ভাতবাবু

আপডেট: জুন ৪, ২০২১, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

ফারদিন শামস তিমির:


সেদিন শিক্ষক বাংলা ব্যাকরণের বাক্যের উপর ক্লাস নিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, একটি আদর্শ বা সার্থক বাক্য হতে হলে অবশ্যই তিনটি বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন এগুলো হলো- আসত্তি, যোগ্যতা ও আকাক্সক্ষা। আসত্তি ও যোগ্যতা কী তা স্যার চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দিলেন। সবাই একবারে বুঝে গেল। একটি প্রশ্নও করল না। এবার তিনি আকাক্সক্ষা বুঝাতে গিয়ে বললেন, ধরো আমি বললাম, ‘আমি ভাত’ – তারপর থেমে গেলাম। তাহলে তোমার আরও কয়েকটি পদ শুনতে ইচ্ছা করবে। কারণ এতে বক্তা তথা আমার সম্পূর্ণ মনের ভাব বোঝা যায়নি। তোমার আরও পদ শোনার এ ইচ্ছাই হলো আকাক্সক্ষা। জেমি নামের সহপাঠি হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলে, স্যার ! আমার মনে আরও পদ শোনার ইচ্ছা জাগবে না। কারণ আপনার উদাহরণমতে ‘আমি ভাত’ অর্থ আপনি ভাত। অর্থ্যাৎ আপনার নাম ভাত। এর দ্বারা আপনার মনের সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ হচ্ছে। তাই এ বাক্যে আকাক্সক্ষা নেই। স্যার এ কথা শুনে হেসে বলে, এ পাগল ছেলে ! কারও নাম ভাত হয় ? কোনদিন শুনেছ কোন মানুষের নাম ভাত ? জেমি বলে, স্যার ! মানুষের নাম আজকাল ফল ও যানবহনের নামানুসারে রাখা হচ্ছে। যেমন- ডালিম, আপেল, রকেট ইত্যাদি। ২-১ বছরের দেখা যেতে পারে মানুষের নাম ভাতের মতো শর্করাজাতীয় খাদ্যের নামানুসারে রাখা হচ্ছে ! তখন তাহলে এরকম নাম অহরহ শুনতে পাব। এ কথা শুনে গোটা ক্লাস হাসতে লাগে। স্যারও তার হাসি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। তিনি হাসতে লাগলেন ও হেসে হেসে বললেন, এরকম শর্করাজাতীয় খাদ্যের নাম কেউ কোনদিন রাখবে না। ফলমূল, যানবাহন এগুলোর নামানুসারে মানুষ নাম রেখেছে তবেএরকম শর্করাজাতীয় খাদ্যের নাম কোনদিন রাখবে না। জেমি সেদিন আচ্ছা, ঠিক আছে বলে প্রসঙ্গটাকে বাদ দিলেও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে বড় হয়ে সে তার ছেলের নাম ভাত রাখবে। সে-ই এরকম আজব নাম রাখার প্রবর্তক হয়ে উঠবে !
সেদিন জেমি অষ্টম শ্রেণির একজন কিশোর ছিল। আজ সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক। আজ তার বিয়ে হয়ে গেছে। ৮ বছরের এক ছেলে আছে তার। মাস চলে গেছে, বছর চলে গেছে তবু জেমি সেদিনের সে প্রতিজ্ঞার কথা ভুলেনি। সে তার ছেলের নাম রেখেছে ভাত ! এমনকি তার সম্পূর্ণ নামে বংশনামের কোন মিল না রেখে আজব এক নাম রেখেছে তা হলো – রাইস শর্করা ভাত ! ভাত এখন তুরাগপুর প্রাইমারিতে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। বহুদিন পর
আজ তাদের স্কুলে এক নতুন স্যার এসেছেন। তিনি ক্লাস ওয়ান এর ইংরেজি ক্লাস নিবেন। তিনি ক্লাস ওয়ানের
রুমে ঢুকে বললেন, আমার নাম ফাহিম, এবার তোমাদের নাম শুনব। একে একে বলতে থাক। – মিথিলা, সিয়াম,
তানভীর, ফারহান, ভাত…থামো, থামো। কার নাম ভাত ? ভাত বলল, স্যার, আমার নাম ভাত। ফাহিম স্যার
বললেন, কী ! তোমার নাম ভাত ? কে রেখেছে তোমার এমন নাম ? ভাত বলল, আমার বাবা আমার নাম রেখেছে । স্যার বললেন, তোমার ফুল নেম কী ? ভাত বলল, রাইস শর্করা ভাত ! স্যার হেসে বললেন, মানুষ নাম রাখে
সরকার আর তোমার বাবা নাম রেখেছে শর্করা ! হা ! হা ! যাই হোক তোমরা যারা বাকি আছ তারা একে একে নাম বলতে থাক । …তারপরের দিন গণিত ক্লাস নিতে হাসিব স্যার রুমে ঢুকলেন । তিনি দেখলেন তানভির ক্লাসে গল্প করছেন । তিনি তা দেখে রেগে গেলেন । রেগে গিয়ে তিনি তানভিরকে তানভিরের জ্ঞানের বাইরে প্রশ্ন ধরলেন –
বল তো ভাতের মধ্যে কী কী পুষ্টি উপাদান রয়েছে ? তানভির নির্দ্বিধায় বলল, স্যার ভাতের শরীরে কিছু নেই !
ভাত খুবই চিকন একজন ! খেলার সময় ভাত যখন দৌড়ায় তখন মনে হয় দৌড়াতে দৌড়াতে বাতাসে উড়ে যাবে !
তাই ভাতের মধ্যে কোন পুষ্টি নেই ! সে অপুষ্টি ! এ কথা শুনে স্যার অবাক হয়ে বললেন, ভাত কী জিনিস চিন ?
তানভির বলল, হ্যাঁ। এইতো আমার পাশে বসে আছে। আমার বন্ধু হয়, নাম হলো তার ভাত। এতক্ষণ এই
ভাতেরই কথা বলছিলাম হি হি ! এ কথা শুনে গোটা ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়ল। স্যার সবাইকে চুপ করালেন ও বললেন, ওই প্রশ্নটা বুঝেনি। যাই হোক শুনে নাও, ভাতে ফ্যাট থাকে ০.১ গ্রাম, ক্যালসিয়াম থাকে ৩ মিলিগ্রাম ও …. এভাবে প্রায় প্রতিদিনই ভাতকে নিয়ে ক্লাসে কৌতুক সৃষ্টি হতে থাকে। এতে ভাত মন খারাপ করে ও বাড়ি গিয়ে বাবাকে বলে , আমার এমন নাম কেন রেখেছ বাবা ? এ নাম শুনে ক্লাসে সবাই হাসে। বাবা বললেন, মন দিয়ে শোন। নাম ভালো না খারাপ তা দেখলে হবে না। জীবনের উদ্দেশ্য হবে নিজের নাম উজ্জ্বল করা। সে নামটি কেমন তা যাচাই করার আগ্রহ জীবনে থাকবে না। শুধু যেভাবেই হোক নাম উজ্জ্বল করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যেমন- আজ তোমার নাম শুনে সবাই হাসছে তবে কাল তুমি ভালো রেজল্ট করলে কালকে কেউ আর তোমাকে নিয়ে মজা করবে না এমনকি স্বয়ং প্রধান শিক্ষক তোমায় খুঁজবে। তা ছাড়া পড়ালেখা করে তুমি বড় মানুষ হলে কেউ
তোমাকে ভাত বলে ডাকবে না। বরং সম্মান জানাবে। ভাতবাবু ভাতস্যার বলে ডাকবে। তাই নাম কেমন তা না ভেবে নাম উজ্জ্বল করার মধু পান কর, পড়ালেখা কর। বড় মানুষ হও। নিজের নাম উজ্জ্বল কর । ভাত খুব মন দিয়ে কথাগুলো শুনল। সে আর নাম নিয়ে ভাবে না। বরং আসন্ন পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জনের কথা ভাবে। এত ছোট
বরসেই দিনে ৬-৭ ঘণ্টা পড়ে। আর পড়লে অবশ্যই সফলতা আসবে। আর তা-ই হলো। সে পরীক্ষায় ফার্স্ট হলো
। সত্যিই তাই, ফার্স্ট হওয়ার পরের দিন স্বয়ং প্রধান শিক্ষক ছুটে এলেন। ক্লাসে এসে বললেন, তোমাদের মধ্যে ভাত কে? স্যার ! আমি ভাত। ধন্যবাদ , এত সুন্দরের রেজাল্টের জন্য। অভিনন্দন …..

এভাবে পড়ালেখার ব্যস্ততা, ফার্স্ট – সেকেন্ড হতে হতে অনেক বছর পার হয়ে গেল। আজ জেমি বৃদ্ধ হয়ে গেছে
আর ভাত প্রাপ্তবরস্ক হয়ে গেছে। সেদিন বাবার কথামতো নাম নিয়ে না ভেবে পড়েছে, রাত জেগে পড়েছে। আজ
ভাত একজন ইঞ্জিনিয়ার। বাবার কথাটি যে ঠিক ছিল আজ তার প্রমাণ পায় ভাত। কেউ আজ তাকে ভাত বলে
ডাকে না। বরং বলে, ভাত ভিলা- এর পাঁচ তলায় ভাতবাবু থাকেন। ইঞ্জিনিয়ার ভাতবাবু। রাস্তায় দেখা হলে
লোকজন সালাম দেয় ও বলে, কেমন আছেন ভাতবাবু ? ভাত স্যার সালাম ভাতস্যার… আজ ভাতেরও একটা ছেলে হয়েছে। নাম তার জাম ! এ নাম তার দাদুর নামের সাথে মিল রেখে রাখা হয়েছে। জেমি সবসময় জামকে বলে, জীবনের মূল উদ্দেশ্য পড়ালেখা করে বড় মানুষ হওয়া হলে তুমি অবশ্যই সফল হবে। এর বাস্তব প্রমাণ তোমার বাবা। তাই ভালো করে পড়। পড়ালেখার বিকল্প নেই …