বড়দিন : ক্ষমা, ভালবাসা আর সেবার অঙ্গিকার

আপডেট: ডিসেম্বর ২৫, ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

ডেভিড সরকার:


আজ ২৫শে ডিসেম্বর, মুক্তিদাতা প্রভু যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন! খ্রিস্ট-বিশ্বাসীদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এই দিনে একটি গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে যীশুর জন্মের তাৎপর্য সম্পর্কে দুয়েকটি কথা বলছি-
“এ জগতে ছিল যত লাঞ্ছিত, নিপীড়িত,
বঞ্ছিত, আশাহত, অনাদৃত জন;
তাদের জীবন দিতে, চালাতে ন্যায়ের পথে
মুক্তিদাতার হল আগমন।
মানুষে মানুষে ছিল যত বিভেদ,
হিংসা দ্বন্দ্ব আর যাতনা অশেষ;
দুঃখ, ব্যথা, কত ক্ষুধা অনাটন,
তাঁর আগমনে হলো বিনাশন।”
এই মহামানব যীশু খ্রিস্ট প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্যালেস্টাইন দেশের বৈৎলেহম নগরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পবিত্র বাইবেল অনুযায়ী ঈশ্বর মানুষকে ভালবেসে সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাদের সৎপথে থেকে তাঁর আরাধনা করার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সবকিছু উপভোগ করার সুযোগ দিয়েছিলেন। ঈশ্বর বিভিন্নভাবে মানুষকে সুপথে পরিচালনার উপদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ এদন বাগান থেকেই ঈশ্বরের আবাধ্যচারণ করতঃ ক্রমাগত বিপথে যেতে থাকল। তারা অধার্মিকতা, অন্যায়, হানাহানি, যুদ্ধ, অসামাজিকতা, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এক অন্ধকারময় অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ঈশ্বর মানুষকে এই বিপর্যায় থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁর প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী মাতা মরিয়মের কোলে মানুষ বেশে যীশুকে এই পৃথিবীতে পাঠালেন। অত্যন্ত দীন বেশে আজকের এই দিনে তিনি বৈৎলেহমের একটি গোয়ালঘরে জন্ম নিলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, “প্রভুর আত্মা আমাতে অধিষ্ঠান করেন, কারণ তিনি আমাকে অভিষিক্ত করিয়াছেন, দরিদ্রদের কাছে সুসমাচার প্রচার করিবার জন্য, তিনি আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন বন্দিদের কাছে মুক্তি প্রচার করিবার জন্য, অন্ধদের চক্ষুর্দ্দান প্রচার করিবার জন্য, উপদ্রুতদিগকে নিস্তার করিয়া বিদায় করিবার জন্য, প্রভুর প্রসন্নতার বৎসর ঘোষণা করিবার জন্য”। যীশু খ্রিস্ট তখনকার সেই ঘুণে ধরা আর পাপ পঙ্কিল সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন, নির্যাতিতদের পক্ষ নিলেন আর নির্বোধসহ সকল মানুষকে পাপের পথ থেকে ফিরে এসে ঈশ্বরের বিধান অনুযায়ী জীবন যাপনের আহবান জানালেন। ক্ষমা আর প্রতিবেশীকে নিজের মত করে ভালবাসা এবং মন-প্রাণ দিয়ে একমাত্র ঈশ্বরের আরাধনা করার মহৎ আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে তিনি নিজের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন।
খ্রিস্টের পবিত্র রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সেই আদর্শের ভিত্তিতে আজ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে তাঁর কোটি কোটি অনুসারী। খ্রিস্টের অন্যতম আদর্শ হচ্ছে অন্যকে ক্ষমা করা এবং প্রতিবেশীকে নিজের মত করে ভালবাসা। আর সেই ক্ষমা আর ভালবাসার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া তাঁর আরাধনা করা। ‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহু দূর – মানুষেরই মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেই সুরাসুর’; কবি যেন যীশুর সেই আদর্শেরই প্রতিধ্বনি করেছেন। আজ যীশুর জন্মের দীর্ঘ ২০২১ বছর পার হতে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে মানুষে মানুষে বিভেদ, হিংসা, দ্বন্দ্ব, অন্যায়, অত্যাচার, ধর্মীয় গোড়ামী, সন্ত্রাস ইত্যাদি বরং আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ তাই, খ্রিস্ট-বিশ্বাসীদের আত্মমূল্যায়ণের দিন এসেছে; সময় হয়েছে খ্রিস্টের ক্ষমা আর ভালবাসার পরশ পাথরে নিজেদের আর একটিবার পরিশুদ্ধ করে নেওয়ার। যীশু খ্রিস্টের আর এক নাম হচ্ছে, শান্তিরাজ। আজ যীশুর জন্মদিনে তাঁর অনুসারীদের বাংলাদেশ ও বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে নবায়িত হওয়ার দিন। সেবা, ভালবাসা আর ক্ষমার মধ্য দিয়ে খ্রিস্টের পক্ষে এই বিশ্বে বানব কল্যাণ আর শান্তির লক্ষ্যে কাজ শুরু করার দিন হচ্ছে বড়দিন।
শুভ হোক এবার যীশুর জন্মদিন, জন্ম নিক ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার এক নতুন প্রত্যয় আমাদের জীবনে আর ধুয়ে মুছে যাক যত অবহেলা, অবিচার, দ্বন্দ্ব, সন্ত্রাস এবার যীশুর আগমনে। ক্ষুধা, অনাটন আর বেদনার সমাধিতে ফুটুক একরাশ শান্তির ফুল-আমাদের ক্ষমা, ভালবাসা আর সেবার নবায়িত অঙ্গীকারে। বড়দিন শুভ হোক প্রতিদিন, হোক চিরদিন! আপনাদের সকলকে জানাই শুভ বড়দিন!
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত এনজিও কর্মকর্তা এবং লেখক, সদস্য, চার্চ অব বাংলাদেশ, রাজশাহি সিটি চার্চ, শ্রীরামপুর (মিশন হাসপাতালের পশ্চিমে)।