ব্যাংকের পিয়ন হতে গিয়ে সর্বনাশ তাদের

আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২২, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে পিয়ন পদে চাকরির প্রলোভন দিয়ে প্রতারণায় নেমেছে সংঘবন্ধ একটি চক্র। চক্রটি প্রার্থীদের থেকে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। টাকা খুইয়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত। সম্প্রতি গোদাগাড়ীর পাকড়ী ইউনিয়নে এমন প্রতারণার শিকার অনেকেই। তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন পাঁচ জন নারী-পুরুষ।

ভুক্তভোগিরা জানায়, প্রার্থীদের থেকে ৫ লাখ থেকে ১২ লাখ পর্যন্ত টাকা নিয়েছে প্রতারক চক্রটি। কিন্তু কাউকে চাকরি দিতে পারেনি। চক্রটি আত্মীয়-স্বজন মিলে গড়ে তোলা হয়েছে। তবে টাকা ফেরৎ চাওয়ায় ভুক্তভোগিরা উল্টো হামলা-মামলার হুমকি দিয়েছে প্রতারকরা।

গোদাগাড়ীর পাকড়ী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে পাকড়ী দক্ষিণপাড়ার ভুক্তভোগি পরিবারগুলো কাঁকনহাট পুলিশ ফাঁড়ি ছাড়াও, মেম্বার ও চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগও করেছেন। তবে টাকা লেনদেনের প্রমাণ না থাকায় অভিযোগ কোনো কাজে আসেনি। ভুক্তভোগি মামুনের পরিবার থেকে নেয়া ৫ লাখ টাকা স্ট্যাম্পে লেনদেন হয়েছে। সেখানে লেনদেনের বিষয়টি ঋণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগি তৌহিদুল ইসলাম জানায়, চক্রটির কয়েকজন থাকেন ঢাকায়। তাদের ঢাকার মতিঝিলের পাঁচ তলা ভবনে একটি রুম ভাড়া নেওয়া আছে। গ্রাম থেকে নিয়ে যাওয়া চাকরি প্রত্যাশীদের সেখানে রাখা হয়। কিছুদিন রেখে ট্রেনিং দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়া হয় না।

প্রতারিতদেও অভিযোগ মতে, রফিকুল ইসলাম প্রতারক চক্রের একজন। তিনি পাকড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের নাইট গার্ড। তার স্ত্রী ডলি, ডলির ভাই আজাদ, আজাদের ছেলে শাহরিয়ার ওরফে সজিব আর আজাদের ভাগ্নে রকিব এই চক্রে রয়েছে। তাদের মধ্যে আজাদের দায়িত্ব ঢাকার মতিঝিলের বাড়িতে অবস্থানরত চাকরি প্রত্যাশীদের নিয়ন্ত্রণ করা।

এছাড়া রফিকুলের স্ত্রী গ্রামে প্রচার করেছে তার ভাই আজাদের ছেলে শাহরিয়ার সজিব বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করেন। তাই তার হাতে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে চাকরিতে লোক ঢোকানোর সুযোগ রয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সজিব বেকার।
এলাকাবাসী জানায়, রফিকুল ইসলামরা দীর্ঘদিন থেকে চাকরির বিনিময়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সাথে জড়িত। তাদের বাড়িতে অজ্ঞাত লোকেদের আনাগোনা লেগে থাকে। প্রতারণার বাপারে কাঁকনহাট পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ দেন ভুক্তভোগি তৌহিদুল ইসলাম। কিন্তু প্রমাণ না থাকায় অভিযোগ করে লাভ হয়নি।

চক্রটির পাতা ফাঁদে পাঁ দিয়েছে কলেজছাত্র তৌহিদুল ইসলাম ছাড়াও মামুন অর রশিদ, সুইট, শাহাবুর, শ্রী সুজন শীল, আবু তাহের। এদের মধ্যে তৌহিদুল ও মামুন টাকা দিয়েছে রফিকুলকে। তবে পাকড়ী খুলুপাড়ার আবু তাহের ১২ লাখ টাকা, শ্রী যমুনা ৫ লাখ, মো. সুইট ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা চাকরির জন্য দিয়েছেন।

শ্রী যমুনা বলেন, তার ছেলে শ্রী সুজন শীলকে প্রাইম ব্যাংকে চাকরি দিতে না পেরে ৫ লাখের মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছে সাবেক চেয়ারম্যানকে।

যমুনা আরো বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমি সব টাকা ফেরত পাব। প্রশাসনে আমার আত্মীয়রা চাকরি করে। তারা (প্রতারকরা) জানে, তারা আমার টাকা ফেরত দিয়ে দেব। তবে কষ্ট হয় মামুনের শাশুড়ির জন্য। সহজ সরল মনে জামাইয়ের চাকরি জন্য তিনি টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু টাকাও নাই, চাকরিও নাই।’

আরেক চাকরি প্রত্যাশী সুইট রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। সুইট জানান, আইএফআইসি ব্যাংকে পিয়ন পদে চাকরির জন্য ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়েছেন সাবেক চেয়ারম্যান আনায়ারুল ইসলামের স্ত্রীর হাতে। তবে ট্রেনিং হলেও চাকরি হয়নি। সুইট আরো জানায়, মতিঝিলের পাঁচ তলা ভবনের পাঁচ তলায় আমাকে রাখা হয়েছিল। সেখানে আরো সাতজন ছিলো। তাদের অনেকেই টাকা দিয়েছিল বলে জেনেছি। ট্রেনিং এর কথা ছিল ৬ মাস। এসময় ৮ হাজার ৭০০ টাকা করে দিতো আমাকে। কিন্তু ৫ মাস ৩দিন পরে তারা আমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এক বছর হয়ে গেলো কিন্তু চাকরি হলো না। তবে চেয়ারম্যান ৭০ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছে। বাকি টাকা ফেরত দিয়ে দেবে বলেছে।’

এবিষয়ে সাবেক চেয়ারম্যান আনারুল জানান, ‘রফিকুলের সাথে চাকরি বিষয়ে ঝগড়ার কথা শুনেছি। টাকা নিয়ে চাকরি দিতে না পেরে তাদের মধ্যে ঝগড়ার ঘটনা ঘটেছে। শুনেছি যারা টাকা দিয়েছে তাদের কাছে তেমন ডকুমেন্ট (প্রমাণ) নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি কারো থেকে টাকা নেয়নি। আপনাকে কেউ লিখিত অভিযোগ করেছে কি? করেনি; যারা বলছে তারা মিথ্যা বলছে। আমি কারো থেকে টাকা নেয়নি তো অভিযোগ আসবে কিভাবে।’

ভুক্তভোগি কলেজছাত্র তৌহিদুল ইসলাম বাদশার মা মোসা তহমিনা বেগম বলেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। রফিকুলের স্ত্রী ডলি একদিন সকালে হাঁটতে গিয়ে জানায়, তার ছেলে ঢাকায় যমুনা ব্যাংকে চাকরি করে। ২২ হাজার টাকা বেতনে। বাদশার মা ডলিকে বলেন, দেখো তো আমার ছেলের চাকরি হয় কি না। দু’দিন পরে ডলি বাদশার মাকে জানায়, সাউথইস্ট ব্যাংকে একজন পিয়ন লাগবে। দ্রুত সাড়ে ৫ লাখ টাকা দিতে পারলে চাকরি হয়ে যাবে।

একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর ২ লাখ টাকা দেওয়া হয় রফিকুল ও ডালির ছেলে রকিবের হাতে। রকিব তৌহিদুলকে জানায়, যোগদানের দিনে সাড়ে তিনলাখ টাকা দিতে হবে। এর পরে তহমিনা দুই বিঘা জমি বিক্রি করে সাড়ে তিন লাখ টাকা দেয় রকিবের হাতে।
এনিয়ে তৌহিদুল জানায়, ‘আমি ঢাকা গেলে তারা মতিঝিলের ৫ তলা ভবনে একটি রুম আমাকে রাখে। সেখানে আরো কয়েকজনও ছিল। প্রতিদিন সকালে শার্ট, প্যান্ট পরে বের হয় আজাদ। রাতে বা সন্ধ্যায় ফিরে আসে। চাকরির বিষয়ে তেমন কথা বলে না। পরে বাড়ির মালিকের থেকে শুনি এই রুম ভাড়া নিয়েছে আজাদ। আস্তে আস্তে বুঝতে পারে সেই রুমে গ্রাম থেকে চাকরি দেওয়ার নামে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের রাখা হয়। বিনিময়ে ভাড়াও নেন তারা। ঢাকার এই পুরো বিষয়টি দেখভাল করেন আজাদ। আর রফিকুলের কাজ গ্রাম থেকে টাকা নিয়ে ঢাকায় লোক পাঠানো।
তিনি আরো বলেন, একদিন আমাকে মতিঝিলের সাউথইস্ট ব্যাংকে নিয়ে গেলো। এর পরে সিঁড়িতে বসতে দেয় আজাদ। কিছুক্ষণ পরে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে বলে। জিজ্ঞাসা করলে (আজাদ) বলে, বেশি কথা বলো না, সই করতে বলছি করো। এ সই স্ক্যান করে হাজিরা খাতায় ওঠাতে হবে। তুমি অফিস করলে তার প্রমাণ। তার আগে আমাকে চাকরি যোগদানের কাগজ দেওয়া হয়।
তার পরে সেখান থেকে আমাকে নিয়ে চলে আসা হয়। পরের দিন এলাকার এক বড়ভাইয়ের সাথে ওই ব্যাংকে গিয়ে যোগদানের চিঠি দেখালে ভুয়া বলে ছুড়ে ফেলেন ম্যানেজার। পরের দিন রাজশাহীতে ফিরে আসি। তারা বিভিন্ন টালবাহানা করে, কিন্তু টাকা ফেরত দেয় না।’
মতিঝিলে একই রুমে বাদশার সাথে থাকা মামুন অর রশিদও একই ঘটনার শিকার। আল মামুনকে মিডল্যান্ড ব্যাংকে পিয়ন পদে চাকরি দেওয়ার নামে ৫ লাখ টাকা নিয়েছে চক্রটি। এই মামুনকে মতিঝিলের ওই বাড়িতে তিন মাস রাখে চক্রটি। কিন্তু কোনো ব্যাংকে তারা পিয়নের চাকরি দিতে পারেনি। উল্টো গ্রাম থেকে খাবার ও হাত খরচের টাকা পাঠাতে হতো মামুনের জন্য। এতো টাকা ইনকাম করতে গিয়ে বেশি খরচই হচ্ছে মামুনের। চাকরি না পেয়ে বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন মামুন। এখন গ্রামে কৃষি কাজ করেন।
এবিষয়ে রফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে কল করা হলে বন্ধ পাওয়া গেছে (০১৮৬৬-৬১৬৫৫৪)। এবিষয়টি নিয়ে আজাদকে কয়েকবার ফোন ও ক্ষুদে বার্তা দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। তাই এবিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এবিষয়ে গোদাগাড়ী পাকড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন জানান, ‘ডলি ও তার স্বামী মানুষকে (মটিভেট করে) বুঝিয়ে টাকা নিয়ে ভাইকে দিয়েছে। এই মহিলা খুব ‘ড্যাঞ্জার’। এলাকার সহজ সরল মানুষদের চাকরি দেব বলে টাকা নিয়েছে। এখন এই মহিলাকে বললে বলেন-আমি টাকা নেয়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বসা হয়েছে। তবে টাকা দেওয়ার প্রমাণ না থাকায় কিছু করা যায়নি। সাবেক চেয়ারম্যান আনারুল ইসলামের বিষয়ে বলেন, তিনিও এই চাকরি দেওয়ার চক্রের সাথে জড়িত। কয়েকদিন আগেও এক নারী এমন অভিযোগ করেন। তবে তাকে কিছুটা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি জানায় ওই নারী।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ