমপিএ’-র সভাপতি হলেন প্রফেসর মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া। তিনি একজন স্বনামধন্য ও প্রথিতযশা শিশু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ।
বর্তমানে এখান থেকে যে পরিমাণ এফসিজিপি ( ফেলো কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনারস) বের হয় তা একেবারেই অপ্রতুল। এই কোর্স অন্ততঃ পূরাতন কয়েকটি বিভাগীয় শহর, যেখানে মেডিকেল কলেজ বিদ্যমান সে শহরগুলিতে বিসিজিপি (বাংলাদেশ কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনারস) স্থাপন করে ‘এফসিজিপি’ কোর্স চালু করা যেতে পারে। এ সব শহরে মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ও অনেক অবসরপ্রাপ্ত অতি অভিজ্ঞ প্রফেসরদের কে প্রতি ক্লাসে তাদের সম্মানি দ্বারা পাঠদান করালে এ কোর্স অতি সহজেই চালু করা যাবে। বিসিজিপি’র ৫-৬ শাখা থাকবে, কিন্তু ঢাকায় প্রধান কার্যালয় থাকবে। এফসিজিপি কৃতকার্য, যাদের বয়স ৩০ বছরের উর্ধে তাদেরকে ফলাফলের ক্রমানুসারে ‘নন বিসিএস ক্যাডার সরকারি কর্মকর্তা’ হিসেবে গন্য করে উপজেলা/ ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। তবে কেউ চাকরি না করলে যে কোনো এলাকায় জেনারেল প্রাকটিশনার হিসাবে রোগি দেখতে পারবেন। এই পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান চালু করার জন্য মহান সংসদে বিল উত্থাপিত হতে পারে। কারণ এটা একটা জনগুরুত্ব বিষয়’, রোগির প্রাথমিক দর্শন / পরিক্ষা অবশ্যই একজন এমএমবিবিএস পাস করা ডাক্তার দ্বারা ( PATIENTSÕ FIRST VISIT TO BE   DONE  BY A QUALIFIED MBBS DOCTOR) হওয়া উচিৎ । আর এটাতে জাতিসংঘের যে লক্ষ্য, সার্বজনীন চিকিৎসা (UNIVERSAL HEALTH COVERAGE) সেটা ও যথাযথভাবে পালিত হবে। সে সঙ্গে অনেক অনাকাক্সিক্ষত স্বাস্থ্য ঝুঁকি হতে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।
বর্তমান করোনা পরিস্থিতি ও ভবিতব্য চিকিৎসা সংকট নিরসনে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে এখন হ’তে মেডিসিন, সার্জারি বিশেষজ্ঞ, গাইনোকোলজিসট এবং অ্যানেসথেসিওলজিসটসহ আরও ৫-৬ জন মেডিকেল অফিসার, কিছু নার্স, কিছু অপারেশন থিয়েটার অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকলে অনেক অপারেশন করা যাবে এবং সাধারণ জনগণ শহরমুখি না হয়ে সকল রোগের জন্য উপজেলা হাসপাতালেই যাবে। এ ছাড়া সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ, জেনারেটর, চারটি ভেন্টিলেটর, ২/৩ টি সাকার মেশিন, ৪ টি আইসিইউ বিছানা, ১ টি অ্যানেস্থেসিয়া মেশিন সহ সাধারণ ওটির যন্ত্রপাতি থাকেÑ তবে জরুরি অপারেশন ছাড়া ও করোনা রোগির চিকিৎসাও সম্ভব। সরল হিসেবে ৪৯৫ থানায় ৫০ জন করে রোগি ভর্তি হ’লে ২১,৭৫০, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০০ জন করে ৬৪ জেলায় ৬৪০০। এ ছাড়া সরকারিু বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ( ৩৭+ ৯৮) বা ১৩৫ মেডিকেল কলেজে গড়ে ১০০ জন ১৩,৫০০ জন। শুধুমাত্র উপজেলা, জেলা ও মেডিকেল কলেজ সমূহে প্রায় ৪১ হাজার রোগি ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। এ ছাড়া ৫ টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলা শহরে বেসরকারি উন্নত মানের ক্লিনিক/ হাসপাতাল রয়েছে যে গুলি দেশের আপদকালীন এগিয়ে আসলে অতি সহজে ও সুচারুভাবে করোনা পরস্থিতিসহ অন্য আপদকালীন চিকিৎসা ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। যে সব হাসপাতালে স্টাফের ঘাটতি আছে সেগুলিতে অ্যাডহক বা আপদকালিন নিয়োগ দেয়া ছাড়া ও মেডিকেল কলেজের তৃতীয়,চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের ছাত্র/ ছাত্রী এবং তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের নার্সিং কলেজ সমূহের ছাত্র ছাত্রীদেরও দৈনিক কিছু ভাতা দিয়ে এবং তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করলে ভাল সাড়া পাওয়া যাবে। অনেকে কাজ করতে চায় কিন্তু তাদেরকে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নিতে হবে। এখনই সময়, করোনা ক্রান্তিলগ্নে যে সব জেলায় করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেছে সে সব জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে উল্লিখিত যন্ত্রপাতিসহ জনবল সরবরাহের ব্যবস্থা ও বিভিন্ন স্থানে করোনা ইউনিট চালু করলে বিভিন্ন শহরের উপর চাপ কমবে। চলচল সীমিত হওয়ায় সংক্রমণও ছড়াবে কম। যারা এইরকম পরিস্থিতিতে কাজে যোগদান করতে চাইবে তাদের সকলকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করলে আগামী দু’বছরের মধ্যে সব উপজেলা হাসপাতালে একই পর্যায়ে আনতে পারলে করোনা থাকবে কিন্তু মহামারী রূপ ধারণ করবে না এবং বাংলাদেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক নব যুগের সূচনা হবে।
ঢাকাসহ কিছু বিভাগীয় মহানগরীতে উন্নত মানের আবাসিক হোটেল ভাড়া করে অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি/ হাসপাতালে রূপান্তর করার চিন্তা ভাবনা করা হচ্ছিল, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল সময় সাপেক্ষ্য ব্যপার হ’ত। ওই পরিমাণ অর্থ খরচ করে জেলা / উপজেলা হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করতে পারলে ওগুলি স্থায়ী স্থাপনায় পরিণত হবে এবং এ গুলি করোনা মহামারী ছাড়াও যে কোনো আপদকালীন দুর্যোগে কার্যকরি ভূমিকা পালন করবে ।
২ সেপ্টেম্বর ২০২১ বাংলাদেশে করোনা ও করোনা উপসর্গে মৃত্যু সংখ্যা ৮৮ তে নেমে এসেছে। মার্চ, ২০২১ থেকে মৃত্যু সংখ্যা বাড়তে বাড়তে দৈনিক ২৮১ তে পৌঁছলে ও সরকারের গণ টিকাদান ,কঠোর লক-ডাউন কর্মসূচি সহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে করোনা চিকিৎসা দেয়ায় করোনা কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে মৃত্যু সংখ্যা শূন্য বা এক দুয়ে না আসা পর্যন্ত আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে আবারো সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে আরও ৬ লাখ ডোজ টিকা দেশে আসবে এবং টিকা আসা অব্যাহত থাকায় এ বছরের মধ্যেই অন্ততঃ ছয় লাখ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ থেকে মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক প্রতিষ্ঠান খুলে যাবে। তবে সকলকে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে।
লেখক: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.), গবেষক, বি ইউ পি ( বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস)

sayedali1044@gmail.com