ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ : কীভাবে !

আপডেট: জুলাই ২, ২০১৭, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

মো. বুরহানুল ইসলাম


কোনো সজ্জন ব্যক্তি চায় না ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন যাপন করতে। কারো দ্বারস্থ হয়ে হাত-পাততে। মানুষকে পরিস্থিতি বাধ্য করে, দ্বারে-দ্বারে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরতে। মানুষের জীবন বাঁচার শেষ অবলম্বন ভিক্ষাবৃত্তি। বর্তমানে মানুষের স্বচ্ছলতা এসেছে, দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। সকল মানুষই চায় স্বচ্ছল ও স্বাচ্ছন্দ্য জীবন। ভিক্ষাবৃত্তি অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ। ভিক্ষুকের জীবনও অত্যন্ত কষ্টের, বসবাসের স্থান নেই, ফুটপাত, রেলস্টেশন বা রাস্তার ধারে, সরকারি খাস জমিতে বস্তি গেড়ে কোন রকম বাস করেÑ যার কোন স্থায়িত্ব নেই। কেউ চায় না এই নিকৃষ্টতম পথ বেছে নিতে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়, যা কারো কাম্য নয়। এ সমাজে যার কোনো মূল্যায়ন বা কোনো স্থান নেই; মানুষ নিরুপায় ও পরিস্থিতির শিকার হয়ে বেছে নেয় শেষ অবলম্বন ভিক্ষাবৃত্তির পথ। এক কথায় যারা কোন কাজকর্ম করতে পারে না। তারাই ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নেয়।
১৯৬৯ সালে ইন্ধিরা গান্ধি ভারত থেকে গরীব হঠানো আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন (বাংলাদেশ প্রতিদিন ৩০ এপ্রিল/১৭)। এখন নরেন্দ্র মোদিও চেষ্টায় আছেন। বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই চায় গরীবমুক্ত বাংলাদেশ কিন্তু প্রচলিত নিয়েমে সম্ভব নয়। অন্য কোন রাষ্ট্র না পারলেও বাংলাদেশ সরকার সচেষ্ট হলে শতভাগ যাকাত, আয়কর আদায়ের মাধ্যমে দেশ থেকে অতি অল্প সময়ে গরীবমুক্ত করা সম্ভব। পৃথিবীর বিবেকবান জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ মাত্রই চায় স্বচ্ছলতা। সহায় সম্বলহীন, অস্বচ্ছলতা ও দরিদ্র্যতায় নিমজ্জিত সংসার মানুষ চায় না। অতি মানব, ধর্মকর্মে মশগুল, দুনিয়াদারির চিন্তা করে না ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ বাদে শতকরা ৯৯ জনই স্বচ্ছল জীবন যাপন চায়। অতিদীনহীন একেবারেই নিরেট গরীব বাঁধের ধার, রেলের খাস জমি ব্যতিত বসবাসের স্থান নেই। রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে, ফুটপাতে রাত কাটায় সমাজে যাদের স্থান নেই, অবজ্ঞা অবহেলার পাত্র। সহায় সম্বলহীন গরীব, প্রতিবন্ধী হলে চলার পথে দুঃখ-কষ্ট, দূর্দশাময় জীবন। সমাজে যাদের স্থান একেবারেই তলানিতে। একজন গরীব দুঃস্থ প্রতিবন্ধী, সহায় সম্বলহীন ব্যক্তির চিকিৎসা, বাসস্থান, খাদ্য ও বস্ত্রের কোন সংস্থান নেই। খাদ্যের অভাবে একবেলা আধাবেলা খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। দেখার কেউ নেই যা একেবারেই অমানবিক। এরাও এদেশেরই মানুষ, এদের নিয়ে ভাবা দরকার।
অক্ষম ন্যাংড়া, খোড়া, অশীতিপর বৃদ্ধবৃদ্ধা, পঙ্গুঁ একেবারেই নিঃস্ব, রোগ শোকে জর্জরিত যাদের দেখার কেউ নেই, তাদের জন্যই এ ব্যবস্থা।
ইসলামে জাকাত, ফেতরা ও ওশর এর বিধান রয়েছে। সঠিকভাবে আদায় ও বণ্টন হলে দেশে ভিক্ষুক ও গরীব বলতে কেউ থাকবে না। কাউকে কারও দারস্থ বা পর নির্ভরশীল হতে হবে না। বাংলাদেশে শিক্ষা, কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। এক কথায় মানুষের আয়ের পথ প্রশস্ত হয়েছে। মানুষ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রয়োজনে দেশে বিদেশে, চাকরি ব্যবসার মাধ্যমে আয় রোজগার করে স্বাবলম্বি হচ্ছে।
রেলগাড়ির প্রতিটি কামরায় এবং স্টেশনে কোম্পানির পণ্যের বিজ্ঞাপনের পোস্টার দিয়ে সরকারের আয়ের পথ বৃদ্ধি করলে এবং বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ বন্ধ করতে পারলে রেলের ভাড়া বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে না। জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুতের মূল্য কোনোক্রমেই বৃদ্ধি করা সঠিক হবে না। জনগণ সরকারকে সঠিকভাবে ট্যাক্স এবং ভ্যাট দিলে জনগণকে বিড়ম্বনায় ফেলার প্রয়োজন হবে না। সরকারের আয় বৃদ্ধির জন্য বাস র্টামিনালে, জনবহুল রাস্তার মোড়ে বাসের গায়ে পণ্যের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারের আয় বৃদ্ধি করা যায়।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী; দেশের সকল ধর্মের মানুষই ধর্মভিরু। বাংলাদেশের মানুষ জাকাত, ফেতরা, ওশর দিয়ে অভ্যস্থ। শুধু সুষ্ঠুভাবে আদায়, তদারকি ও সুষ্ঠু বণ্টনের ব্যবস্থা করা। জাকাত উন্নয়ন বোর্ড গঠনের মাধ্যমে আইন করে শিগগিরই বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়োজন। দেশ জাতির স্বার্থে যতদ্রুত বাস্তবায়ন হবে ততই মঙ্গল। সাধারণ জনগণের সুখ-শান্তি দেশের সকল সরকার প্রধানেরই কাম্য। দেশের মানুষের সুখ শান্তি থাকলে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এর মত অপরাধ প্রবণতা কমে যাবে।
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নবীর শিক্ষা ‘কর না ভিক্ষা, মেহনত কর সবে’। হযরত মুহাম্মদ (সা.) ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করেছেন এবং কর্ম করে খেতে বলেছেন। অন্ধ, খোড়া, বৃদ্ধ, এতিম, অসহায়, পাগল, সহায় সম্বলহীন বিধবা এদের বাঁচার উপায় কী? এদেরও তো বাঁচার অধিকার রয়েছে। এদের মেরে ফেলা যায় না। এসব অসহায়দের জন্যই ইসলামে সুন্দর বিধান ও সুব্যবস্থা আছে। আর্তপীড়িতদের পাশে দাঁড়ানো এবং সাহায্য করা সকল ধর্মেরই মূল কথা। মানুষ হিসেবে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে হবে। তবেই মানবতার কল্যাণ হবে।
এলাকার দু‘চার জন ব্যক্তির সমস্যার অস্থায়ী সমাধান ব্যক্তিগত উদ্যেগে সম্ভব। জাতীয় পর্যায়ের সমস্যার সমাধান একমাত্র সরকারের মাধ্যমেই সম্ভব। ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে- শতভাগ জাকাত, ফেতরা, ওশর ও আয়কর আদায়ের মাধ্যমেই ৫ বছরের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশকে বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব।
জাকাত আদায়ের জন্য সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন ব্যয় হবে না। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়ের অধীনে জাকাত উন্নয়ন বোর্ড এর শাখা থাকবে। মহল্লার মসজিদের ইমাম সাহেবগণ শতকরা ১০ ভাগ কমিশনের ভিত্তিতে জাকাত, ফেতরা, ওশর আদায় করে কমিশনের টাকা কর্তন করে সরকারি খাতে জমা দিবে। প্রতিটি মহল্লার মসজিদের ইমাম এবং মোয়াজ্জিন কমিশনের ভিত্তিতে এর গুরু দায়িত্ব পালন করবেন। উপজেলা ও ইউনিয়ন এর টাকা একত্রীকরণ করে উপজেলা কমিটি এলাকার দুস্থ অসহায়, এতিম, অন্ধ, পঙ্গু বিধবাদের মধ্যে প্রয়োজন ও নিয়ম মোতাবেক বিলি বণ্টনের ব্যবস্থা থাকবে।
মুসলিমদের জন্য জাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক; অনুরূপভাবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য হতে হবে আয়কর বাধ্যতামূলক। সঠিকভাবে জাকাত প্রদানকারীদের নিকট হতে আয়কর নেয়া যাবে না। জাকাত প্রদানের স্বপক্ষে ইউপি চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নের ভিত্তিতে আয়কর মওকুফ হবে। এ পদ্ধতিতে সরকারের শতভাগ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। কারণ জাকাত প্রদানকারীর সংখ্যা আয়কর প্রদানকারীর চেয়ে কয়েক শতগুন বৃদ্ধি পাবে। বছরে দেড় লক্ষ বা দু‘লাখ টাকার কম আয় হলে আয়কর দেয়ার প্রয়োজন নেই। সংসারে খরচ নির্বাহের পর যে টাকা থাকবে তার ভিত্তিতে শতকরা আড়াই টাকা হারে জাকাত প্রদান করতে হবে। অনুরূপভাবে সোনা, চাঁদি, জমির ফসল, গবাদি পশু, গরু, ছাগল, ভেড়া মহিষ এর ও জাকাত দিতে হবে। সেহেতু এ নিয়মে সরকারের কয়েক গুন রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। রাজস্ব আয় বেশি সরকারের আদায়ে ব্যয় নেই। মহল্লার ইমাম, মোয়াজ্জিনের মাধ্যমে আদায়ের ব্যবস্থা করলে ইমাম, মোয়াজ্জিনগনও উপকৃত হবেন। আবার গরীব, ভিক্ষুকমুক্ত দেশ গঠনে সহায়ক হবে। দেশে ৫০ লাখ ভিক্ষুক থাকলে মহল্লা/ওয়ার্ড ভিত্তিক সংখ্যা খুব একটা বেশি হবে না। ফলে সমস্যার সমাধান বা পুনর্বাসন করা অতি অল্প সময়ে সহজ হবে, সরকারকে বেগ পেতে হবে না।
স্থানীয় মেম্বার, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যানগণ জাকাত প্রদানকারীর তালিকা প্রস্তুত করে তালিকার কপি উপজেলা নির্বাহী অফিস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দিবেন। এবং তালিকার একটি কপি স্থানীয় মহল্লার ইমাম সাহেবকে দিবেন। ইমাম সাহেব, নাম রেজিস্ট্রারভুক্ত করে, মোয়াজ্জিনের মাধ্যমে জাকাত আদায়ের ব্যবস্থা করবেন। তাহলে তালিকা শতভাগ সঠিক হবে এবং আদায়ের ক্ষেত্রে কেউ বাদের সম্ভাবনা থাকবে না। আদায়ের কমিশন ১০ ভাগ (ইমাম ৭+ মোয়াজ্জিন ৩) কমিশনে টাকা আদায় করবেন। আদায়কৃত টাকা নিয়ম অনুযায়ী গরীব, দুঃখী, অসহায়, দুস্থ এতিমদের মাঝে সুষ্ঠু বণ্টনের ব্যবস্থা থাকবে। ইউনিয়নের কমিটি এবং উপজেলা কমিটির সমন্বয়ে বিতরণের ব্যবস্থা থাকবে। কোনো ব্যক্তি জাকাত দিতে অনীহা প্রকাশ করলে, সরকারীভাবে আদায়ের পদক্ষেপ এবং শাস্তির বিধান থাকবে। তাহলে ত্রুটি বিচ্যুতির সম্ভাবনা কম হবে।
মানুষ চাহিদা মোতাবেক আর্থিক সহায়তা পেলে, অন্য কারো করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকার প্রয়োজন হবে না। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা করার প্রয়োজন হবে না। কেউ কারো গলগ্রহ হয়ে থাকারও প্রয়োজন হবে না। এছাড়া গরীবদের জন্য স্বল্পমূল্যে রেশনের ব্যবস্থা থাকলে ভাল হয়। রেশন ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকলে সকলেই ধীরে ধীরে সাবলম্বী হবে। শতভাগ জাকাত ও আয়কর আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারলে দেশ শিগগিরই উত্তম আয়ের দেশে পরিণত হবে, যা কল্পনাতীত। দেশ স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য অন্য কোন রাষ্ট্র বা সংস্থার কাছে নতজানু হয়ে হাত পাতার প্রয়োজন হবে না। দ্রুত উন্নত রাষ্ট্রের তালিকায় বিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করবে। শিগগিরই দারিদ্র বিমোচন ও ভিক্ষুকমুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ রোল মডেলে পরিণত হবে। এভাবে মানুষের জীবনের মান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচনে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ব্যপকভাবে বাড়ানো সম্ভব।
লেখক: হোমিও চিকিৎসক