ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভুতুড়ে টাওয়ার

আপডেট: এপ্রিল ২৮, ২০১৭, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক



জলঙ্গি, এই ওয়াচ টাওয়ারের সঙ্গে গলায় দড়ি দিয়ে তাকে ঝুলতে দেখেছেন অনেকেই। স্তব্ধ দুপুর কিংবা ঝিঁঝি শব্দের নির্জন রাতে সে গলায় দড়ি দিয়ে এই ওয়াচ টাওয়ারে ঝুলে থাকে। অকস্মাৎ এই দৃশ্যে অনেকেই ভিরমি খেয়ে জ্ঞানও হারিয়েছেন। স্থানীয় গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, এই টাওয়ারে অশরীরী আত্মা বাস করে। তাই রাত তো দূরের কথা, দিনের বেলাতেও এই টাওয়ারের আশপাশ মাড়ায় না কেউই। মুর্শিদাবাদের ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তরেখা বরাবর শুধু মাত্র সীমান্তরক্ষীদের ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়েছে ‘বর্ডার রোড’। সংখ্যায় খুব কম হলেও মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ে এই রাস্তার পাশের ওয়াচ টাওয়ার। নেহাতই সীমান্ত নজরদারি আরও দৃঢ় করার উদ্দেশ্যেই এগুলিকে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু কেবলমাত্র জলঙ্গির একমাত্র এই টাওয়ারটিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জওয়ানরা সাহস করে ওঠেন না। ভূত আছে, ওপরে উঠলেই নির্ঘাত মৃত্যু। তাঁদের কথায়, চোরাকারবারিদের সঙ্গে গুলির লড়াই, আর ভূতের সঙ্গে রাত কাটানোÍ দুটো এক নয়। এত বড় বুকের পাটা তাঁদের নেই।
জলঙ্গির বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠের শেষ প্রান্তে কবরস্থান। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নতুন-পুরনো কবর। এই কবরস্থানের একদম পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ওয়াচ টাওয়ারটি। তার গাঁ ঘেঁষে চলে গেছে পিচকালো আঁকাবাঁকা সরু বর্ডার রোড। রোডের শেষে পদ্মার বালিচর। আর সেখানেই শ্মশান। শ্মশানের পোড়া কাঠ এলোমেলো ভাবে যত্রতত্র ছড়িয়ে। শ্মশানের প্রান্তে পদ্মার শান্ত ঢেউ ছন্দহীনভাবে আছড়ে পড়ে। গা-ছমছমে পরিবেশের মধ্যেই জংধরা টাওয়ারটা একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে। টাওয়ার থেকে কিছুটা দূরে বিশ্বাসপাড়ার বাসিন্দারা একবার নয়, বহুবার দেখেছেন এই টাওয়ারের সঙ্গে কে যেন গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে আছে। পরনে তার সাদা কাপড়। ওই ঝুলন্ত অবস্থায় হাতের ইশারায় কাছে ডাকে সে। স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধ খুরশেদ হাসানের এখনও সে কথা মনে হতেই শিউরে ওঠেন তিনি। চাপা গলায় ফিসফিস করে তিনি বলেন, সেবার বিলে বান এসেছিল। জ্যোৎস্নার আলো পড়ছিল জলের ওপর। প্রকৃতির কী অসাধারণ রূপ। চারদিক জুড়ে শুধু পানি আর পানি। আমরা ক’জন মিলে ডোঙায় করে মাছ ধরছিলাম। কিন্তু কখন যে ওয়াচ টাওয়ারের কাছে চলে এসেছিলাম বুঝতে পারিনি। চাঁদের আলোয় আমি স্পষ্ট দেখেছি, গলায় দড়ি দিয়ে টাওয়ারের সঙ্গে একজন ঝুলছে আর হাতের ইশারায় আমাকে ডাকছে। যেন খুব কষ্ট হচ্ছে তার। তারপর খুরশেদের আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান হারান তিনি। অন্য জেলেরা তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন। ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে অনেকেই দেখেছেন ‘তাকে’, শুধু খুরশেদ একা নন।
এই ভূতের কবলে পড়ে মৃত্যুও হয়েছে। সে অভিজ্ঞতাও বাসিন্দাদের আছে। বছর দশেক আগে ওই টাওয়ার থেকে ডিউটিরত অবস্থার এক সীমান্তরক্ষী পড়ে গিয়ে মারা যান। তার পরে আর কোনও জওয়ান ভূত–টাওয়ারে গিয়ে ডিউটি দিতেন না। পরবর্তীতে আরও এক জওয়ানের মৃতদেহ পাওয়া যায় টাওয়ারের মাথায়। সেই শেষ। তার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনও জওয়ান সাহস করে পা রাখেননি টাওয়ারের সিঁড়িতে। জলঙ্গি বিওপি–র এক জওয়ান জানান, যদিও নিয়মমতো চব্বিশ ঘণ্টাই ওই টাওয়ারে আমাদের থাকা উচিত। কিন্তু কে যাবে? এত সাহস কারও নেই। ওর আশপাশে থাকাও বিপদ।
তা হলে সত্যিই কি ভূত–প্রেতাত্মার রাজত্ব চলে এই ওয়াচ টাওয়ার চত্বর জুড়ে? কিন্তু গত ১০-১২ বছর ধরে সেই প্রেতাত্মা গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলতে ঝুলতে গত কয়েক বছরে কোথাও উধাও হয়ে গেছে। তবে কি স্থান পরিবর্তন করল ‘সে’! জেলা বিজ্ঞান মঞ্চ থেকে জানা গেছে, আসলে টাওয়ারের সোজাসুজিই একমাত্র ভারত-বাংলাদেশের ‘ল্যান্ড বর্ডার’। বাকি এলাকা পদ্মা দিয়ে বিভক্ত। চোরা-পাচারকারীরা ভূতের গল্প ফেঁদে ওই জায়গাটাকে জনমানবশূন্য করতে চেয়েছিল। তাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই কায়দা-কৌশলে টাওয়ারের সঙ্গে দড়িতে ঝুলে থাকত। বর্তমানে চোরা ব্যবসা বন্ধ থাকায় সেই ভূতের পেটেও টান পড়েছে। সেই সব ভূত এখন অন্য কাজে ব্যস্ত। আর যে  দু’জন সীমান্তরক্ষী মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের প্রথমজন মত্ত অবস্থায় টাওয়ার থেকে পড়ে যান। পরবর্তীতে যিনি সাহস করে উঠেছিলেন, তিনি কাকতালীয়ভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু অতশত তদন্ত রিপোর্টের তোয়াক্কা না করেই এই দুই মৃত্যু টাওয়ার জুড়ে ভূতের আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়।- আজকাল

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ