স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী : আমাদের শিক্ষা ফিরে দেখা

আপডেট: মার্চ ১৭, ২০২১, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


বয়ঃক্রম অশীতিবর্ষ পূর্ণ হয়ে এলো প্রায়। চেতন আর অবচেতনে পারিপার্শ্বিকের বিচিত্র জয় পরাজয় দেখেছি। সে দেখার মাঝে হয়তো চাপল্য ছিলো। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বিজয় দেখা শুরু হলো। প্রবল প্রতিকূলতা উজিয়ে প্রায় অসম্ভবকে বাস্তবে এনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক গোলামির শেকল পরলাম। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার তখন অনাস্বাদিত আনন্দ অনুভব করিনি। কারণ গোলামের গোলামিতে আনন্দ কোথায়!
বাংলার মানুষের ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চা ১৯৪৭ সালের পর পরিবর্তিত, বিকৃত হতে থাকে। নজরুল ইসলামের কবিতার ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়। ‘মহাশ্মশান’ শব্দটি উচ্ছেদ করে গোরস্তান সন্নিবেশ করে। ভাগ্যিস, কায়কোবাদের ‘মহাশ্মান’ কাব্যটি নিয়ে আদিখ্যেতা দেখায়নি। তবে বহুল পঠিত শিশুপাঠ্য কবিতাটির ‘সকালে উঠিয়া’ কে ‘ফজরে উঠিয়া’ পড়ার নসিহত দেয়। আরো অচেনা শব্দের জঞ্জালে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আবিলতা নেমে আসে। ভারতের ‘আকাশাবাণীর’ আদলে পদলেহীরা রেডিও পাকিস্তানের নাম ‘গায়েবী আওয়াজ’ রাখার প্রস্তাব রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া মুক্তচিন্তার শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখতে থাকে। তাঁরা ভাষার অধিকারের দাবিতে রাজপথ রক্ত রঞ্জিত করেছে। সেই পথ ধরে আমাদের স্বাধীনতা আবার দেখছি অঘটনের প্রত্যাবর্তন। ভোগবাদী রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার দালালরা প্রায় হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত নামাজ-রোজা শব্দ দুটিকে সিয়াম-সালাত বলে চালাতে তৎপর। এমনকি আমাদের ভাষার সাথে মিশে যাওয়া ‘খোদাহাফেজ’ শব্দটি আল্লাহাফেজ বলার ব্যবসায়ে তৎপর।
দেশভাগ পরবর্তী জংলী সংস্কৃতির যুগে নজরুল জয়ন্তী, রবীন্দ্র জয়ন্তী উদ্যাপনের আয়োজন করা হলে মূঢ়রা সেখানে হিন্দুয়ানির আলামত দেখে। ভাষাকে ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে গুলিয়ে ফেলে। তাদের যুক্তি, জয়ন্তী শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি। তাছাড়া এটি ইন্দ্রকন্যা দুর্গার নাম। সাম্প্রদায়িক মূঢ়রা বুঝেনা স্থান-কাল-পাত্র-পরিবেশে শব্দের অবয়ব অক্ষত থাকলেও অর্থান্তর ঘটে। ভাবেরও নতুনত্ব সৃষ্টি হয়। এ যে প্রবহমান ধারা। শুকিয়ে গেলে অস্তিত্বের প্রশ্ন ওঠে। আমরা জয়ন্তীর বিরোধিতা জয় করেছি চড়া দামে।
২০২১ আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। গত পঞ্চাশ বছরে আমরা অগ্রগতির কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছি, তা দৃশ্যমান। ব্যক্তিগতভাবে আমি পুরুষাণুক্রমে শিক্ষকতা-সংশ্লিষ্ট। এই পঞ্চাশ বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের অর্জন-বিসর্জনের দিকটি না দেখলে প্রকারান্তরে নিজের অনুসৃতিকে অসম্মান করা হবে। বেশিদূর যাবনা, বৃটিশ ভারতে ১৮১৩ খ্রীষ্টাব্দ থেকে সরকারিভাবে শিক্ষার প্রতি নজর দেয়া হলেও, সে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিলো শোষণের জন্য শাসনের মানব-মেশিন তৈরি। স্বাধীন চিত্তবৃত্তি বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় চরিত্র গঠনের উদ্যোগ ছিলো না। ব্যক্তিগত সাধনায় আমাদের কৃতবিদ্যরা কিছুটা আলো ফেলেছিলো। তবে এসত্য মানতেই হয়, শিক্ষার বুনিয়াদ নির্মাণে শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন নির্ভেজাল।
বলছিলাম ১৮১৩ সালে বেনিয়া সরকার শিক্ষার প্রতি নজর দিলেও হাতে গোনা কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তা সীমাবদ্ধ ছিলো। তখনকার পূর্ববাংলায় ব্যক্তিউদ্যোগে প্রাথমিক থেকে কলেজ পর্যায়ে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কালের চক্রে আজও সে সব প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও উদ্যোক্তার নাম প্রায় বিস্মৃত। বি.এল., বি.এম., কে.সি., এম.সি, পি.সি. ইত্যাদি কলেজের নামের অন্তরালের আসল ব্যক্তিকে অনেকে চেনে না। এমনকি দিনাজপুরের এস.এন. অর্থাৎ সুরেন্দ্রনাথ কলেজের নাম প্রায় বিলুপ্ত। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তখনকার দিনে যাঁরা শিক্ষা অর্জন করতেন, তাঁরা অনেকেই স্মরণীয় হয়ে আছেন। লেখা বাহুল্য, আলোচ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশভাগের আগেই প্রতিষ্ঠিত। দেশ ভাগের সময় অনেক মহকুমায় কোনো কলেজ ছিলো না। আর বিশ্ববিদ্যালয় বলতে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একটা গুজব প্রচলিত আছে, ১৯৪৭ এর আগে নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আই.সি.এস হতে পারতেন না।
আবার পেছন ফিরে দেখি। বিভাগ পূর্বকাল থেকে পাকিস্তান আমলে আইউব শাহীর একটা পর্যায় পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঐচ্ছিক বিষয়গুলোর মধ্যে আরবি, সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু ইত্যাদি ভাষা পাঠ্যতালিকায় ছিলো। আইউব খান তা তুলে দিলেন। এমনকি বাংলার প্রতি শ্যেন দৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। কিছু দালাল রবীন্দ্রনাথের পরিবর্তে কবি ইকবালকে প্রাধান্য দেয়ার পরামর্শ দিলেন। আমরা কবি ইকবাল কেন, কোনো ভাষার কবি-শিল্পীর বিরোধী নই। তবে কারো শেকড় ছিন্ন করবো! ওই সময়ে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজির সাথে ওইসব যে-কোন একটি ভাষায় বুৎপত্তি লাভ করতো। ভাষা সংক্রান্ত বিষয় তুলে দেয়া হলে লাভ-ক্ষতি কি হয়েছে তার বিচার করবেন গবেষকগণ। এখন শুনছি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ফারসি উর্দু ইত্যাদি বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স পড়ানো হচ্ছে। মূল ভাষায় যাদের ধারণা নেই, তাঁরা কেমন করে উচ্চতর ডিগ্রি সংগ্রহ করে? এসব দেখার কেউ নেই।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৮৫৮ সালে দশ শ্রেণি শেষে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা প্রবর্তিত হয়। পাস নম্বর ইয়োরোপের শিক্ষাথীদের তুলনায় অর্ধেক রাখে। কারণ বাঙালিদের নাকি মেধার আকাল। আশ্চর্য প্রহসন! আসলে মেধার অভাব নয়, সুযোগ-সুবিধার তারতম্য ছিলো বলে আমাদের পূর্বপুরুষরা মেধার স্ফূরণ ঘটাতে পারেন নি। তাই বলে মেধাহীন! অতীশ দীপাঙ্কর, বিদ্যাসাগর জগদীশ চন্দ্র বসু, ড. কুদরত-ই-খুদা প্রমুখ দেখিয়ে গেছেন মেধার পরিচয়।
আইউব খানের পরামর্শকগণ কেবল যে ক্লাসিক ভাষাগুলো উঠিয়ে দিলেন তাই নয়, শিক্ষাকে বহুধাবিভক্ত করে দিলেন। মাদ্রাসা শিক্ষাতো ছিলোই একাধিক লেবাসে। আমাদের জাতীয় শিক্ষা গ্রামের দরিদ্র বধূর মতো রয়ে গেল উপেক্ষিতা।
ভাষা-সংস্কৃতির বিপর্যয়ের পথ ধরে আমাদের স্বাধীনতা আসলো সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে। সে দীর্ঘ ফিরিস্তি আমাদের অজানা নয়। এও জানা যে, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার ক্ষণটি ছিলো যেন অগ্নিকুন্ডের মাঝে অগ্নিশিক্ষার শপথ। দেশের সোনার চেয়ে দামি মাটি আর ভবন ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য কীইবা ছিলো! বঙ্গবন্ধু আমাদের শিক্ষার বেহাল অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৫ শে জুলাই বংলাদেশ সরকার কর্তৃক শিক্ষা কমিশন গঠিত হলো এবং ২৪ শে সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু তা উদ্বোধন করেন। কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন ড. কুদরত-ই-খুদা। তারপরের বছর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মহৎ উদ্দেশ্য ছিলো বহুধাবিভক্ত শিক্ষাকে একমুখি এবং বৈষম্যহীন রূপ দিয়ে এক ছাতার নিচে প্রতিষ্ঠা করা। এখানেই শেষ নয় শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করে শিক্ষাকে সাধারণের দোরগোড়ায় উপস্থিত করেছিলেন। সেই সাথে চির অবহেলিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ পেয়েছিলেন প্রাণের স্পন্দন। ১৯৭৩ সালেই বঙ্গবন্ধুকে সাত-পাঁচ বুঝিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অ্যাক্ট প্রবর্তিত হয়। এতে স্বাধীনভাবে নিজেদের কর্মসূচি পরিচালনার দায়-দায়িত্ব থাকলেও পরবর্তীতে দেখা গেল শিক্ষকগণ নিজেদের ভাগ্য গড়া নিয়ে রাজনীতির লেজুড়বৃত্তিতে মশগুল হয়ে গেল। ফলে সত্যিকার শিক্ষা শিকেয় উঠলো।
পাকিস্তানিরা শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের কণ্ঠরুদ্ধ করার জন্য প্রথম শ্রেণির কলেজগুলো সরকারের আওতায় আনে। রক্ত আর সম্ভ্রমের মূল্যে অর্জিত স্বাধীনতা ১৯৭৫ সালে আগস্টে ছিনতাই হয়ে গেলে সামরিক সরকারগুলো নাম সর্বস্ব কলেজ সরকারি করে। যার ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি। লেখা বাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মৌলিকত্ব যতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে, তা বিশ্ব র‌্যাংকিং-এ আমরা কোথায় অবস্থান করছি, দেখলে লজ্জা ঢাকবার জায়গা থাকে না। বঙ্গবন্ধু একটা পর্যায় পর্যন্ত বৈষম্যহীন জ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষার যে স্বপ্ন দেখতেন, আমরা কৃত্রিম দলবাজ শিক্ষক তা জলাঞ্জলি দিয়েছি। সেই সাথে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বন্যায় প্লাবিত করেছি। সরকার তুলনামূলকভাবে শিক্ষকদের বেতন কম দিচ্ছেন বলে অপবাদ দেয়া যায় না। অবকাঠামো দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠলেও জ্ঞানাঞ্জন লাভের পথ সংকীর্ণ হয়ে আসছে।
বাঙালির অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করে ১৩২২ বঙ্গাব্দের ২৩ শে কার্তিক রবীন্দ্রনাথ দুঃখ করে বলাকা কাব্যের ৩৭ সংখ্যক কবিতায় বলেছিলেন: ‘ওরে ভাই কার নিন্দা কর তুমি? মাথা নত কর। এ আমার এ তোমার পাপ।’ রবীন্দ্র উপলব্ধ সত্য এখনো ঘূর্ণায়মান। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে শিক্ষার দৃশ্যমান অবকাঠামো যতই জ্বলজ্বল করুক, আমরা শিক্ষাব্যবসায়ীরা তার ভরাডুবির জন্য কাজ করে চলেছি। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি.সি আর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানদের কীর্তি আমাদের অর্জনকে ম্লান করছে। এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ নিবেদিত প্রাণ ব্রতী শিক্ষক সমাজকে। আমরা সেই আশা নিয়ে বসে আছি।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ