বেরিয়ে আসছে নিহত তিন যুবলীগ কর্মীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য || মামলা দায়ের, শোকাচ্ছন্ন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা

আপডেট: ডিসেম্বর ৯, ২০১৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



নাটোরে তিন যুবলীগ কর্মী সাব্বির, আব্দুল্লাহ ও সোহেল হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। অজ্ঞাত  পরিচয়ে ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে গত বুধবার রাতে নিহত সাব্বিরের মা রুখসানা বেগম বাদি হয়ে নাটোর থানায় মামলা করেন। মামলায় বলা হয়েছে, প্রশিক্ষিত শক্তিশালী বাহিনী পরিকল্পিতভাবে নিজে অথবা প্ররোচিত হয়ে এই হত্যাকান্ড ঘটায়। অপরদিকে তিন যুবলীগকর্মীর হত্যার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত  এ হত্যাকান্ডের কোন রহস্য উদ্বঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। অন্যদিকে একাধিক সূত্র জানায়, নিহত ওই তিনজনই ছিল সাংসদ শিমুলের কাছের লোক। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ রয়েছে ডজন খানেক মামলা।
মামলার এজাহার সুত্রে জানা যায়, অজ্ঞাত সন্ত্রাসী ‘র‌্যাব’ পরিচয়ে নাটোর সদর উপজেলার তোকিয়া বাজারে মান্নানের চায়ের দোকানে চা পান করার সময় রাত ১১টার দিকে একটি সাদা এবং কালো মাইক্রোবাসে এসে ১৫-১৬ জন সাব্বিরসহ তার দুই বন্ধুকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ওই এলাকার যে কোন স্থানে আগ্নেয়স্ত্র দিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। র‌্যাব বা পুলিশের সাথে ক্রসফায়ারে নিহত হলে তা মিডিয়ায় প্রচার হতো। প্রশিক্ষিত শক্তিশালী বাহিনী পরিকল্পিতভাবে নিজে অথবা প্ররোচিত হয়ে এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে।
এদিকে ওই ঘটনার পর থেকে নাটোর শহরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। তবে নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, এ হত্যার ঘটনায় ‘র‌্যাব’ জড়িত। তবে কেন তাদের হত্যা করা হয়েছে, তা কেউই বলতে পারছেন না। এদিকে, নাটোর সদর আসনের সাংসদ শফিকুল ইসলাম শিমুল হুঁশিয়ার উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘তিন দিনের মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করা না হলে গোটা উত্তরাঞ্চল অচল করে দেয়া হবে।’
সোহেলের মা সখিনা বেগম দাবি করেন, স্বামীকে হারানোর সাত মাসের মাথায় তিনি তার একমাত্র ছেলে ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সোহেলকে হারালেন। একথা বলামাত্র তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
নিহত সোহেলের স্ত্রী সুমা আক্তার জানান, সোহেল তার তিন বছরের ছেলে রিফাত এবং দুই মাস বয়সের মেয়ে রাইফাকে রেখে গেছেন। এই পর্যন্ত বলে  তিনিও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারের ব্যয়ভার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
নাটোর সদর উপজেলার  তোকিয়া বাজারের চা-দোকানদার আব্দুল মান্নান জানান, ঘটনার দিন শনিবার রাত ১২টার দিকে তিন যুবক তার দোকানে চা-পান শেষে মোটরসাইকেলে উঠছিল। হঠাৎ দুইটি মাইক্রোবাসে ১৫-১৬ জন মানুষ তাদের মোটরসাইকেলের সামনে গাড়ি থামায়। তারা র‌্যাব পরিচয় দিয়েই তিনজনকে বেধড়ক মারপিট করতে থাকে। এরপর মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই তারা তিনজনকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চলে যায়।
নিহত সাব্বিরের বোন সুরভী বলেন, ‘র‌্যাব সদস্যরাই তাদের আটক করে গাড়িতে তোলে। ওই সময়  সেখানকার নাইটগার্ড তাদের পরিচয় জানতে চাইলে গাড়ির  ভেতর  থেকে তিনজন পোশাক পরা র‌্যাব সদস্য   বের হয়ে আসেন। এ সময় তারা নিজেদের র‌্যাব পরিচয় দিয়ে কার্ড ও অস্ত্র দেখান। এরপর র‌্যাব অফিসে গিয়ে  খোঁজ নিই। তারা পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেন।
শহরের কালুর মোড় এলাকার নিহত সোহেলের বড় ভাই দেলু জানান, তার বাবার দুইটা পক্ষ প্রথম পক্ষের তারা তিন ভাই বোন। ছোট পক্ষের শুধু সোহেল ছিল।  সে নীচা বাজারের নিমাই নামে এক ভূষিমাল মাল ব্যবসায়ীর দোকানে কর্মচারী  ছিল এর পাশাশি রাজনীতি করতো।
পুলিশ ও জেলা বিএনপির সেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, নিহত  সোহেলের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের ঘটনায় চারটি মামলা আছে। চলতি বছরের ১ জুন আদালতে হাজিরা দিয়ে বড় হরিশপুর নিজ বাড়ড়ি ফরার সময় কালেক্টরেট স্কুলে সামনে তার পায়ে গুলি করা হয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়।
গতকাল তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী সোমা দুই মাসের কন্যা রাইফাকে কোলে নিয়ে নির্বাক বসে আছেন। পাশেই নিহতের তিন বছরের ছেলে রিফাতকে কোলে নিয়ে বিলাপ করছেন সোহেলের মা সখিনা  বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার একটাই ছাওয়াল। ছাওয়ালকে কেমন কইরে ভুইল্যা থাকব। দুধের দুইটা বাচ্চা নিয়ে ব্যাটার বউ কোথায় যাবে? তাদের  দেখবে কে?’
নিহত আবদুল্লাহ শহরের আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করে  পড়া লেখায় আর অগ্রসর হয়নি। তার নামে একটি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানালেও এলাকাবাসী বলছেন,  সে খুবই ভালো ছেলে। সাব্বিরের সঙ্গে থাকাটাই তার কাল হয়েছে।
নিহত যুবলীগকর্মী আব্দুল্লার চাচা নাসিম উদ্দিন জানান, মাত্র একবছর আগে আব্দুল্লাহ মরিয়মকে বিয়ে করেছিল। তিনি দাবী করেন, আব্দুল্লাহ একটি অনলাইন পত্রিকা বাংলাটাইমস২৪.কম এর নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। তিনি পেশায় একজন ঠিকাদার। ঘটনার দিন আব্দুল্লাহ তার নানীর বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া থেকে নিজ মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছিল। পথে তোকিয়া এলাকায় পৌঁছালে সাব্বির ও সোহেল তাকে মান্নানের চায়ের দোকানে চা-পানের আমন্ত্রণ জানায়। তাদের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েই সে  খুন হল। পরিবারের সদস্যরা আব্দুল্লার মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তারা কারো সাথেই কোন কথা বলছেন না।
একাধিক সূত্র জানায়, সাব্বির ছিল নাটোর শহরের ত্রাস। কানাইখালী বাজারে তার ছিল টর্চারসেল।  সেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ধরে এনে চাঁদার দাবিতে নির্যাতন করা হতো। এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের কাছের লোক হিসেবেও এলাকায় তার পরিচিত ছিল। বিএনপি-জামায়াতের আমলে সাব্বির যুবদলের রাজনীতি করত। ওই সময় বিএনপির এমপি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর হয়ে সে কাজ করত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাব্বির যুবলীগে যোগ দেয়।
স্থানীয়রা জানান, ২০১৫সালের ১১ আগষ্ট স্থানীয় দৈনিক উত্তর কণ্ঠ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী চলাকালে র‌্যাব-৫ সাব্বিরকে আটক করে। গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ওই সময় সাংসদ শফিকুল ইসলাম শিমুলের হস্তক্ষেপে র‌্যাব তাকে ছেড়ে দেয়। পরে সাংসদ শিমুল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আমার হস্তক্ষেপে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়নি।  আমি র‌্যাব সদস্যদের বলেছিলাম, অনুষ্ঠানস্থল থেকে সাব্বিরকে আটক করে হলে বিশৃঙ্খলা হবে। পরে র‌্যাব তাকে ছেড়ে দেয়।
অপর একটি সূত্র জানায়, চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি রাতে সাবেক যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের বাড়িতে হামলা চালায় সাব্বির। তাকে বাড়িতে না পেয়ে ওই সময় তার  মেয়ে কলেজ অধ্যক্ষ  মৌসুমী, মুক্তা ও তার মেয়ে জামাই মোজাহার হোসেনকে মারধর করে।
সেই সময় আহাদ আলী সরকার বলেন, ‘আমাকে মন্ত্রী করা হচ্ছে, এমন একটি গুজবে সাব্বিরের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন আমার বাড়িতে এসে হামলা চালিয়েছিল। আমার দুই মেয়ে ও জামাইকে মারধর করেছিল। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমি মামলার আইওকে বলেছিলাম, আর মামলা চালাব না।’ সাবেক ওই প্রতিমন্ত্রীর বাড়িতে হামলার মামলায় জেলও খাটে সাব্বির ।
নাটোর জজ কোর্টের পিপি অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম জানান, তিন খুনের ঘটনায় যে কোন সময়, যে কোন দিন নিহতের পরিবার মামলা করতে পারবে। তবে  মামলায় সুনির্দিষ্ট করে কিছু উল্লেখ করা থাকলে এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার উপকৃত হয়।
নাটোর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, এ খুনের সাথে কারা জড়িত, পুলিশ এখনও তা নিশ্চিত হতে পারেনি।  নিহতের স্বজনরা অভিযোগ দিলে হত্যা মামলা হবে। আর মামলা না করলে সাব্বিরের মায়ের করা জিডি হত্যা মামলায় রূপান্তর হবে।
এ ব্যাপারে নাটোর র‌্যাব ক্যাম্পের এসএসপি শেখ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, ওই ঘটনার র‌্যাবের  কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। নিহতদের পরিবারের দাবির বিষয়ে কোনো তথ্যও আমাদের কাছে নেই।  এঘটনা শোনার পর থেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত  করা হচ্ছে।