বোরো উৎপাদনে রেকর্ড

আপডেট: জুন ১৬, ২০২১, ১২:২২ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


চলতি বছর বোরো উৎপাদনে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। এবার বোরো উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ৭ লাখ ৮৪ হাজার ৫০৮ টন, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। এছাড়া বিগত বছরগুলোর তুলনায় ফলনের পরিমাণও বেড়েছে। গত বছর দেশে বোরো ধানের জাতীয় গড় ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ৯৭ টন। এ বছর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২৯ টনে। অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে দশমিক ৩২ টন, যা গত বছরের তুলনায় ৮ দশমিক শূন্য শতাংশ বেশি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এ বছর বোরোর উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ১১ লাখ টনেরও বেশি হয়েছে। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ টন। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে। এবার বোরোতে ২ কোটি ৫ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সব মিলিয়ে এ উৎপাদন দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এসব বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জাগো নিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় চলতি বছরের শুরুতেই আমরা সর্বাত্মক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলাম। সব স্তরে যেকোনো মূল্যে বোরোতে উৎপাদন বাড়াতে কাজ হয়েছে। বীজ ও সারসহ প্রণোদনা পেয়েছেন কৃষকরা। আমাদের উদ্যোগের ফলে গত বছরের তুলনায় এ বছর ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়।
তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমিতে হাইব্রিডের আবাদ বেড়েছে। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার বোরোতে বেশি উৎপাদন হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন বছরে মোট উৎপাদিত চালের ৫৫ ভাগের বেশি আসে বোরো থেকে। যদিও সফলভাবে প্রতি বছর এ ধান ঘরে উঠানো খুবই চ্যালেঞ্জিং। কারণ আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে হাওরের ধান ঠিকমতো ঘরে তোলা নিয়ে প্রতি বছরই আতঙ্কে থাকতে হয় কৃষকদের। এদিকে এ বছরও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিটশকে আক্রান্ত হয় বোরো ধান। পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতির জন্য ধান কাটার সময় চলাচলে বিধিনিষেধ কিছুটা প্রভাবিত করে। তার পরও এ বছর সফল উৎপাদন দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় অর্জন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, এত কিছুর পরও বোরোর রেকর্ড উৎপাদন নিশ্চয় প্রশংসনীয়। বড় কোনো দুর্যোগ না থাকায় অত্যন্ত সফলভাবে এ বছর হাওর অঞ্চলসহ সারাদেশের বোরো ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে।
তিনি আরও বলেন, জমি কমলেও নতুন নতুন জাতের বোরোতে আশা জাগিয়ে রেখেছে সব সময়। কৃষকও এ বছর ভালো দাম পাচ্ছে। তাতে তাদের আগ্রহ আরও বাড়বে।
এদিকে এ বছর ধান কাটার শ্রমিক সঙ্কট অনেকটা কমিয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। তিন হাজার ২০ কোটি টাকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় অঞ্চলভেদে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে ধান কাটাসহ অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদের দেয়া হয়েছে।
তথ্য বলছে, গত বছর ধান কাটতে কম্বাইন হারভেস্টার মাঠে নামানো হয়েছে ১ হাজার ২৪০টি। এ বছর ১ হাজার ৬৬৬টিসহ মোট ২ হাজার ৯০৬টি কম্বাইন হারভেস্টার মাঠে ধান কেটেছে। রিপারও চলছে মোট ৮৩৯টি, যা গত বছরের প্রায় দ্বিগুণ।
আবাদের পরিসংখ্যান
সারাদেশে এ বছর ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। গত বছর বোরো ধান আবাদ হয় ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৭ হেক্টরে। অর্থাৎ এ বছর ১ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর বেশি আবাদ হয়েছে।
এদিকে এ বছর বেড়েছে উচ্চ ফলনশীল জাতের চাষাবাদ। যেখানে গত বছর হাইব্রিড ধান চাষের জমির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর, তা এ বছর বেড়ে হয়েছে ১২ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ ৩ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে হাইব্রিড ধান আবাদ হয়েছে। হাইব্রিডের গড় ফলন এবার বেশি।
এছাড়া হাওরভুক্ত সাতটি জেলায় এ বছর বোরো আবাদ হয়েছে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩৪ হেক্টর জমিতে, যা দেশের মোট আবাদের প্রায় ২০ শতাংশ। শুধু হাওরে বোরো আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে, যা মোট আবাদের প্রায় ৯.২৫ শতাংশ।
দীর্ঘকাল ধরে দেশে বোরো উৎপাদনের সিংহভাগই আসছে ‘ব্রি ধান ২৮’ এবং ‘ব্রি ধান ২৯’ থেকে। দুই যুগের বেশি পুরোনো এসব জাতের উৎপাদনশীলতা দিন দিন কমেই চলেছে। অন্যদিকে বাড়ছে নতুন নতুন রোগ-বালাইয়ের প্রকোপও। ফলে পুরোনো এসব জাতের বিকল্প হিসেবে নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষের চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত।
এর মধ্যে এ বছর সবচেয়ে আশা জাগানো নতুন জাত হিসেবে উঠে এসেছে ‘ব্রি ধান ৮১’। এছাড়া ‘ব্রি ধান ৮৮’, ‘ব্রি ধান ৮৯’, ‘ব্রি ধান ৯২’ ও ‘ব্রি ধান ৯৬’ পুরোনো জাতগুলোর তুলনায় পরীক্ষামূলক প্রদর্শনীতে দারুণ ফলন দিয়েছে।
জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুমে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ফলন দিয়েছে ‘ব্রি ৮১’। চাষিরা বিঘাপ্রতি ৩১ মণ ফলন পেয়েছেন উচ্চ ফলনশীল এ জাত থেকে। যেখানে প্রতি হেক্টরে আগের জনপ্রিয় জাত ‘ব্রি ২৮’ উৎপাদন হতো ৬ টন, সেখানে একই জমিতে ‘ব্রি ৮১’ চাষ করে ফলন পাওয়া গেছে সাড়ে ৭ টন পর্যন্ত। ফলন বেশি হওয়ায় এ বছর হাইব্রিড ধানের উৎপাদন যেমন বেশি হয়েছে, উচ্চ ফলনশীল ধানের প্রচলন ও সম্প্রসারণও বেড়েছে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, অধিক জনঘনত্বের দেশে নিত্য ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে কৃষি উৎপাদনের ক্রমবৃদ্ধি বিশ্বের কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার। প্রধানমন্ত্রীর দেখানো পথেই কৃষির এই উন্নয়ন। কৃষি উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও ধারা অব্যাহত রেখেছেন তার সুযোগ্য কন্যা। তার সফল সরকারের শাসনামলে সার্বিক কৃষিতে এ বিপ্লব ঘটেছে, আগামীতে এর আরও উন্নয়ন হবে, আমরা এটা আশা করতেই পারি।
তিনি আরও বলেন, সরকারের কৃষি অনুকূলনীতি ও প্রণোদনায় কৃষক এবং কৃষিবিদদের মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। জনগণের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক এখন কৃষি।
তথ্যসূত্র: জাগোনিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ