বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসের মৃত্যুর পর কেমন আছে তার পরিবার

আপডেট: এপ্রিল ২০, ২০১৭, ১:২৪ পূর্বাহ্ণ

মাহমুদুর রহমান বাদল


একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবারে নেমে আসা খরা দেখে পাঠকবৃন্দের বাস্তব ঘটনা জানানোর লোভেই লিখতে বাধ্য হলাম। চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার আমনুরা রেলওয়ে স্টেশনের ঠিক উত্তর দিকে নাচোল রোডের ঠিক দুই কিলোমিটার পথ শেষ হলেই রোডের ডান দিকে প্রখ্যাত জমিদার এলাহী বক্স সরকারের লক্ষ্মীপুর গ্রাম। আমি জমদিার এলাহী বক্স সরকারের সর্ব কনিষ্ঠ কন্যার সর্বকনিষ্ঠ গর্ভজজাত সন্তান অর্থাৎ এলাহী বক্স সরকারের নাতি। আমার নানার প্রতিষ্ঠিত ওয়াকফ্ এস্টেট পরিচালনার জন্য উক্ত গ্রামে আমার পদচারণা অদ্যবধি চলমান আছে। লক্ষ্মীপুর গ্রামের পূর্বে পার্শ্ববর্তী গ্রাম ঘোল কান্দর। এই ঘোল কান্দর গ্রামের সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস। গ্রামের খেটে খাওয়া লোকের সন্তান আব্দুল কুদ্দুস। লেখপড়া ৫ম শ্রেণির মত। আমার আব্বার জমির বর্গাচাষী লক্ষ্মীপুর গ্রামের মরহুম ওসমান আলী খতিব এর একমাত্র কন্যা নতিফন নেসার সংঙ্গে আব্দুল কুদ্দুসের বিয়ে হয়। আব্দুল কুদ্দুসের বিয়ের পর তার পালিত পিতা সামসুদ্দীন  (সোমু)-এর মৃত্যু হয়। পালিত বাবার মৃত্যুর পর সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সে ভারত পাড়ি জমায়। তার আগেই আমি লাল গোলা পৌঁছে যায়। বহরমপুরের কৃষ্ণনগর ক্যান্টনমেন্টে সঙ্গীদের নিয়ে ট্রেনিং গ্রহণের জন্য আমি বিহার চাকুলিয়ায় পৌঁছে ট্রেনিং গ্রহণ করি প্রথম ব্যাচে। আব্দুল কুদ্দুসও একই জায়গায় দ্বিতীয় ব্যাচে ট্রেনিং গ্রহণ করে। যুদ্ধ শেষে সে বাংলাদেশ আর্মিতে চাকরি লাভ করে। আর্মিতে চাকরিকালিন সংসার নিয়ে দিন চলছিল ভালই। কিন্তু এই ভালো তার সইলো না। দুই সন্তানের পর ছোট কন্যা সন্তানটির মৃত্যুতে সঠিক সময়ে চাকরিতে যোগদানে ব্যর্থ হয়। তাতেই আর্মিতে শৃংঙ্খলা ভংঙ্গের কারণে তাকে চাকরিতে যোগদান করতে না দিয়ে ফেরৎ দেওয়া হয়। আবারও আব্দুল কুদ্দুস বেকার  হয়ে পড়ে। সংসার চালাতে হিমসিম খেয়ে হয়। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার মানসে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস ঢাকায় পাড়ি জমায়। সায়েদাবাদের এক বস্তিতে কোনমতে অবস্থান নিয়ে রিক্সা চালানো পেশা বেছে নেয়। এক পর্যায়ে সেখানে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। আব্দুল কুদ্দুস বিবাহিত এ বিষয়টি উভয় পক্ষই জানে। মাঝে মাঝে দেশেও আসতো আব্দুল কুদ্দুস। আমি আগেই উল্লেখ করেছি। নানা/নানির এলাকায় নানার সৃষ্ট শত বছরের ওয়াকফ্ এস্টেট পরিচালনা কাজে লক্ষ্মীপুর গ্রামে প্রায়শ যেতে হয়। আব্দুল কুদ্দসের খোঁজ করি। মানুষ কোনরূপ সংবাদ দিতে পারে না। বলে- পেটের দায়ে ঢাকায় থাকে, কী করে জানি না। আমি বাংলাদেশ রেলওয়ে/রাজশাহী হিসাব বিভাগে চাকরি করি। রাজশাহীতে বসোবাস করি। একদিন হঠাৎ আব্দুল কুদ্দুস খোঁজে খোঁজে আমার কাছে এসে হাজির হয়। প্রথমে চিনতে পারি নি। আগের কুদ্দুস আর নাই। জীর্ণ শরীর, গোফ-দাড়িতে ভরা বিভৎস চেহারা হয়ে গেছে।
কূশল বিনিময়ে মনে খুব কষ্ট পেলাম। তাকে হোটেলে খাওয়ালাম। আমার কাছে তার দাবিÑ ‘সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা চালু করেছে। আপনি যদি চেষ্টা করে ভাতা মঞ্জুর করে দিতে পারলেÑ জীবনে বাঁচতে পারব। শরীরে আর কুলায় না। আর রিক্সা চালাতে পারছি না।’ তার এ সমস্ত ঘটনা  শুনলাম। আমি তাকে বললাম, এখন কোথায় যাবে ? সে বলল, ‘বহুদিন লক্ষ্মীপুরে যাই নি এবং কোনো খবর নিতেও পারি নি। এখন লক্ষ্মীপুরের দিকেই যাব।’ এই বলে ট্রেন ধরে লক্ষ্মীপুরে রওনা হলো। আমি অফিসের দিকে যেতেই প্রাক্তন জেলা কমান্ডার নজরুল ইসলাম (খোকা) ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল। আমি খোকা ভাইকে ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে জানালাম। খোকা ভাই আমাকে খুব ভালবাসেন। বললেন, আপনার লোকের কাগজপত্র তৈরি করে দেন। ব্যাপারটি আন্তরিকভাবে দেখব। আমি আব্দুল কুদ্দুসকে আলাপে বলেছিলাম, কি কি সনদ তোমার আছে, সেগুলো আমাকে দিয়ে যেও। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব। এর পর আব্দুল কুদ্দুস আমার কাছে আসে। কাগজপত্র আমাকে দিয়ে আবার ঢাকায় চলে যায়। আমি খোকা ভাইকে কাগজ পত্রগুলো জমা দিই।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস তার ভাতা মঞ্জুর হতে বিলম্ব হচ্ছে দেখে সে পুনরায় খোঁজ-খবর জানতে আমার কাছে আসে। এবার এসে সে বেশ কাকুতি মিনতি জানাতে থাকে। সে দিন তার কষ্টের কথা শুনে আবেগময় হয়ে পরি। এ দিন তাকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীস্থ আমার বাসায় আসি। দুজনে দুপুরে খাবার খেতে খেতে তার জীবনের বৃত্তান্ত জানতে চাই। আমি তাকে বলি তুমি তোমার জীবনের সমস্ত ঘটনা আমাকে বলো। আমি সমস্ত কিছু তোমার সামনে লিখে রাখি। লেখাটি তোমাকে দিয়ে দিব যেটা তুমি কাউকে দিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। যে কথা সেই কাজ। সেই দিন সে তার ভাষায় যা যা বলেছে তাই লিখেছি।
আব্দূল কুদ্দুস জানায়, পিতা মৃত ইজ্জত আলী বেপারি, মাতা মানিক জানের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছে। পিতার দুইটি পক্ষ ছিল। তার মা ছোট পক্ষের। তার জন্মের ৪-৫ বছর সময়ে পারিবারিক কোন্দলের কারণে মা স্বামীর সংসার ছাড়া হয়ে যায়। এবার মায়ের সঙ্গে আমনুরা রেলওয়ে স্টেশনে খালা/খালুর স্টেশন কোয়ার্টারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করি। বেশ কিছু দিন পর খালুর চেষ্টায় ঘোল কান্দর গ্রামের শামসুদ্দিন  (সমু) নামের এ ব্যক্তির সংঙ্গে আমার মায়ের ২য় বিবাহ হয়। মায়ের সঙ্গে থেকে  শামসুদ্দিন (সমু) এর সংসারে বড় হতে থাকি। ৫ম শ্রেণিতে পড়ার সময় গর্ভধারিণী মায়ের মৃত্যু হয়। মায়ের মৃত্যুর পর আর লেখাপড়া হয়নি। আমার বিবাহ হওয়ার পরপরই পালিত পিতা শামসুদ্দিন (সমু) এর মৃত্যু হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শফিকুর রহমান (রাজা) এবং হারেজ উদ্দিনের নেতৃত্বে তানোর গোদাগাড়ি এবং মোহনপুরের বিভিন্ন জায়গায় অপারেশনে অংশগ্রহণ করি। সঙ্গী ছিল আমনুরার আমির আলী ভাই।
একদিন হঠাৎ হাসি মুখে আব্দুল কুদ্দুস এসে প্রথমে সংবাদ দিল ভাতা মঞ্জুর হয়েছে। কিছু বকেয়াসহ টাকা উঠিয়ে আজকেই ঢাকা রওয়ানা হবো। এ সংবাদটা জেনে আনন্দিত হলাম। তার পর তার সাথে দেখা হয় নাই। এর পর প্রায় বছর দুয়েক পর লক্ষ্মীপুর গ্রাম হতে আসা নিকটতম আত্মীয় এসে সংবাদ দিল আপনার আব্দুল কুদ্দুস ঢাকাতে মৃত্যুবরণ করেছেন। ২৭ ডিসেম্বর ২০০৭ তার মৃত্যু হয়েছে। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। অন্য কাজে আমি লক্ষণ¥ীপুর যায়। মরহুম আব্দুল কুদ্দুসের বড় সন্তান এসে আমার সাথে দেখা করলো। আমি সান্ত¦না দিয়ে পরামর্শ দিলাম, তোমার আব্বা যে বস্তিতে মারা গেছে সেখানে যাও। তোমার সৎ মায়ের সঙ্গে দেখা করো এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আমাকে দাও। পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য যথাযথ দপ্তরকে যোগাযোগ করার ব্যাপারে সহযোগিতা করব ইনশআল্লাহ। এরপর দেয়া পরামর্শ মতে আব্দুল কুদ্দুসের প্রথম পক্ষের বড় সন্তান মো. নাসিম বহু বার ঢাকা যায়। তার সৎ মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্বিতীয় পক্ষের তিন সন্তান আর একজন কন্যা সন্তান। দ্বিতীয় পক্ষের বড় সন্তান  মো. কাসেম, মো: জনি, মো: রানা ও কন্যা মোসা: কোহিনুর। বার বার যাওয়াতে সৎ ভাই বোনদের সংঙ্গে মো: নাসিমের চেনা জানা হয়ে যায়। কিন্তু মৃত পিতার পরিত্যাক্ত ভাতা পুনঃমঞ্জুর ব্যাপারে আলোচনা করলেই ছোট বউ পাশ কাটিয়ে যায়।  ফিরে চলে আসে। বেশ কিছুদিন পর আবার ঢাকা যায়। এবার তার ছোট মাকে দেখতে পাই নাই। বড় সৎ ভাই বিবাহিত। সে জানায়, ভাই তুমি এসেছো ভালোই হয়েছে। আমার মা আমাদের পথে ফেলে রেখে আবার একটা বিয়ে করেছে। সে এখন নতুন স্বামীর সঙ্গে থাকে। মা চলে গেছে, বড় মা তো আছে আমাদের ফেলবেন না। আব্বার ভাতা বড় মায়ের নামে মঞ্জুর করতে হবে। এসব ঘটনা দেখে ও শুনে নাসিম ঢাকা হতে ফিরে চলে আসে। বেশ কিছুদিন পর নাসিম ঢাকা যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছোট পক্ষের রড় ছেলে মো. কাসেমকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে জানতে পারে মো. কাসেম ফৌজদারি কেসে পড়ে হাজতখানায় অবস্থান করছে। হাজত থেকে বের হলে ঢাকা যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। আবারো বেশ কিছুদিন পর ঢাকা যায়। এবারও মো. নাসিম তার সৎ মাকে দেখতে পায়নি। নতুন স্বামীর কাছে আছে জানানো হয়। নাসিম এসেছে এ সংবাদ পেয়ে মেয়ে কোহিনুর সৎ মাকে মোবাইল করে জানায়। অন্য প্রান্ত থেকে সৎ মা বলে নাসিমকে চলে যেতে বলো। তারা কে! সে কেন এসেছে। চলে না গেলে অসুবিধা হবে।  নাসিম এই পরিস্থিতিতে বাড়ি ফিওের আসে।  সর্বশেষে ২১ মার্চ ২০১৭ নাসিম তানোর উপজেলা সমাজসেবা অফিসে একজন সাহায্যকারীর সহযোগিতায় যোগাযোগ করে। উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার জনাব আমিনুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে। অফিসার তার সহকারীকে সমস্ত তথ্য জানাতে আদেশ দেন। নির্দেশ মতে সহকারী তথ্যাদি জানিয়ে দেন। তথ্য মতে মৃত আব্দুল কুদ্দুসের ভাতা বই নং ১৬/তানোর এর পরিবর্তে দ্বিতীয় স্ত্রী মোসা. আফিয়া খাতুনের নামে ভাতা বই নং ৪৮/তানোর ০১/০৭/২০১৩ তারিখে চালু করা হয়েছে। মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসের ২টি পক্ষ রেখে পরলোক গমন করেছেন। উভয় পক্ষই জানে অপর পক্ষের অবস্থান সেখানে এক পক্ষকে অগোচরে রাখিয়া অন্য পক্ষ অর্থাৎ ২য় পক্ষের অনুকূলে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা মঞ্জুর করাটা অনৈতিক হয়েছে। কোনক্রমেই প্রশাসন এ ঘটনা সমর্থন করবে না এবং করতে পারে না। সর্বশেষে তাৎক্ষণিকভাবে ন্যায় বিচারের স্বার্থে দ্বিতীয় পক্ষের অনুকূলে মঞ্জুরকৃত ভাতা বই নং ৪৮/তানোর স্থগিত হওয়া প্রয়োজন। পরবর্তিতে তদন্ত পূর্বক কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্জনীয়।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, বালিয়াপুকুর, বোয়ালিয়া