ভারতে হিন্দুত্ব ও হিন্দু ধর্ম বিতর্কের হিংস্র রূপ ধর্মনিরপেক্ষ ভারত কোন্ পথে?

আপডেট: নভেম্বর ১৭, ২০২১, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

ইসলাম ধর্ম ও ইসলামি উগ্রবাদী, আবার হিন্দুত্ব ও হিন্দু ধর্ম বিতর্কটা এখন বেশ জোরেসোরে আলোচিত হচ্ছে। চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও ভাবগত দিক থেকে বিষয়টি একই হলেও স্ব স্ব ধর্মে মানুষ বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে থাকে। এ নিয়ে বিতর্ক বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে এই মুহূর্তে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। এ আলোচনার কোনোভাবেই যবনিকাপাত হচ্ছে না। কেননা ঘটনা একটার পর একটা ঘটেই চলেছে।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিনিয়র কংগ্রেস নেতা সালমান খুরশিদের নৈনিতালের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে একদল অপরাধী। এর জন্য ভারতের হিন্দুত্ববাদিদের দায়ি করা হচ্ছে। তথাকথিত ‘হিন্দুত্ব’ ও ‘হিন্দুধর্ম’ নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে চলমান উত্তপ্ত বিতর্কের জের ধরেই এই অগ্নি-সংযোগের ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতের সংবাদ মাধ্যমগুলোর তথ্যমতে খুব সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে অযোধ্যা নিয়ে সালমান খুরশিদের নতুন বই ‘সানরাইজ ওভার অযোধ্যা: নেশনহুড ইন আওয়ার টাইম’। সেই বইয়ে হিন্দুত্বের সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো উগ্র ইসলামি গোষ্ঠীগুলির তুলনা টানার ফলে তীব্র বিতর্কের জন্ম হয়েছে। ভারতের শাসক দল বিজেপি প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছিল সালমান খুরশিদ ভারতের হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করেছেন এবং ‘সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি’ করছেন। সেই বিতর্ক শুরুর দিন তিনেকের মধ্যেই উত্তরাখন্ডের পাহাড়ে সরাসরি সালমান খুরশিদের বাড়িতে হামলা চালাল হিন্দুত্ববাদীরা-জ্বালিয়ে দিল সেই বাড়ির একটা বড় অংশ। সালমান খুরশিদের নতুন বইয়ে ‘হিন্দুত্ব’ নিয়ে তার মন্তব্যের জেরেই যে তার বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে পুলিশ-প্রশাসনও একরকম নিশ্চিত। তবে তারা জানিয়েছেন, তদন্তে সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে বিতর্ক যে আরো ঘনীভুত হল তা বলাই বাহুল্য। অগ্নিসংযোগের পর ফেসবুক ও টুইটারে সালমান খুরশিদ লিখেছেন, ‘যে বন্ধুরা একদিন এখানে এসেছিলেন তাদের জন্য এই দরজা আমি খুলে দিতে চেয়েছিলাম। যদি বলি এটা কিছুতেই হিন্দুধর্ম নয়, তাহলে কি এখনও আমি ভুল বলব?’ এই প্রশ্নটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রতিক্রিয়া, সহিংস কাজ, উগ্রতা হিন্দুত্ববাদ এবং ইসলামি উগ্রবাদকে পৃথক করে না বা পৃথক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যারা সালমান খুরশিদের বইয়ের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত খুঁজে পেয়েছেন তারা এখন সংঘটিত সহিংসতার ব্যাপারে কী বলবেন? এ কাজে কি ইসলামি উগ্রবাদের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? সহিংসতা ও হিংস্রতাকে কি ধর্মীয় মোড়কে রেখে এর মূল্যায়ন করা যাবে?

বিশ্বের দেশে দেশে ধর্মান্ধতা নিয়ে বিশ্ববাসীর তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এর জন্য বিশ্বকে কম খেসারত দিতে হয়নি। পৃথক করে দেখলে অনেক সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রও শুধু ধর্মান্ধতার কারণে ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ওইসব দেশে ভয়ঙ্কররূপে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। তদুপরি রাজনীতিতে ধর্মান্ধতা অনাবশ্যকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে। স্বার্থসিদ্ধির জন্য কথিত গণতান্ত্রিক দলগুলোও ধর্মান্ধগোষ্ঠিকে প্রশ্রয় দেয়। এ হেন আত্মঘাতি ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সেটা হবে মানব সভ্যতার জন্য বিপর্যয়।

কোনোই সন্দেহ নেই যে, অখ- ভারত এখনো বহুত্ববাদী দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ভিন্নতার মধ্যেও যেখানে ঐক্যের সুর মানবতাকে জাগ্রত করে রেখেছে। সেখান থেকে পিছে ফিরে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কেননা বহুত্ববাদী দর্শন ভারতের হৃৎপিণ্ড এটা ভুলে গেলে চলবে না। মানুষকে সামনে এগোতে হয় মানুষ হিসেবে- গা ঘেষাঘেষি করেই। এর ব্যত্যয় ঘটলে রাষ্ট্রের ভিতরটা ফাঁপা হতে থাকে। সে ক্ষেত্রে মানুষেরই পরাজয় হয়। শুধু জেতে ধর্মান্ধতা!

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ