বেপরোয়া মেয়র আব্বাস!

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০২১, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


জেল জুলম, দখলদারি, চাঁদাবাজির রাজ্য গড়েছেন মেয়র আব্বাস। কাটাখালী পৌরসভার মেয়র হওয়ার সুবাদে একক আধিপত্য বিস্তার করেছেন তিনি। ‘ধরাকে সরা’ জ্ঞান করেছেন। পৌরসভা জুড়ে জমি দখল, বহুতল ভবন নির্মাণ, সরকারি জায়গায় দোকান ও মার্কেট নির্মাণ, টেন্ডারবাজি, বালুরঘাটের ট্রাক থেকে টোলের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এসব কিছুই হতো মেয়র আব্বাসের ইশারায়।

শুধু তাই নয়, দলীয় প্রবীন নেতা কর্মীদের কোণঠাসা করে রাখার ক্ষেত্রেও তার জুড়ি মেলা ভার। দলীয় কর্মসূচিতেও ঠাঁই মেলে নি ত্যাগি নেতাদের। এনিয়ে পৌর আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। অথচ তার বদন্যতায় জামাত-শিবির ও বিএনপির কর্মি-সমর্থক সংগঠিত হয়েছে, পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। এছাড়াও আব্বাস তার নিজের নামে চত্বর ও বাবা আশরাফের নামে সড়কের নামকরণ করেছেন। পৌর এলাকায় বাড়ি নির্মাণে চাঁদা, কাটাখালী হাটের দোকান, মাছ-মাংস ও সবজি পট্টিসহ সবজায়গায় চাঁদা তোলার কাজ নিয়োজিত আব্বাসের নিজস্ব লোকজন।

এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে শিকার হতে হতো মারধর ও নির্যাতনের। প্রতিবাদকারীদের গভীর রাতে মাসকাটাদিঘী স্কুল ও কলেজের ক্যান্টিনের পাশে নিয়ে বিচারের নামে রাতভর চালনো হতো নির্যাতন। মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে ওই স্কুলে সভাপতি মেয়র আব্বাসের আড্ডা বসতো। একবার স্কুলের দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় অকথ্য ভাষায় গালাগালি ছাড়াও মারধর খেতে হয়েছে নাইট গার্ডদের। আব্বাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হওয়ায় চাকরি হারানোর ভয়ে তারা মুখ খোলে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কাউন্সিলর জানান, শ্যামপুর বালুরঘাট, কাটাখালী হাট ও বাজার, কাপাশিয়া হাটের ইজারার টাকার কোনো হদিস নেই। বিভিন্ন হাট বাজারগুলো টেন্ডার ও ইজারা নিজে কুক্ষিগত করে রেখেছে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে তার স্বজনরা।

মেয়র আব্বাস চাকরি দেওয়ার নামে ২০ থেকে ২৫ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। আব্বাসের চাকরি দেওয়ার নামের পাতা ফাঁদে পা দেয় তার ফুফাতো ভাই হাফিজ। হাফিজের থেকে আব্বাস নিয়েছিল ৭ লাখ টাকা। কিন্তু চাকরি দিতে পারেন নি। পরে হাফিজের মা আব্বাসের পায়ে-হাতে ধরে কিছু টাকা ফেরৎ নিয়েছেন।

তারা আরো জানান, পৌরসভায় নিয়োগপ্রাপ্ত সুরাইয়া আক্তার নিপা, জানু, ফারুক ও সৈয়বুরকে চাকরিচ্যুত করেছেন মেয়র। একদিন বিকেলে তাদের ডেকে বলে- তোমাদের কাল থেকে আসার দরকার নেই। তার ওই এক কথাতেই চাকরি চলে গেছে। এদের মধ্যে ফারুক ও সৈয়বুর দীর্ঘদিন চাকরিতে যোগদান না করতে পেরে কয়েকবছর আগে বদলি নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

এবিষয়ে নিপা জানান,‘একই সাথে রাবেয়া বুশরী, বিপ্লব প্রামাণিককে চাকরি থেকে ছাঁটাই করেছেন মেয়র। আমি (নিপা) টিকাদানকারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলাম। আর রাবেয়া সহকারি কর আদায়কারী ও বিপ্লব ছিলেন লাইসেন্স সেবাদানকারী। আমি ২০০৪ সাল থেকে কাজ করে আসছিলাম। দেড় বছর আগে মেয়র আব্বাস আমাদের ডেকে বলে তোমাদের কাল থেকে আসার দরকার নাই। তারপরে বিভিন্নভাবে অনুরোধ করে চাকরি ফেরৎ পাইনি।’

কাউন্সিলরা আরো জানান, পৌর মেয়র আব্বাস কাউন্সলরদের তোয়াক্কা করতেন না। সভা-সমাবেশ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজেই নিতেন। আর কাউন্সিলদের কাছে কাগজ পাঠিয়ে শুধু স্বাক্ষর নিতেন। মত প্রকাশের অধিকার ছিল না কাউন্সিলদের। এছাড়া পৌরসভায় প্রতিবছর পৌরকর, রাজস্ব আদায়, ভূমি উৎস করের টাকা আসে। এসব টাকার হদিস নেই। মেয়র আব্বাস ইচ্ছে মতো খরচ করেছেন।

এছাড়া এডিবি প্রকল্প, টিআর ও কাবিখা প্রকল্প সব মেয়র আব্বাসের নিয়ন্ত্রণে। প্রতিবছর জুনে বাজেটও প্রকাশ করা হয় না। পৌরসভার আয়-ব্যয় কিছুই জানা যায় না।

মেয়র আব্বাস নিজের নির্মাণাধীন বাড়িতে যাওয়ার জন্য মাসকাটাদিঘী স্কুলের পশ্চিম পাশে অন্যের জমি দখল করে পিচের রাস্তা তৈরি করেছে। স্কুল মাঠের পশ্চিম-উত্তর পাশ থেকে ঢালাই রাস্তা করছেন মাসকাটাদিঘী পূর্বপাড়া মসজিদ পর্যন্ত। এই রাস্তা তৈরি করতে বিলের জমির আইলের দুই পাশে ৮ ফুট করে নিয়েছেন। কিন্তু মূল্য পরিশোধের নামে প্রায় ২০ জন জমির মালিকের দলিলের ফটোকপি নিয়েছেন তিনি। ভয়ে ওই সব জমির মালিক মুখ খোলে না।

অভিযোগ উঠেছে কাটাখালী হাটের ভেতরে বেশকিছু দোকান মেয়রের দখলে। মেয়র আব্বাস ক্ষমতায় আসার পরে দাউদ কসাইয়ের জমি দখল করেছেন। এছাড়া সাবেক পবা উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুসের ৪ কাঠা ১০ ছটাক জমি দখল করে নিয়েছেন। প্রতিবাদ করায় হয়রানিমূলক মামলা হয় আব্দুল কুদ্দুস ও তার দুই ছেলে একে ফজলুল হক ও হোসেন শহিদ সোরাওয়ার্দীর নামে।

ভুক্তভোগি আব্দুল কুদ্দুস জানান, ‘ওই জমি আমার নিজের কেনা। ওখানে দুইটি দোকান ছিল আমার। মেয়র আব্বাস দখল করে নেয়। সেখানে বর্তমানে কনফেকশনারির দোকান রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, শুধু আমাদের নয়, অনেক মানুষকে হয়রানি করেছে সে (আব্বাস)। আমাদের নামে মামলা দিয়ে বিষয়টি গোপন রাখে। হঠাৎ শুনি ওয়ারেন্ট হয়েছে আমাদের নামে। আমরা কোর্টে হাজির হয়ে জামিন নিই। কয়েকবার হাজিরার পরে মামলা শেষ হয়।’

পবা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কাটাখালী পৌর আ’লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মতাহার হোসেন জানান,‘মেয়র আব্বাসের কাছে প্রবীন আওয়ামী লীগের নেতাদের মূল্যায়ন ছিল না। কারণ তার হাতে ছিল এমপি ও কেন্দ্রের এক নেতা। তাই কাউকে তোয়াক্কা করতেন না তিনি।’

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ