ভাব প্রকাশের এক বাচনিক ভাষা

আপডেট: জুলাই ১৩, ২০১৭, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ভাষা। সে ভাষা হতে পারে সাধু ভাষা, চলিত ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা, বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, আরবি, ফারসি, সংস্কৃত কিংবা অন্য যে কোনোটি। নিজের অনুভূতি কিংবা মনের ভাব প্রকাশের উপায় হতে পারে লিখিত কিংবা অলিখিত, মৌখিক/বাচনিক কিংবা, অবাচনিক। কথা বলে বা লিখে খুব সহজেই কোনো বিষয় প্রকাশ করা যত সহজ, ততটাই কঠিন কথা না বলে কিংবা না লিখে কোন কিছু প্রকাশ করা। কিন্তু এটা অসম্ভব নয়। শরীরী ভাষা, নানা যন্ত্র কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কথা না বলে কিংবা না লিখেও ভাব প্রকাশ করা সম্ভব। কলিং বেল বাজলে বুঝি কারো আগমন বার্তা, অফিসে বেল বাজিয়ে কাউকে ডাকা হয়, টেলিফোনের রিং জানিয়ে দেয় কেউ ফোন করে কাউকে চাচ্ছে, দরজার টুকটুক শব্দ বোঝায় কেউ দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, ঘড়ির ঢং ঢং শব্দ জানিয়ে দেয় সময়, সাইরেন হয় বিপদ সংকেত নতুবা রমজান মাসে সেহেরি ও ইফতারির সময় জানায়, মোবাইলের রিং টোন জানিয়ে দেয় কল করছে, গাড়ির হর্ন পথচারীদের সতর্ক করে, সিগনাল বাতি যানবাহনের চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করে, রাস্তার মোড়ের তীর চিহ্নগুলো কোনো স্থানের দিক নির্দেশনা দেয়, অ্যাম্বুলেন্স কিংবা দমকল বাহিনীর গাড়ির নিজস্ব শব্দ আছে। ঘন কালো মেঘ বর্ষার আগমন বার্তা জানায়। ঋতু বৈচিত্র্যে প্রকৃতির রূপমাধুরী আমাদের জাগিয়ে দেয় নতুন নতুন ঋতুর আগমন বার্তা।
ভাব প্রকাশের কঠিনতম শিল্প হচ্ছে নাচ। নাচের নানা মুদ্রা ও অঙ্গভঙ্গি দিয়ে এক একটি বিশেষ অবস্থা বা ঘটনা বর্ণনার চমৎকারিত্ব মানুষকে মুগ্ধ করে। মানুষের মনের এক একটি অবস্থা অর্থাৎ মানুষের আবেগ ও অনুভূতিগুলোও বাচনিক ভাষা ছাড়াও সহজেই প্রকাশিত হয়। দুঃখ পেলে মানুষ কাঁদে, আনন্দে হাসে, রাগে দাঁত কড়মড় করে কিংবা মাথার চুল ছেঁড়ে, কিংবা কোন কিছু ছুঁড়ে ফেলে, ভেঙ্গে ফেলে অথবা কিল-ঘুষি মারে কাউকে, আর মানুষ না পেলে চেয়ার, টেবিল, দরজা কিংবা দেয়ালে, ভয়ে থরথর করে কাঁপে, কাউকে ভালো লাগলে হাসে কিংবা মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকে, খারাপ লাগলে মুখ ঘুরিয়ে থাকে, আদর করলে মাথায় গায়ে হাত বুলায় কিংবা চুমু দেয়। কারো হাতে হাত রেখে ভাব বিনিময় আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ বোঝায়। হ্যান্ডসেক করার সময় আলতো করে হাত ধরার ভেতরে আন্তরিকতার অভাব বোঝা যায় পক্ষান্তরে উল্টোটা আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। চোখে চোখে রেখে কথা বলায় আন্তরিকতা এবং একইসাথে দৃঢ়চিত্ততার পরিচয় মেলে। কেউ কথা বলার সময় নতমস্তকে থাকা কিংবা অন্যমনস্কতা আন্তরিকতার অভাব প্রকাশ করে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গের বিভিন্ন ভাগ আছে। চোখের দৃষ্টির ভিন্নতা কখনো ভালোবাসা, কখনো কটাক্ষ, কখনো বিদ্রুপ, কখনো রাগ কিংবা অশোভন ইঙ্গিতও বহন করে। মুখভঙ্গিও তাই, এমনকি হাঁটার ভেতরেও মানুষের ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। কেউ হনহন করে হাঁটে, কেউ টিপটিপ করে হাঁটে, কেউ পা ছেঁচড়ে হাঁটেÑ আবার কেউবা হেলেদুলে হাঁটে। আর কিছু মানুষ হাঁটে খুব পরিচ্ছন্নভাবে। শরীরের ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট মনে হতে পারে কারো কারো ক্ষেত্রে। কিন্তু যারা বোঝে তাদের কাছে কোনো অস্পষ্টতা নয় বরং অনেক বেশি সহজবোধ্য মনে হয়। কিন্তু শরীরের ভাষার প্রমাণ করা একটু কষ্টসাধ্য যদি তার কোন ভিডিও না থাকে। আমরা জানি ‘ঠ’ চিহ্ন বিজয়ের প্রতীক। তেমনি দু’পাশে মাথা নাড়ানো ‘না’-এর প্রতীক। ঠোঁটে আঙ্গুল চাপা দিয়ে আমরা কাউকে ‘চুপ’ করতে বলি। হাত নেড়ে বিদায় জানানো একটা প্রচলিত রীতি। কাউকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা বা সালাম, করা আমাদের সংস্কৃতি- যার অর্থ তাঁকে সম্মান জানানো। এসবই শরীরী ভাষা যেখানে মৌখিক বা লিখিত ভাষার কোনো স্থান নেই। শোভন-অশোভন সব ভাষাই যেমন মৌখিক কিংবা লিখিত হয় তেমনি শরীরী ভাষায়ও হয়। সুতরাং, কারো সাথে ভাব বিনিময়ের সময় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীরী ভাষা বা অ-বাচনিক ভাষা ব্যবহার করা উচিৎ। অন্যথায় ভুল তথ্য উপস্থাপিত হয়ে পরস্পরের ভেতরে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থেকে যায়। এ শরীরী ভাষা আবার দেশ-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং, না জেনে বুঝে কোনো ভাষা (শরীরী) ব্যবহারের ফল মারাত্মক হতে পারে। একই অঙ্গভঙ্গি কোথাও প্রচলিত হলেও অন্যত্র নিষিদ্ধ হতে পারে। সুতরাং, ভাষার অর্থ, তার প্রকাশ ও ব্যবহার সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হওয়া আবশ্যক। ভাষা ব্যবহার মানুষকে কাছে আনে আবার দূরেও সরিয়ে দেয়। আমাদের অত্যন্ত যতœশীল হওয়া উচিৎ এ বিষয়ে।