বড় মাপের ফুটবলার ছিলেন শামসু মোল্লা

আপডেট: আগস্ট ২৮, ২০১৭, ১:০২ পূর্বাহ্ণ

ক্রীড়া প্রতিবেদক


শামসুল ইসলাম ওরফে শামসু মোল্লা- সোনার দেশ

জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলটের বাবা শামসুল ইসলাম ওরফে শামসু মোল্লা। ছেলের পরিচয়ে পরিচিত হতে সংকোচবোধ করতেন তিনি। কারণ এক সময়ের খ্যাতনামা ফুটবলার ছিলেন শামসু মোল্লা। তিনি আর নেই, ৭৭ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। শামসু মোল্লাকে বর্তমান প্রজন্ম পাইলটের বাবা হিসেবে চেনেন। কিন্তু ষাট ও সত্তরের দশকে নিজের নামেই উদ্ভাসিত ছিলেন শামসু মোল্লা। সেই সময়ে পাকিস্তান যুব দলের হয়ে রাশিয়ায় খেলে এসেছেন তিনি। স্বাধীনতার পর বয়সের কারণে বাংলাদেশ জাতীয় দলে না খেললেও মোহামেডান বা আবাহনীর হয়ে ঠিকই মাঠ মাতিয়েছেন তিনি।
তার সাথে খেলেছেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে চাকরিও করেছেন সাবেক ফুটবলার আনু। গতকাল তিনি সহযোদ্ধার লাশ দেখতে এসে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, পাইলটকে মিডিয়ার কারণে সবাই চিনে। কিন্তু তার বাবা শামসু ভাই ছিল পাইলটের চেয়েও বড় মাপের খেলোয়াড়। মাঠে নামলে প্রতিপক্ষ দলের মধ্যে একটা আতঙ্ক থাকতো। কারণ তার পায়ের ফুটবলীয় যাদু ছিল অসাধারণ। শুধু তাই নয়, উভয় দলের দর্শকের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি শান্ত রাখারও চেষ্টা করতো। একবার ঈশ্বরদীতে দুই দলের খেলা। আমরা একটি দলের হয়ে খেলতে গিয়েছি। কিন্তু উভয় দলের মধ্যে তুমুল উত্তের্জনা। তখন তিনি মাঠের মধ্যে উভয় দলের খেলোয়াড়দের বললেন, এই ম্যাচে কোন দলই জয়-পরাজয় নিয়ে যেতে পারবে না। ম্যাচটিকে ড্র করতে হবে। কারণ উভয় দলের দর্শকের মধ্যে আমি অস্ত্র থাকার খবর পেয়েছি। এভাবে ম্যাচের দর্শকদের নিয়ন্ত্রণ করতেন।
রাজশাহী সোনালী অতীত ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আলী আফতাব তপন বলেন, গত রোজা ঈদেও আমরা স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলেছিলাম। তখন তিনি গিয়েছিলেন। এবারো ঈদে ফুটবল খেলার জন্য ৬০টা গেঞ্জি অর্ডার দিয়েছিলাম। কিন্তু সে এবার মাঠে যেতে পারবে না। তাই ঈদের পরে ফুটবল ম্যাচটি বাতিল করে দিয়েছি।
রাজশাহীর আরেক ফুটবলার পারভেজ খান বলেন, আমি তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম। সে খুব উচুমানের ফুটবলার ছিলেন। খেলতে স্ট্রাইকার পজিশনে। আর আমার জ্ঞান হবার পর থেকে তাকে দেখে এসেছি, সেই সাগারপাড়া কায়েস ডাক্তারের কালিপুকুরে গোসল করতে যান। আর সেই পুকুরে তার মৃত্যু হলো।
তিনি আরও বলেন, সে রাজশাহী জেলা, বিভাগীয় ও সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়ক হিসেবে বিভিন্ন মাঠে ফুটবল খেলেছেন।
রাজশাহীর মানুষ এখনো এক নামেই চেনে শামসুকে। এত বড় ফুটবলার হয়তো ছিলাম না, তবে মানুষ আমার খেলার ভক্ত ছিল ভীষণ। শামসু দলে আছে জানলে মাঠে লোকের জায়গা দেওয়া যেত না। আর শুধু তিনি নয়, তারা সাত ভাই-ই ছিল ফুটবলার। সবারই ভক্ত ছিল আলাদা করে। তবে শামসু মোল্লা স্ট্রাইকার ছিল বলে লোকের নজরে বেশি পড়তেন। হাজার হোক যারা গোল করে, শেষপর্যন্ত ফোকাসটা থাকে তাদের ওপরই।
সাত ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন শামসু মোল্লা। বাবা-দাদারা হয়তো খেলতেন না, তবে শামসু মোল্লাদের খেলার বিরোধিতাও করেন নি কখনো। উৎসাহ দিয়ে গেছেন সব সময়। তবে তাঁরাও ভাবেননি, ফুটবলটা পেশা হিসেবে নেওয়া যায়। ভাবিনি শামসু মোল্লা নিজেও। ফুটবল খেলতেন মনের আনন্দে। সেই আনন্দটাই একটা সময় হয়ে পড়ল পেশা। ফুটবল খেলে কাড়ি কাড়ি টাকা হয়তো পাইনি, তবে তিনি যা পেয়েছেন তাতে স্বাচ্ছন্দ্যেই সংসার চলে গেছে।
শামসু মোল্লা জন্ম ১৯৪৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে জন্মগ্রহণ করেন। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাদের পরিবার রাজশাহী আসে ১৯৪৯ সালে। আর সবার মতো ফুটবলে তার শুরুটা হয়েছিল স্কুল পর্যায়ে। তাদের সময়ে ফুটবলে খুব সুনাম ছিল নগরীর লোকনাথ স্কুলের। সেই স্কুলেই পড়াশোনা করেছিল ক্রীড়া পরিবারের সাত ভাইয়ের ছয়জন। একসঙ্গে স্কুলের হয়ে খেলেছেন ইসলাম, নজু, শামসু মোল্লা ও জালু। একেক ভাই একেক পজিশনে খেলতো। তাই জায়গা নিয়ে কোনো সমস্যা হতো না। তবে স্ট্রাইকার বলে স্কুলের স্যারদের একটু বেশি পছন্দের ছাত্র ছিল শামসু মোল্লা। তাই তো ১৯৫৬ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় শামসু মোল্লা ইন্টারস্কুল প্রভিনশিয়াল দলের হয়ে খেলেছিলেন। সে বারই প্রথম পূর্ব পাকিস্তান স্কুল ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল লোকনাথ স্কুল। সেই দলে খেলেছিল শামসু মোল্লা, ইসলাম আর নজু । স্কুলের সবার চোখে শামসু মোল্লারা ছিলেন তখনকার নায়ক। স্কুল ফুটবলে ভালো করাতেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন-জীবনে আর কিছু হতে পারি না পারি, ফুটবলার হতেই হবে তাদেরকে ভাইদ্বয়কে।
শামসু মোল্লার ঢাকার প্রথম ক্লাব ছিল সেন্ট্রাল জেল। তাদের হয়ে তিনি খেলেছিলেন ১৯৫৮ সালে। অভিনেত্রী চিত্রা সিনহার ভাই নির্মল কুমার সাহ-ই পাইলটের বাবাকে নিয়ে যান এই ক্লাবে। এরপর গোলও পেয়ে যাই প্রথম ম্যাচেই। এরপর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আগা খান গোল্ডকাপে সেন্ট্রাল জেলের হয়ে প্রথম মৌসুম খেলার পরই ডাক পেয়ে যাই তখনকার তরুণ ফুটবলারদের চারণভূমি কামাল স্পোর্টিং ক্লাবে। তাদের সময় সব তরুণের স্বপ্নের জায়গা ছিল সেটা। সেখানে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় মৌসুমে ডাক পেয়ে যাওয়ায় ভাগ্যবান হয়েছিল তার। বাড়ি থেকেও সমস্যা হচ্ছিল না ওরা ভালো অঙ্কের টাকা দেওয়ায়। সেন্ট্রাল জেলে প্রথম মৌসুমে টাকা দিয়েছিল পাঁচ হাজার রুপির মতো। সে সময়ের পাঁচ হাজার রুপি এই সময়ের কয়েক লাখ টাকার সমান। তখনই বুঝে গিয়েছিলেন তিনি, পেশাদার হয়ে গেছি আর ভালোভাবে খেলতে পারলে অন্য চাকরির দরকার নেই। কোচ বজলুর রহমানের হাত ধরে কামাল স্পোর্টিং আমাদের সময়ই প্রথমবার নাম লেখায় ঢাকা লিগের প্রথম বিভাগে। এরপর ১৯৬১ সালে যোগ দিই ঢাকেশ্বরী কটন মিলে (ডিসি মিল)। ১৯৬৩ সালে। সে সময় দিনাজপুরের একটা টুর্নামেন্টে শামসু মোল্লার খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন মোহামেডান ও পাকিস্তান জাতীয় দলের দুই কৃতী ফুটবলার কবীর ও গজনবী। তাঁদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েই মোহামেডানে যান তিনি। মোহামেডানে শুরুতে জায়গা পেতে সমস্যা হলেও কিছু দিনের মধ্যে স্ট্রাইকার হিসেবে নিশ্চিত হয়ে যায় তার নাম। ১৯৬৩, ১৯৬৫, ১৯৬৬ আর ১৯৬৯ সালে লিগ জেতার পাশাপাশি মোহামেডানের হয়ে আগাখান গোল্ড কাপ জিতেছিল ১৯৬৪ ও ১৯৬৮ সালে। জহির, বশির, জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ হাজরা, নুরুন্নবী, কালা গফুর, মুসা, তোরাব আলিদের নিয়ে দুর্দান্ত দলই ছিল মোহামেডান।
টাকাপয়সা আর অন্য কিছু ঝামেলার জন্য ১৯৭৩ সালে যোগ দেই পিডাব্লিউডিতে। মোহামেডানে রেজিস্ট্রেশন করার পর পিডাব্লিউডিতেও রেজিস্ট্রেশন করায় ঝামেলা হয়েছিল বেশ। এরপর নাটকীয়ভাবে ১৯৭৫ সালে যোগ দেন ঢাকা আবাহনীতে। আর ১৯৮০ সাল পর্যন্ত আবাহনীর তাবুতে ছিলেন তিনি। ১৯৮০ সালে খেলা ছেড়ে দিলেও ইস্টএন্ড অবনমন হতে যাচ্ছিল। তখন সে ক্লাবে যোগ দেন তিনি। ঢাকার পাশাপাশি ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত খেলেছেন রাজশাহী মোহামেডানের হয়েও। খেলেছেন রাজশাহী জেলা আর বিভাগীয় দলের হয়ে। এই দলগুলোর অধিনায়কও ছিলেন তিনি। আর ক্ষেপে তো খেলেছিলেন বাংলাদেশজুড়ে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত কোনো জেলা বাকি নেই, যেখানে ক্ষেপে খেলতে যাইনি। এতে ইনজুরির শঙ্কা থাকলেও তিনি অহেতুক ডেনজার জোনে যেতেন না বলে ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির শরীরটা নিয়ে সেভাবে চোট পাইনি।
শামসু মোল্লা ডিসি মিলের হয়ে খেলছিলেন ১৯৬১ সালে। সে সময় খুব শক্তিশালী দল গড়ত তারা। এখানেই নজরে পড়েন পাকিস্তানি ফুটবল কর্তাদের। এর কিছু দিন পর সুযোগ পেয়ে যান পাকিস্তান যুব দলে। তখন ফুটবলে খুব সুনাম ছিল গজনবী, দেবিনাশ, বশির আহমেদ, প্রতাপ হাজরাদের। তাদের সঙ্গে ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলেছেন সফরকারী চিনের বিপক্ষে। পাকিস্তান যুব দলের হয়ে রাশিয়া গিয়েছিলেন ১৯৬৫ সালে। ৪০ জন ফুটবলারকে ট্রায়ালে ডাকার পরই গড়া হয়েছিল সে দল। অনুশীলনে পূর্ব পাকিস্তান ৪-১ গোলে পশ্চিম পাকিস্তানকে হারালেও পূর্ব পাকিস্তান থেকে শামসু মোল্লা, প্রতাপ, গাউস, রানা আর আনসারীই কেবল সুযোগ পেয়েছিল সেই যুব দলে।
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা দল গড়া হয়েছিল। সেই দলে রাজশাহীর কয়েকজন খেলেছিলও। তাকে কয়েকবার চিঠি দিয়ে দলে যোগ দিতে অনুরোধ করা হয় তখন। কিন্তু তার মেয়ে অসুস্থ থাকায় ইচ্ছা থাকার পরও যেতে পারিনি। শামসু মোল্লার পুরো পরিবার যুদ্ধের সময় চলে গিয়েছিল ভারতে। যেতে পারিনি কেবল শামসু, তার স্ত্রী, মেয়ে আর বাবা। যুদ্ধ চলার সময়ই একদিন পাকিস্তানি সেনারা চলে আসে তাদের রাজশাহীর এই বাড়িতে। আমার মাথায় ঠেকিয়ে দেয় বন্দুকও। তখন শামসু মোল্লার স্ত্রী বুদ্ধি করে ভেতর থেকে নিয়ে আসে আইয়ুব খানের সঙ্গে তোলা সেই ছবিটা। পাকিস্তানি সেনারা এটা দেখে বুঝতে পারে শামসু মোল্লা বড় মাপের ফুটবলার; না হলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কেন ছবি তুলবেন তার সঙ্গে! ছবিটা দেখে তাই ছেড়ে দেয় ওরা। মরতে মরতেও বেঁচে যাই সে যাত্রা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ