ভারতের ক্যাম্পাসে আজাদি ঝড়ে তছনছ মুক্তচিন্তার চর্চা?

আপডেট: মার্চ ১০, ২০১৭, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন


ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মুক্ত চিন্তা ও প্রগতিশীল মতাদর্শের কেন্দ্র হিসেবে যে পরিচিতি, তা সম্প্রতি বিরাট হুমকির মুখে পড়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
জেএনইউ বা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, দেশের আরও বহু নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ইদানীং মাথা চাড়া দিয়েছে দেশদ্রোহ বনাম দেশভক্তির বিতর্ক – এবং খানিকটা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনেই ছাত্র-শিক্ষকদের একাংশকে সরাসরি দেশবিরোধী বলেও চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ভারতের বহু নামী বিশ্ববিদ্যালয়েই বামপন্থী চিন্তাবিদদের প্রাধান্য আছে বলে মনে করা হয়, সেখানে দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থেকেই কি এই সংঘাত?
না কি ক্যাম্পাসে ‘আজাদি’ নিয়ে এই বিতর্কের শেকড় আসলে আরও অনেক গভীরে?
ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে দিল্লির একটি কলেজে তোলা একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করেছিল ভারতে শাসক দল বিজেপি-র ছাত্র শাখা এবিভিপি-র নেতৃত্ব।
যাতে দেখা যায়, একদল ছাত্রছাত্রী কলেজের ভেতর মিছিল করে শ্লোগান দিচ্ছেন ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি, বস্তার মাঙ্গে আজাদি’। কাশ্মীর বা মাওবাদী-অধ্যুষিত বস্তার যে ভারতীয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তখন বলা হয়েছিল, বামপন্থী ছাত্র-শিক্ষকরা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রামযশ কলেজে ঢুকে পরিবেশ বিষাক্ত করে তুলেছেন – কাশ্মীর বা বস্তারের আজাদির জন্য শ্লোগান দিয়ে তারা দেশকে টুকরো টুকরো করতে চাইছেন।
কারা দেশবিরোধী আর কারা দেশকে ভালবাসেন, সেই বিতর্কে তখন থেকেই আড়াআড়ি দুভাগ হয়ে আছে দেশের সব নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস।
কথিত দেশদ্রোহীদের ক্যাম্পাস থেকে তাড়ানোর লক্ষ্যে এবিভিপির অভিযান চলছে সেই থেকেই, আর তাতে সক্রিয় সমর্থন জোগাচ্ছে কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি সরকার।
সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডু যেমন পরিষ্কার বলছেন, “কংগ্রেস-কমিউনিস্ট-সাম্প্রদায়িক ও অতি বামপন্থী শক্তিগুলোর অশুভ আঁতাত এই অস্থিরতা তৈরির করার খেলায় নেমেছে। কিন্তু তাদের নাটকে ছেলেমেয়েরা প্রভাবিত হবে না – কারণ দেশভক্তির প্রশ্নে কোনও আপস হতে পারে না। এই দেশে থাকতে হলে দেশটাকে ভালবাসতে হবে, খুব সহজ কথা!” কিন্তু কাশ্মীরের আজাদির জন্য শ্লোগান দেওয়া মানেই সে পাকিস্তানের সমর্থক – বিষয়টা কী অতই সহজ?
গত কদিন ধরে আজাদি-বিতর্কের নার্ভ-সেন্টার যে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, তার প্রবীণ শিক্ষক ও দার্শনিক নির্মলাংশ মুখার্জি মনে করেন, জাতীয়তাবাদের ভেতর কাশ্মীর, মাওবাদ কিংবা ইসলামকে টেনে এনে বিজেপি আসলে একটা চতুর খেলা খেলতে চাইছে।
তার কথায়, “বিজেপি চাইছে জাতীয়তাবাদকে একটা সঙ্কীর্ণ সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলতে – যাতে তাদের আধিপত্যবাদী বা কিছুটা ফ্যাসিবাদী শাসনকে মানুষের চোখে বৈধ করে ফেলা যায়। আর সেই জাতীয়তাবাদী ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলার সহজ রাস্তা হল সব কিছুতে কাশ্মীর আর মুসলিম ইস্যুকে টেনে আনা।”
অধ্যাপক মুখার্জি আরও বলছিলেন, “কাশ্মীরে জঙ্গী দমনের নামে আর বস্তারে মাওবাদী দমনের নামে যা হচ্ছে তাতে ভারতের গরিষ্ঠ অংশের মানুষের সমর্থন আছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু সেই কাশ্মীর বা বস্তারকে কেন্দ্র করেই বিজেপি একটা নতুন জাতীয়তাবাদের ধারণাকে জনপ্রিয় করে তুলতে চাইছে – তাদের রাজনীতিও এটাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।”
ক্যাম্পাসে বিজেপি-সমর্থক ছাত্রছাত্রীরাও প্রকাশ্যেই বলছেন, দান্তেওয়াড়ার জঙ্গলে ৭৬জন সেনা মাওবাদীদের হাতে মারা যাওয়ার পর যারা উৎসব করে – কিংবা ভারতীয় সেনাবাহিনীর পর্যন্ত সমালোচনা করে – অথবা ‘ইনশাল্লা ভারত একদিন টুকরো টুকরো হবে’ বলে যারা শ্লোগান দেয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে কীভাবে তাদের বরদাস্ত করা সম্ভব?
জেএনইউ-তে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট সুচেতা দে কিন্তু পরিষ্কার বলছেন, যে বিজেপি চিরকাল দেশে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগাভাগির রাজনীতি করে এসেছে, তাদের মুখে অন্তত দেশ ভাঙার অভিযোগ মানায় না।
চলমান আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা বাম সংগঠন আইসা-র এই নেত্রীর কথায়, “রামজাদে-হারামজাদের নামে যে যারা দেশকে ভাগ করতে চায়, যে এবিভিপি নেতারা বলেন জেএনইউ না-থাকলে ভারত এতদিনে হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে যেত, তারা কীভাবে এই অভিযোগ করেন?”
“প্রধানমন্ত্রী মোদি পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশে গিয়ে শ্মশান আর কবরস্তানের মধ্যে তুলনা টানেন। বিজেপি তো শুধু জীবিত মানুষ নয়, হিন্দু-মুসলিমের লাশ নিয়েও দেশ ভাঙার রাজনীতি করতে চাইছে!”
আজাদির শ্লোগান তাদের কেউ কেউ দেন এবং দিয়েও থাকতে পারেন সুচেতা তা অস্বীকার করছেন না – কিন্তু তার মতে এই আজাদির অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা।
বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, “সে তো আমরা জেএনইউ বা ডিইউ-রও আজাদি চেয়েছি। তার মানে কি আমরা এই ইউনিভার্সিটিগুলোকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলছি? এসব তো একেবারে উৎপটাং কথা! আর আজাদি যদি কোয়ালিফাই-ও করি, তাহলে আমরা চাই মত প্রকাশের আজাদি, পুলিশি নির্যাতন বা অনাহার থেকে আজাদি, জাতিবাদ বা পুঁজিবাদ থেকে আজাদি – এইসব, যা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার!”
“বস্তার বা কাশ্মীরে যা ঘটছে, এ দেশের মহিলা বা দলিতদের সাথে যা হচ্ছে তাতে কি বলা যায় এই অধিকারগুলো আমরা পেয়েছি? বস্তারে আদিবাসী মহিলারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধর্ষিতা হচ্ছেন, মানবাধিকার কমিশনই তা স্বীকার করেছে। সিবিআই পর্যন্ত বলেছে যে সিআরপিএফ বাহিনী গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিযেছে। এখন আমরা যদি বলি বস্তার এই রাষ্ট্রীয় নির্যাতন থেকে আজাদি চায়, তাতে অন্যায়টা কোথায়?”
ক্যাম্পাসের বহু সাধারণ ছাত্রছাত্রী – যারা সাধারণত রাজনীতির সাতেপাঁচে থাকেন না, তারাও কিন্তু অনেকেই মনে করছেন এই কথায় যুক্তি আছে – এবং তার চেয়েও বড় কথা এবিভিপি তাদের মুখ খোলার অধিকার কেড়ে নিতে চাচ্ছে।
দিল্লির মিরান্ডা হাউস কলেজের বহু ছাত্রীও গত কয়েকদিনে পথে নেমেছেন তাদের কন্ঠরোধ করার চেষ্টার প্রতিবাদে।
তারা সাধারণত রাজনীতির মধ্যে ঢোকেন না, কিন্তু এখন খোলাখুলি বলছেন, “শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজের মত প্রকাশের অধিকার কেন কাড়া হবে – কেন এবিভিপি এই ইস্যুতে গুন্ডামি করবে?”
দিল্লিতে হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক সৌভদ্র চট্টোপাধ্যায় মনে করছেন, আসলে এই গোটা অভিযানটাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কব্জা করার জন্য বিজেপি-র বৃহত্তর চেষ্টার অংশ, আর জাতীয়তাবাদের ইস্যুটাকে তাতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি বলছিলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাধীন চিন্তাভাবনার ওপর একটা প্রাতিষ্ঠানিক আঘাত আসছে – আর এটা শুরু হয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে গত কিছুদিন ধরে যা চলছে তা কিন্তু কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গত বছর অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলাকে নিয়ে বা জেএনইউ-তে কানহাইয়া কুমার-উমর খালিদকে নিয়ে যা ঘটেছে এটাও সেই ধারাবাহিকতায় নবতম সংযোজন।”
সৌভদ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, “আসলে জাতীয়তাবাদ এমন একটা শব্দ, বিজেপি বিশ্বাস করে তার ধুয়ো তুলে সর্বগ্রাসী একটা চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব – যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। সেই চেতনায় ভর করেই তারা জেএনইউ দখল করতে চায়, যেখানে এতকাল এবিভিপি-র কোনও অস্তিত্ত্ব পর্যন্ত ছিল না – কিংবা দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে নিজেদের পায়ের তলার জমি আরও শক্ত করতে চায়।”
ঠিক এই কারণেই দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে বিশাল তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা নিয়ে আজকাল মিছিল করছে এবিভিপি, আর সেই তিরঙ্গা মার্চ থেকে মুহুর্মুহু শ্লোগান উঠছে ‘ভারতমাতা কি জয়’! কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এভাবে দখল করতে চাওয়ার পেছনে কারণটা কী?
আসলে ভারতের নামী ইউনিভার্সিটিগুলো প্রায় সবই বামপন্থীদের গড় বলে পরিচিতি – শিক্ষার দুনিয়াতেও তাই বামঘেঁষা প্রগতিশীল চিন্তারই প্রাধান্য।
আর এর সবচেয়ে ক্লাসিক উদাহরণ হল জহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি বা জেএনইউ, ইন্দিরা গান্ধী না কি বামপন্থীদের কথা ভেবেই এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছিলেন।
জেএনইউ-র হাতে গোনা ডানপন্থী অধ্যাপকদের একজন সৌম্যজিৎ রায় বলছিলেন, “ইন্দিরা বামপন্থী ছিলেন, তার বাবাও ছিলেন মার্ক্সবাদী। আর তার বাবার নামেই তো বিশ্ববিদ্যালয়। তো ইন্দিরা ভেবেছিলেন বামপন্থীদের যদি ইউনিভার্সিটি বানিয়ে দিয়ে সেখানে পড়াশুনো নিয়ে বসিয়ে রাখা যায়, তাহলে রাজনৈতিকভাবে তাদের মোকাবিলা করা বোধহয় সহজ হবে।”
“তিনি যেটা বোঝেননি সেটা হল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বামপন্থী পন্ডিতরা ছেলেপিলের মগজধোলাই চালিয়ে যাবে। ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় অবদানই তাই হল অ্যাকাডেমিশিয়া-কে বামদের হাতে তুলে দেওয়া। জেএনইউ-তে ইতিহাস, অর্থনীতি বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো বিভাগ তৈরিই করা হয়েছিল বামপন্থীদের হাতে দেওয়ার জন্য!”, বলছিলেন অধ্যাপক রায়।
তার কথা সত্যি হলে বুঝতে অসুবিধা হয় না কেন এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাকাডেমিক দখল পেতে বিজেপি বেপরোয়া – আর উল্টোদিকে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মরিয়া বামপন্থীরাও!
জেএনইউ-র প্রাক্তন ছাত্র নেতা ও বর্তমানে সিপিআইএম দলের শীর্ষ নেতা সীতারাম ইয়েচুরি পর্যন্ত নিজে প্রায় রোজ ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গিয়ে ছাত্রদের আন্দোলনে সংহতি জানাচ্ছেন, দেশদ্রোহী বিতর্কে নিজেদের ব্যাখ্যা দিয়ে চলেছেন।
সৌভদ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথায়,”বামপন্থীরা এখন একেবারেই কোণঠাসা। পশ্চিমবঙ্গ হাতছাড়া হয়ে গেছে, কেরলও হয়তো তিন চার বছর বাদে হাত থেকে বেরিয়ে যাবে – টিমটিম করে জ্বলছে শুধু ত্রিপুরার সলতে। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার জন্য অ্যাকাডেমিক চর্চার এই কেন্দ্রগুলোতে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখাটা তাদের জন্য খুব জরুরি। সংঘাতের সূত্রপাতও বোধহয় সেখান থেকেই।”
“অন্য দিকে বিজেপি দেখছে আমাদের দল ক্ষমতায় এসেছে, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে। চারদিকে এখনও বিজেপির হাওয়া, কাজেই এখানে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার এটাই সেরা সুযোগ। ফলে একদলের কাছে এটা অস্তিত্ত্ব রক্ষার বা প্রাণ বাঁচানোর লড়াই, অন্য দলের কাছে নতুন জমি খুঁজে পাবার।”
সৌভদ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই কথার রেশ ধরেই বলা যেতে পারে, ভারতের সেরা ক্যাম্পাসগুলো এখন দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থীদের সেই লড়াইয়েরই সাক্ষী হয়ে থাকছে – যে যুদ্ধে প্রধান হাতিয়ার করা হয়েছে জাতীয়তাবাদের ইস্যু, আর যে যুদ্ধের প্রথম বলি হয়েছে মুক্তচিন্তার চর্চা!-