বিশ্ব দৃষ্টি দিবস ২০১৬ : প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পরিস্থিতি

আপডেট: October 13, 2016, 11:33 pm

ফিকসন ইসলাম
১৩ অক্টোবর ছিল বিশ্ব দৃষ্টি দিবস। সারা পৃথিবী ব্যাপি বিশ্ব দৃষ্টি দিবস’ ২০১৬ বা ডড়ৎষফ ংরমযঃ ফধু’১৬ পালিত হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও এই দিনটি যথাযোগ্য ভাবে উদযাপিত হয়ে থাকে। মূলতঃ প্রতি বছরের অক্টোবর মাসের ২য় সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পৃথিবীতে দৃষ্টি দিবস পালন করা হয়।
দৃষ্টি সবার অধিকার বা জরমযঃ ঃড় ংরমযঃ এই মূলমন্ত্র ও দাবিকে কেন্দ্র করে দৃষ্টি দিবস পালিত হয়ে থাকে। এ বছরে দৃষ্টি দিবস এর মূল প্রতিপাদ্য বা ঞযবসব হচ্ছে “সবাই মিলে কাজ করি, অন্ধত্ব নিবারণ করি। আগামী ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপি পরিহার যোগ্য ও নিবারণ যোগ্য অন্ধত্ব প্রতিরোধের জন্য ডঐঙ (বিশ্ব স্বাস্থ্য) এবং ওঅচই বা আন্তর্জাতিক অন্ধত্ব নিবারণ সংস্থা যৌথভাবে ঠওঝওঙঘ ২০২০ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সে আলোকে প্রতিবার ও নিবারণ যোগ্য অন্ধত্ব বরণ করার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে আর এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গেলে হাতে আর মাত্র ৪ বছর বাকি। চলতি বছর ধরলে ইতোমধ্যে ১৭টি বছর অতিক্রম হয়ে গেছে। ফলে চার পঞ্চমাংশ সময় অতিবাহিত হবার পর বর্তমানে সারা বিশ্বে কিংবা বাংলাদেশের অন্ধত্বের অবস্থা কী সেটা জানা প্রয়োজন। প্রথমে আমাদের জানতে হবে ঠওঝওঙঘ ২০২০-দৃষ্টি সবার অধিকার কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বা ঞধৎমবঃ কী?
* ২০২০ সালের মধ্যে পরিহার যোগ্য অন্ধত্ব দূরীকরণে বিশ্বব্যাপি পরিকল্পনা।
* অন্ধত্ব প্রতিকার ও দূরীকরণে সরকারি- বেসরকারি অংশীদারিত্ব (ঢ়ধৎঃহবৎংযরঢ়) গড়ে তোলা।
* চক্ষু চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য অবকাঠামো তৈরি বা উন্নয়ন
* প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা
* চক্ষু রোগ ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে গণসচেতনা সৃষ্টি
ঠওঝওঙঘ ২০২০’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পাশাপাশি বর্তমানে বিশ্ব অন্ধত্ব ও বাংলাদেশের অন্ধত্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের জানা প্রয়োজন।
বর্তমানে বিশ্ব অন্ধত্ব পরিস্থিতি
(ক) প্রতি ৫ সেকেন্ডে একজন মানুষ অন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
(খ) প্রতি মিনিটে একজন শিশু অন্ধ হচ্ছে।
(গ) বিশ্বে ৪ কোটি ৫০ লক্ষ (৪.৫) মানুষ অন্ধ এবং ১৩.৫ কোটি মানুষ দৃষ্টি সমস্যায় ভুগছে।
(ঘ) শতকরা ৯০ ভাগ অন্ধ মানুষ উন্নয়নশীল দেশে বাস করে।
(ঙ) শতকরা ৮০ ভাগ অন্ধত্ব প্রতিরোধ বা প্রতিকার যোগ্য
(চ) অধিকাংশ মানুষই ছানিজনিত কারণে অন্ধ হচ্ছে যা সহজ অপারেশন দ্বারা নিরাময় ও নিবারণ যোগ্য।
(ছ) উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে ২০২০ সাল নাগাদ অন্ধত্বের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে।
বাংলাদেশে অন্ধত্ব পরিস্থিতি
(১) বাংলাদেশে বর্তমানে অন্ধত্বের সংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার
(২) অন্ধত্বের প্রধান কারণ ছানি- আর এই কারণে প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ মানুষ অন্ধত্বকে বরণ করছে যা প্রায় ৮০ ভাগ
৬) ৬ লক্ষেরও বেশি মানুষ দৃষ্টি শক্তি ত্রুটিতে ভুগছে যা উপযুক্ত চশমা দ্বারা চিকিৎসা প্রয়োজন।
৪) প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ প্রতিকার অযোগ্য অন্ধ (জন্মান্ধ)
৫) প্রায় ৪২ হাজার শিশু অন্ধ যাদের মধ্যে ১২ হাজার শিশু ছানিজনিত কারণে অন্ধত্ব বরণ করছে।
৬) প্রায় ২,৫০,০০০ মানুষ ক্ষীণ দৃষ্টিতে ভুগছে। বিশেষ ব্যবস্থাপনায় এদের চিকিৎসা জরুরি।
৭) বর্তমান ব্যবস্থাপনায় ছানি অপারেশন হার প্রতি বচর প্রতি ১০ লক্ষে ১,১৬৪টি
উপরোক্ত বিশ্ব ও বাংলাদেশের ভয়াবহ অন্ধত্ব পরিস্থিতি থেকে এটা স্পষ্ট যে ঠওঝওঙঘ ২০২০ কর্মসূচি সফল করতে না পারলে আগামী ৪ বছরে অন্ধ মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। দৃষ্টিহীনতা বা অন্ধত্ব আজ বিশ্ব বিবেককে নিদারুণভাবে আলোড়িত করেছে।
চোখ অমূল্য সম্পদ বা অঙ্গ। দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন মানুষ মহান সৃষ্টি কর্তার অশেষ রহমত বা দান। একজন দৃষ্টিহীন মানুষ ও দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের মধ্যে পার্থক্য অনেক। কেবল মানুষ কেন প্রতিটি জীব এর প্রধান অঙ্গই হচ্ছে চোখ। এই চোখের দ্বারা পৃথিবীর অপরূপ রস স্বাদ গ্রহণ করা যায়। যার চক্ষু নাই, পৃথিবীটা তাঁর কাছে বিষাদময়। ভারতের বিদায়ী সাবেক মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং প্রখ্যাত বিজ্ঞানী এপিজে আবুল কালাম অষষ ওহফরধ ড়ঢ়ঃযধষসড়ষড়মরপধষ ঝড়পরবঃু (অওঝঙ) এর সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ঈড়সঢ়ষবঃব ারংরড়হ রং ঃযব সরংংরড়হ ংযড়ঁষফ নব সড়ঃড় ঃড় ধষষ সবসনবৎং ড়ভ অওঙঝ, সুতরাং যারা চক্ষু বিষয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের নীতি ও আদর্শ হওয়া উচিৎ ঘড় ড়হব ংযড়ঁষফ মড় নষরহফ ধং ড়হব পধহহড়ঃ ঢ়ধু কিন্তু বাস্তবে সেটা খুবই দূরহ।
বিশ্ববিবেকপক আলোড়িত করা দৃষ্টিহীনতার চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। বিশ্বে যে প্রায় ৫ কোটি মানুষ দৃষ্টিহীন যার বেশির ভাগই এশিয়া ও আফ্রিকায়। প্রতি বছরে আনুমানিক ৮০ থেকে ১ লক্ষ মানুষ নিয়মিতভাবে অন্ধ হচ্ছে, যাদের মধ্যে ৮০% মানুষের বয়স ৫০ এর উর্ধ্বে। রোগজনিত অবস্থায় অন্ধ হচ্ছে যেমন- ছানি, গ্লুকোমা জবভৎধপঃরাব বৎৎড়ৎং  (চশমাজনিত) যেগুলো সহজেই স্বল্প খরচে চিকিৎসা দ্বারা নিরাময় সম্ভব। এ বিষয় বিবেচনায় এনে ডঐঙ, আন্তর্জাতিক অন্ধত্ব প্রতিরোধ সংস্থা বা ওঅচই সহ সেবামূলক ঘএঙ সমূহ ঠওঝওঙঘ ২০২০ জরমযঃ ঃড় ংরমযঃ মষড়নধষ ফবপষধৎধঃরড়হ ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ অপঃরড়হ ঢ়ষধহ ঘোষণা করে ২০০০ সালে। যার সঙ্গে বাংলাদেশও অংশীদারিত্ব নিয়ে ওই সময়ের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য ও প্রতিকারযোগ্য বা চিকিৎসাযোগ্য দৃষ্টিহীনতা নিবারণ করা। এর লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে অন্ধত্ব নির্মূল করা বা কমিয়ে ০.৫% এ আনা। এ কারণে একই বছরে বাংলাদেশ সরকার ঘধঃরড়হধষ ঊুব পধৎব (ঘঊঈ) কর্মসূচি অনুমোদন করেছে। এর লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করছে সহযোগী সাংগঠন ও সেবামূলক কল্যাণকর ঘএঙ সংস্থা সমূহ। বাংলাদেশে চিকিৎসা ও প্রতিরোধযোগ্য কারণগুলি ছানি ৬৫%, গ্লুকোমা-১৫%, শিশু কালের পুষ্টিহীনতা ৫%, আঘাতজনিত ও চোখের মণিতে বিশেষ প্রদাহ বা কেরাটাইটিস (ভাইরাস ফাংগাল, ব্যাকটেরিয়াল) জনিত কারণে দৃষ্টিহীনতা ঘটে ২%, শারীরিক রোগ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ কিডনিজনিত রোগ। চোখে রক্তক্ষরণ ও রেটিনা সংক্রান্ত কারণ ৫%, বিবিধ কারণে ৮% দৃষ্টিহীনতা।
বাংলাদেশের অন্ধত্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘধঃরড়হধষ ঊুব পধৎব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গেলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যা বর্তমান বছরের প্রতিপাদ্য। চক্ষু সমস্যার ৮০% গ্রামীণ জনপদে এবং ২০% শহরের জনগণ, চোখের চিকিৎসক ও সহকারীদের মধ্যে ৯০% শহরে বসবাস করছে। ফলে আগামী ৪ বছরের মধ্যে ঠওঝওঙঘ ২০২০ কর্মসূচির বাস্তবায়ন বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতই বাংলাদেশেও চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার প্রধান থেকে শুরু করে চিকিৎসা সেবাদানকারী চিকিৎসক, অপথলিমলজিস্ট, নার্সদের আন্তরিকভাবে কাজ না করতে পারলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হবে না। কিন্তু চিকিৎসা সেবাদানকারী জনবল আমাদের দেশে অপ্রতুল। যেখানে বিশ্বমানের প্রতি ৫০,০০০ জনবলের জন্য ১জন চক্ষু চিকিৎসক থাকার কথা- সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে বর্তমানে রয়েছে প্রতি ২,১০,০০০ জনের মধ্যে ৩ জন। যাদের মধ্যে একজনও গ্রামে কিংবা নিদেন পক্ষে উপজেলায় অবস্থান করেন না। জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পদ থাকলেও সেখানে কোন ডাক্তার নেই, কাউকে পোস্টিং দেয়া হলে তারা আবার জোর তদবির করে শহরে প্রত্যাবর্তন করে। ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি জনগণ যে গ্রামীণ বা মফম্বলে অবস্থান করে তারা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। যাদের অর্থ আছে তারা চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারলেও গরীব ও দুস্থ জনগণ কেবল মাত্র অর্থাভাবে চিকিৎসা না পেয়ে অন্ধত্বকে বরণ করে নিচ্ছে। ফলে “দৃষ্টি সকলের অধিকার” এই নীতি আদর্শ ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে ঠওঝওঙঘ ২০২০ কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বাংলাদেশ।
লেখক: প্রকৌশলী