ভারত জি আই স্বীকৃতি নিতে থাকবে বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষ নিরব থাকবে ?

আপডেট: জুলাই ৮, ২০২৪, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


অতি সম্প্রপ্তি সুন্দরবনের মধুকে ভারত তাদের জিআই পণ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রেক্ষিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে কোনো আওয়াজ না উঠলেও বাংলাদেশের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এর বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন দেশের প্রশাসনিক অবহেলার কারণে অনেক পণ্যের ভৌগলিক নির্দেশক (জি আই) হারাচ্ছে। অথচ সবাই জানে সুন্দরবনে উৎপাদিত মধুর দুই তৃতিয়াংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের মধুর চাষ হয় এবং বিপুল পরিমাণ মধু উৎপাদিত হয়, প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়। বাংলাদেশিদের ভোগ্যপণ্যের মধ্যে মধু অন্যতম বলা যায়।

দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ২০১৭ সালের ৭ আগস্ট তৎকালিন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেন। অথচ দীর্ঘ ৭ বছরেও স্বীকৃতি মিলেনি। এই জিআই স্বীকৃতি না পাওয়াকে প্রশাসনের অন্যায় অবহেলা আর অবজ্ঞাকে দায়ী করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অন্যদিকে ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বীকৃতি আবেদন করে এবং ৩ বছরের মধ্যে সেই আবেদন গৃহিত হয়। ইতোমধ্যে ভারত জামালপুরের নক্সি কাঁথাকে শুধু নক্সি কাঁথা, সাতক্ষীরার ক্ষীরসাপাতকে মালদার হিমসাগর, চাঁপাইনবাগঞ্জের ফজলি আমকে মালদার ফজলি আম, ঢাকাই মসলিনকে বাংলার মসলিন, বাংলাদেশের জামদানি শাড়িকে ভারতে ফুলিয়ার জামদানি শাড়ি, গোপালগঞ্জের রসগোল্লাকে বাংলার রসগোল্লা এবং টাঙ্গাইলের শাড়িকে টাঙ্গাইল শাড়ি অফ বেঙ্গল নামে জিআই স্বীকৃতির ট্যাগ লাগিয়েছে।

সিপিডির আশঙ্কা বাংলাদেশের আরও কিছু পণ্যের জিআই স্বীকৃতি নিতে পারে ভারত শিগগিরই। অথচ বাংলাদেশ চুপ করে বসে আছে গত ৭ বছর যাবৎ। কিছু পণ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে বটে তবে তা খুব শম্বুক গতিতে। যার ফলে ভারতের সাথে প্রতিযোগিতায় হারছে। জাতিগতভাবে এ হার খুবই লজ্জাজনক। এর জবাব দেবে কি শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট ও ডিজাইন বিভাগ?

চলতি বছরের প্রথম দিকে শোনা গেল, ভারত টাঙ্গাইল শাড়ির স্বীকৃতি নিয়েছে। এ নিয়ে কয়েকদিন হৈ চৈ হলো, প্রতিবাদ হলো প্রেক্ষিতে প্রশাসন নড়ে চড়ে বসলো। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি দল গিয়ে ভারতের এই স্বীকৃতির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কথাও শোনা গেল। তারপরের অগ্রগতি সম্পর্কে জাতি অবহিত নয়। শুধু তাই নয়, এই ঘটনার পর চলতি বছরের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী দেশে বিভিন্ন জেলার পণ্য গুলিকে চিহ্নিত করে জিআই স্বীকৃতির জন্য প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসকদের।

এদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ হাইকোর্ট একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে জিআই পণ্যের তালিকা তৈরি ও রেজিস্ট্রেশন করতে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানাতে রুল জারি করেন। ১৯ মার্চের মধ্যে জিআই পণ্যের তালিকা দাখিল করতে নির্দেশ দেন আদালত। এই রুলের জবাব দেওয়ার জন্য বাণিজ্য সচিব, কৃষি সচিব, সাংস্কৃতিক সচিব সহ সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের সময় বেধে দেওয়া হয়। প্রেক্ষিতে জেলায় জেলায় প্রশাসকেরা তৎপর হয়ে উঠলেন ফেব্রুয়ারি মাসে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কমিটি সাব কমিটি গঠন করা হলো, দায়িত্ব দেওয়া হলো। ইতোমধ্যে চার মাস অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু জেলা প্রশাসকদের পক্ষ থেকে সেই তালিকা পাঠানোর খবর পাওয়া যায়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে এ সংক্রান্ত মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জেলাবাসীর মনোনিত ১৫ টি পণ্য নিয়ে আলোচনা হয়। সেগুলো ছিল আদি চমচম, রসকদম, সূজনি কাঁথা, রেশম সুতা, লাক্ষা, কাঁসাপিতল, কলাইয়ের রুটি, কুমড়োর বড়ি, আটার নাড়ু, গোপালভোগ আম, আমসত্ব, কাগজী লেবু, জিলাপি, ছানা জিলাপি ও দমমিস্রি।

শেষে ৯ টি পণ্যকে চিহ্নিত করা হয় এবং সেই পণ্যগুলির ইতিহাস ঐতিহ্য গুনাবলিসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট করতে বলা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগঠন ও পণ্যগুলি হচ্ছে- কলাই রুটি, কুমড়ো বড়ি, সুজনি কাঁথা সদর উপজেলা প্রশাসন। আদি চমচম ও দম মিস্রি শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। লাক্ষা ও গোপালভোগ আম আঞ্চলিক উদ্যান তত্ব গবেষণা কেন্দ্র। কাগজী লেবু হর্টিকালচার সেন্টার চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং আমসত্ব ও আটার নাড়ু বরেন্দ্র কৃষি উদ্যাগকে। জানা গেছে, ১৯ মার্চের আগেই সংশ্লিষ্ট সংঠনগুলো উল্লিখিত পণ্য সমুহের রিপোর্ট প্রস্তুত করে বসে আছে। কিন্তু কমিটির আহবায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের মিটিং ডাকার সময় হয়ে উঠছে না।

ইতোমধ্যে কয়েকবার তাগিদও দেওয়া হয়েছে সংঠনগুলোর পক্ষ থেকে। দেশের অন্যান্য জেলার অবস্থা জানা না গেলেও বলা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে প্রশাসনের যে তৎপরতা দেখা গিয়েছিল বর্তমানে সে গতি নেই। হাই কোর্টের দেয়া নির্দেশ পালিত হচ্ছে না। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন জেলা থেকে প্রস্তাবিত পণ্যগুলির তালিকার মধ্যে থেকে দু চারটির জিআই স্বীকৃতি ভারত নিবে না তা বলা যায় না। তখন এর জন্য কে দায়ী হবে এটাই প্রশ্ন।
লেখক : সাংবাদিক