ব্ল্যাক ফাঙ্গাস: ওষুধের দাম কমাতে সক্রিয় অধিদফতর

আপডেট: জুন ৫, ২০২১, ২:৩৩ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


গত ২৪ ঘণ্টায় (৩-৪ জুন) করোনায় নতুন শনাক্ত এক হাজার ৮৮৭ জন। এ ২৪ ঘণ্টায় রোগী শনাক্তের হার ১০ শতাংশের উপরে উঠেছে। যা কিনা ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ।
সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতিতে চোখ রাঙাচ্ছে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যার নাম দিয়েছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে দেশে এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ হয়েছে। মাঝে নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মিউকরমাইকোসিস। ভারতে এটি এখন সাক্ষাৎ যমদূত। সেখানকার কয়েকটি জায়গায় একে মহামারিও ঘোষণা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিফদর জানাচ্ছে, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নিয়ে চিকিৎসা বিষয়ক গাইডলাইন তৈরি করছেন তারা। ইতোমধ্যে এর চিকিৎসা সম্পর্কে অধিদফতরের পক্ষ থেকে জেলাগুলোতে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।
মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও কয়েকজন।
এদিকে, জানা গেছে, ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। ওষুধ সহজলভ্য করতে কাজ করছে বলেও জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতরের আরেক মুখপাত্র অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘মিউকরমাইকোসিস বিরল রোগ। চিকিৎসাও ব্যয়বহুল। যেসব ওষুধ লাগে সেগুলো কীভাবে সহজলভ্য করা যায় তা নিয়ে কাজ করছি। দ্রুতই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেবো।’
কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরার্মশক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পরার্মশক কমিটি কোভিড-১৯ চিকিৎসা গাইডলাইনে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের চিকিৎসা অন্তর্ভুক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত এবং স্টেরয়ডের যৌক্তিক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নিয়ে ভয়ের কারণ নেই। এটা আগে থেকেই ছিল। করোনা এটার শঙ্কা বাড়িয়েছে।
‘বাংলাদেশে কিছু রোগী আগেও ধরা পড়েছে। এখনো পড়ছে। আমরা মিউকরমাইকোসিসে একজন রোগী হারিয়েছি। অন্যরা চিকিৎসাধীন এবং তাদের অবস্থা ভালো।’ বললেন রোবেদ আমিন।
তবে মিউকরমাইকোসিসকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব রোগী ডায়াবেটিস, ক্যানসারে আক্রান্ত (বিশেষ করে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত), যারা কেমো পাচ্ছেন, দীর্ঘমেয়াদী স্টেরয়েড পাচ্ছেন- এসব রোগীদের সতর্ক থাকতে হবে।
এমনিতে আশেপাশে যতই মিউকরমাইকোসিস থাকুক, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে এটি আক্রান্ত করতে পারবে না। তবে এর জন্য শুধু মাস্ক পরলেই হবে না, সেটা যেন ঠিকমতো পরা হয় তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবহার শেষে মাস্কটি যেন সঠিক জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে’- বলেন রোবেদ আমিন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্যমতে, মিউকরমাইকোসিস আসে পরিবেশ থেকেই। একে সরাসরি রোধ করা যাবে না। এর কোনও টিকাও নেই। যেসব মানুষের রোগ প্রতিরোধশক্তি কম, তারা কিছু পরামর্শ মেনে চললে ঝুঁকি কমবে। তবে তাতে যে শতভাগ নিরাপদ থাকা যাবে, তা-ও নয়।’
নিকটতম প্রতিবেশী হওয়াতে বাংলাদেশেও ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নিয়ে করোনার মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নতুন নয়। এই সংক্রমণ আগেও দেখা গেছে। কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেরয়েড মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে ডায়াবেটিসের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়। এতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন নিয়ে সতর্কতা : ভারতের ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে সংক্রমণের সঙ্গে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন-এর সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এদেশেও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। এজন্য এখনই এ বিষয়ে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সতর্কতা হিসেবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতাও জরুরি উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিক্যাল বায়োটেকনোলজি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মারুফুর রহমান অপু। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাধারণত ড্যাম্প বা শরীরের ভেজা অংশে এ ফাঙ্গাস সহজে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
তাই বারবার পরতে হলে কাপড়ের মাস্ক রোজ ধুয়ে পরতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড নেওয়া যাবে না একেবারেই।
ভারতে ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন সিলিন্ডার সম্পূর্ণ ক্লিনিং না করে ব্যবহার করা হয়েছে, সেখান থেকেও এটা ছড়াতে পারে মন্তব্য করে ডা. মারুফুর রহমান বলেন, হাসপাতালগুলোতে সঠিকভাবে ডিজইনফেকশন মেইনটেইন করতে হবে। আইসিইউ বা অপারেশন কক্ষেও বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। যদিও আমাদের দেশে এখনও ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন ব্যবহার করা হচ্ছে না, তথাপি যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোকে ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সঙ্গে যে পানি দেওয়া হয় সেটাও শতভাগ বিশুদ্ধ হওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষকে বোঝাতে হবে, বোঝানোর জন্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। একইসঙ্গে এর ওষুধের দাম কমানোর উদ্যোগও নিতে হবে।’
গাইডলাইন কতদূর : ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাইডলাইন কতদূর জানতে চাইলে অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক রোবেদ আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ বিষয়ে অধিদফতর একটি ছোট গ্রুপ করে দিয়েছিল। তারা একটি খসড়া তৈরি করেছে।
ওষুধের দাম কমানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সোর্স তো একটাই’। শুধু একটা কোম্পানিই এ ওষুধ তৈরি করছে। তাই অন্য কোম্পানিকেও এ ওষুধ তৈরির জন্য বলা হয়েছে। তাতে দাম কমে আসবে বলে জানান তিনি।
ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের জন্য মুখে খাওয়ার ওষুধ আমাদের দেশে নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেটা কাজ করে মিউকরমাকোসিসিসে, সেটা নেই। ওষুধ কোম্পানিকে বলা হয়েছে তৈরি করার জন্য।’- বাংলা ট্রিবিউন