বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস আজ সানোয়ারের হাত ধরে দেশসেরা পুরস্কার পাচ্ছে প্রতিবন্ধী সমিতি

আপডেট: ডিসেম্বর ৩, ২০২২, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী :


# ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়েছে ৩শ’ প্রতিবন্ধী

# কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪শ’ প্রতিবন্ধীর।

শিশুকালে পক্ষাঘাতে দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে সানোয়ার হোসেন তৎকালীন পাকশী ফেরিঘাটে হকারি করে চকলেট ও দাঁতের মাজন বিক্রি করতেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সেই সানোয়ারের হাত ধরেই পাবনার ঈশ্বরদীর প্রায় এক হাজার প্রতিবন্ধীরা আলোর পথ খুঁজে পেয়েছেন। প্রায় ৫শ’ প্রতিবন্ধী ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এখন।

শনিবার (৩ ডিসেম্বর) বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবসে সেই সানোয়ারের হাতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুলে দেবেন দেশ সেরা প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার। শুক্রবার (২ ডিসেম্বর) ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মাসুদ রানা এবং প্রতিবন্ধী পূনর্বাসন ও মানবাধিকার সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সানোয়ার হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এ বছর বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবসে সারাদেশে ৩টি প্রতিষ্ঠান এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য ঈশ্বরদীর এই প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে সেরা পুরস্কার।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সানোয়ারের উদ্যোগে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বরদীর এই প্রতিবন্ধী পূনর্বাসন সমিতি এখন এই এলাকার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারি একটি প্রতিষ্ঠানে রূপলাভ করেছে। নিজস্ব জমিতে ৬তলা ভবনের ২য় তলা পর্যন্ত ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে প্রতিবন্ধীদের নিজস্ব ঠিকানা। একসময় এই এলাকায় যাদের আয়ের একমাত্র উপায় ছিল ভিক্ষাবৃত্তি এখন তারা খুঁজে পেয়েছে নিজস্ব ঠিকানা। নিজেদের অফিসে কাজ করার পাশাপাশি চাকরি করছেন নানা প্রতিষ্ঠানে।

প্রতিবন্ধীরা জানান, সানোয়ারের বুদ্ধিমত্তা ও সাংগঠনিক তৎপরতায় এই অঞ্চলের প্রতিবন্ধীরা এখন আর কেউ ভিক্ষাবৃত্তি করে না। ইতোমধ্যে ঈশ্বরদী ইপিজেড, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় ৪ থেকে ৫শ’ প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২৩৪ জন শারিরিক প্রতিবন্ধীদের হুইল চেয়ার প্রদান করে তাদের জীবনের চাকা সচল করা হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন অধিকার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা, খাদ্য সহায়তা, শারিরিক সক্ষমতা অনুযায়ি সেলাই মেশিন প্রদানসহ প্রতিবন্ধীদের জীবন সহজ করে তুলতে নানামুখি কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিবন্ধী পূনর্বাসন ও মানবাধিকার সমিতি। এখানে কফি হাউজসহ নানামুখি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধীদের আয়ের পথ তৈরি করেছে এই এই প্রতিবন্ধী পূনর্বাসন প্রতিষ্ঠানটি।

বিভিন্ন প্রতিবন্ধী সংগঠন ও উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদীর ৭টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকা মিলিয়ে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। এর মধ্যে সানোয়ারের গড়া প্রতিবন্ধী পূনর্বাসন ও মানবাধিকার সমিতির সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ হাজার।
এদের কেউ গরু-ছাগল লালন পালন করেন, কেউ ছোটখাটো দোকানদারি করেন, কেউ এই সমিতির মাধ্যমে সমাজ সেবা অফিস থেকে বিনা সূদের ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন। এসব প্রতিবন্ধীদের মধ্যে অনেকেই এখন ঈশ্বরদী ইপিজেডের কারখানা, রেলওয়ে কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরিও করছেন। সমাজ সেবা অফিসের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৬০০ প্রতিবন্ধীদের সরকারি ভাতার আওতায় আনার ব্যবস্থা হয়েছে। এরা প্রতিমাসে ভাতা পান।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আনোয়ার হক বলেন, আগে অন্যের সহযোগিতা নিয়ে চলতাম, সানোয়ার হোসেন ভাই আমাকে আলোর পথ দেখিয়েছেন, এখন আমি কাজ করছি। নতুন রূপপুরের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তোহিদুল ইসলাম তনু বলেন, সমিতির মাধ্যমে বিনা সুদের ঋণ পেয়ে এখন ছোট খাটো দোকান দিয়ে ব্যবসা করছি।

ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বশির আহমেদ বকুল বলেন, একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়ে সানোয়ার হোসেন যা করে দেখিয়েছেন আমরা সুস্থ্য মানুষরাও তা করতে পারিনি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আসাদুল হক বলেন, প্রতিবন্ধী হওয়ার কারনে আগে অভিশপ্ত বেকার জীবন ছিল আমার, এখন কৃষি কাজ করছি, ভাল আছি এখন। রুমি খাতুন নামের প্রতিবন্ধী নারী বলেন, আগে ভিক্ষা করে আহারের ব্যবস্থা করতাম কিন্তু সানোয়ার হোসেনের সহযোগিতা পেয়ে এখন বাড়িতে কয়েকটি গরু-ছাগল পালন করে যা আয় করি তা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যেই চলে যাচ্ছে আমার সংসার।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সানোয়ার হোসেন বলেন, মাত্র আড়াই বছর বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আমি দৃষ্টি শক্তি হারাই, ১৯৮৭ সলে মাত্র ৮-৯ বছর বয়সে সেসময় পাকশী ফেরিঘাটে চকলেট, দাঁতের মাজন বিক্রি করেছি কিন্তু কখনো কারো করুনার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকতে চাইনি। নিজের কষ্টার্জিত আয় থেকে প্রতিবন্ধীদের অল্প অল্প করে সহযোগিতা করতাম। আর নিজেকে দিয়ে উপলব্দি করেছি জীবনের নির্মম বাস্তবতা। সেই থেকেই আমি প্রতিবন্ধীদের সাথে নিয়ে চলছি। ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, এই এলাকার প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ও মানবাধিকার সমিতির সভাপতি সানোয়ার হোসেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও যেভাবে প্রতিবন্ধীদের ভাগ্য উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন তা এখন এই অঞ্চলের দৃষ্টান্ত।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ