ভিক্ষুক সমাচার

আপডেট: জানুয়ারি ২৪, ২০২০, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

আইয়ুব আলী


অনেক দিন পর গ্রামের বাড়িতে এসেছি। দিনটি শুক্রবার। বাড়ির সদর দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আল্লাহ রসূলের কালাম পড়ে বাড়িতে কেউ আছে নাকি? বলে বাতাসে প্রশ্ন ছুড়ে দিল। কণ্ঠস্বরটা খুব পরিচিত মনে হল। যাকে মনে করেছিলাম দরজা খুলে বাহিরে এসে দেখি সেই ব্যক্তি। তার বয়স বেড়ে ভার হয়ে নুইয়ে পড়েছে। পাঁচ কেজি ওজন বহন করার ক্ষমতা তার নেই। হাঁটার গতি কমে কচ্ছপের মত হয়েছে। গায়ে জির্ণ একটা পাঞ্জাবি। তার হাতের লাঠিটা মুঠার কাছে তেলতেলে হয়েছে। তাকে একা দেখে আমার মনটা আপনহারা বেদনার মত মোচড় দিয়ে উঠল। তাকে জিজ্ঞেস করতে দ্বিধা হল। তার সঙ্গের জন কোথায়? যদি মনে কষ্ট পায়! বেদনায় তার বুকটা সারাদিন হাহাকার করে বসে। তাকে দেখে আমার নিজের মনে যে পরিমান দয়া দেখা দিল সে পরিমান তাকে দেয়ার সামর্থ আমার নেই। তার পরেও এক মুষ্ঠি চাউলের পরিবর্তে ১০ টাকা তাকে দিলাম। তার ঘাড় উচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে প্রাণ খোলা তৃপ্তিকর হাসি দিল। দেখে মনটা ভরে গেল। লাঠিতে ভর করে ঠুকঠুক করে সামনের বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আমি বাড়ির ভিতরে গেলাম। মাকে জিজ্ঞেস করলাম। মা বাহিরে যে ফকির ভিক্ষা করতে এসেছে তার সাথে একটা বুড়ি মহিলা আসতো। আজ সে মহিলাকে দেখছি না যে। মা বলল, সে মারা গেছে।তারা দ্’ুজন সম্পর্কে ফুফু ভাতিজা হত। তার ফুফু মারা যাওয়ার পর সে একাই আসে। এর যা আবস্থা ক’দিন পর মারা যাবে। তাদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ হল। পরে জানতে পারলাম তাদের আপনজন কেউ ছিল না। কোন জমিজমাও নেই। সারাদিন বাড়ি বাড়ি বেড়িয়ে যতটুকু চাল পেত তা দিয়ে কোন মতে জীবনের সময় খুব কষ্ট করে পার করতো। তাদের কোন কর্ম করার সামর্থ্য ছিল না। শুধু জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিয়েছে। তারা সারা জীবন ভিক্ষা করে কোন সঞ্চয় করতে পারেননি। তাই এখনো অথর্ব শরীর নিয়ে গ্রামে গ্রামে দারে দারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জীবনটাকে মৃত্যুর কাছে নিয়ে যাওয়ার আশায়।
সেদিন হঠাৎ আমার খুব মনে পড়লো হরোদের দ্ভুাইয়ের কথা। ‘হরো’ শব্দটা আপনাদের কাছে অভিধানের বহির্ভুত হতে পারে। কিন্তু আমাদের এলাকায় বিশেষ করে নওগাঁর মান্দা থানার ১১ নম্বর ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় বেশ পরিচিত শব্দ। আমাদের এলাকায় যারা অস্বাভাবিক লম্বা এবং বুদ্ধি কম তাদের ‘হড়া’ ‘হরো’বলে ডাকে। হরো বললে আমজাদ আর আয়নাল দ্’ুভাইকে বুঝায়। বয়সে আমজাদ বড় আয়নাল ছোট। লম্বায় আয়নাল সাত ফিটের মত উচ্চতা। তার হাত বাহু বেশ মোটা আর বড়। তার গলার আওয়াজ মাইকের মত ভরাট। বিশেষ করে পায়ের পাতা অস্বাভাবিক বড়। তার পায়ের মাপে বাজারে কোন স্যান্ডেল পাওয়া যায়নি। তার উচ্চতার সাথে তাল মিলিয়ে গায়ে বল পেত খুব। এলাকায় যত বিয়ে হত তার খবর তারা নিত। উদর ভরে ভাত খাওয়ার আশায়। খারাবের স্বাদের খবর তাদের জিহ্বা কাছে জিজ্ঞেস করতো না। তাদের ক্ষুধার জ্বালা মিটা নিয়ে কথা। এই জ্বালা মিটাতে তারা তাদের শরীর কাজে লাগাতো। প্রায় বিয়ে বাড়ির রান্নার যত খড়ি লাগতো আস্ত গাছ তারা ফালা ফালা করে দিত। এই শ্রমের বিনিময়ে খাবার বসেও অনেক তাদের খেতে বাধা দিত। বিছানো কলার পাতা রেখে চলে আসতে হত অথবা শেষের দিকে সামান্য খাবার তাদের দিত। তারা তা খেত, বাদপ্রতিবাদ করতো না। এ অঞ্চলের লোকের ভাতের অভাবের চেয়ে স্বভাবেন অভাব ছিল বেশি। হরোরা বাড়ি থেকে মনে হয় না খেয়েই বেরিয়ে পড়তো। হেঁটে হেঁটে দূরের কোন গ্রামে ভিক্ষা চাওয়া শুরু করতো। তাদের খিদে পেলে কোন বাড়িতে ভাত চায়তো। তারা যে পরিমাণ খায় সে পরিমান খাবার দিতে কোন গারস্ত রাজি হত না। কেউ
খাবার দিলে তারা দেখতো তাদের একজনের হবে না। তখন বড় ভাই তার ছোট ভাই আয়নালকে দিয়ে তার খাওয়া আপন মনে চেয়ে দেখতো। কোন বড় বাড়ির সামনে খড়ের বড় পালা দেখলে আশা নিয়ে বলতো ভাত হবে? বেশিরভাগ গেরস্ত একটা কুড়াল বাহির করে দিত। তারা বুঝতো খড়ি চলা করতে হবে। কোন বাক্য ব্যয় না করে মনের হাউসে খড়ি চলাই করতো। এসময় তাদের শরীর দিয়ে ঘাম ঝরে ভিজে যেত। হাতে ফুসকা পড়ে। আমাদের বাড়ির উঠানে আমার কাকাকে তাদের হাত দেখিয়ে মনে কষ্ট নিয়ে বলতো মেলা খড়ি চিরা দিছি কিন্তু পেট ভরে খাবার দেয় নি। শুধু খাবারের জন্য তারা হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াত। তাদের কাঁধে ব্যাগ আর গলায় গের দিয়ে লুঙ্গি পিঠে ছড়ানো। দুপুর হলে তারা কোন পুকুরে গোসল দেয়। গায়ে দেয়া লুঙ্গিটা পরনে জড়ায়। ভিজা লুঙ্গিটা আচ্ছামত চিপে পানি ঝরিয়ে শূন্যর দুটা বাড়ি দিয়ে গায়ে জড়ায়। কোন বাড়ির সামনে দেখা যায় তাদের মুখে কোন কিছুর ঘোষণা। মুখের সামনে হাত দু’টো মাইকের মত করে মেলে ধরে বলে চলেছে, .. বারে – হুলিবাড়ি স্কুল মাঠে বিরাট বদন খেলা অথবা চকগোরি হাটে গরুর লড়াই। তাদের দেখে অনেকের মনে দয়া হয়। আর সে দয়ায় তাদের পেটে ভাত পৌছে দেয় সৃষ্টিকর্তা। এভাবেই তাদের দিন চলে যায়। এদের দেখে ছোট বেলায় আমার মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলাম মা তারা কি পাগল? মা বলেছিল তাদের পাগল বানানো হয়েছে। কেমনে? মা বলল, তারা খুব
পরিশ্রমী। একদিন এক বিশাল বড় গাছ কাটতে লেগে তার গোড়ায় নাকি তারা গুপ্তধন পায়। সে গুপ্তধন তাদের কাছ থেকে ফাঁকি দিয়ে নিয়ে নেয়া হয়েছে। সে থেকে তারা এ্যবনরমাল। মা বলল, যার পেটে ক্ষুধা লাগে সে বুঝে ক্ষুধার জ্বালা-যন্ত্রণা। আর যারা এই ক্ষুধার জ্বালা বুঝে তারা তো হরোদের খেতে দিতে পারে না। আমাদের পাশের গ্রামের একটা পাড়া আছে সে পাড়াকে সবাই ফকির পাড়া হিসেবে চিনে। সে পাড়ার এক আধপাগলা ফকির আশপাশের গ্রামে ভিক্ষা করতো। সময় ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মজার মজার কথা বলতো। সে বলতো আমাকে যে পাগল ভাবে সেই হল বড় পাগল। আমি হলাম সাদ্দাম হোসেন বাকিরা সবাই বুশ। তার এ ধরনের কথা শুনে সাবই হতভম্ব। তার কথা হল তাকে অন্য ফকিরের মত সামান্য দু’মুষ্টি চাল দিলে হবে না। কাঠা ভরে দিতে হবে। তার বক্তব্য তার পাড়ার অন্যরা বহুদূরে গিয়ে বাড়ি পুড়ে গেছে, নদীতে বাড়ি চলে গেছে মিথ্যা বলে যেভাবে চায় সে সেভাবে চায়তে পারবে না। আবার এলাকার ফকির বলে ভিক পাবে না তা হবে না। তার কথার সত্যতা পেয়েছিলাম দূরের এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকার সময়। পোড়া পাটের লাছি কাঁধের ওপর নিয়ে পরিচিত একজন তার বাড়ি পুড়ে গেছে বলে ভিক্ষা নয় সাহায্য চায়তে এসেছে। সেই ফকির পাড়ায় তার বাড়ি। তার মত অনেকে বেশ ধরে ভিক্ষার নামে ব্যবসা করে। ছোট্ট বেলা কোন কিছু বড়দের কাছে চাইলে তারা না দিয়ে অপমান করার জন্য বলতো ফকিরের মত চাস ক্যান! তখন লজ্জায় মাথা কাটা পড়তো। বর্তমানে দেখি সেই লজ্জা বিক্রি করে মানুষ দারে দারে ভিক্ষা করে। আপনাদের ভাবিকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশনে নামলাম। এক মাঝ বয়সি মহিলা তার আচল টেনে ধরে বলছে। মা, মা একটা পান খামু মা। টাকা দ্যাও মা। দু টাকা বের করে দিল। বুড়ি শক্ত ভাবে বলল, দু টাকায় পান হয় নাকি! পাঁচ টাকা লাগে। থতমত হয়ে দু টাকা ফেরত চায়তে গদগদ করে অভিশাপের মত কি যেন বলে চলে গেল। আমি বললাম বেটিকে টাকা দিতে গেলে কেন! সে আমাকে হাদিস টেনে শুনালেন, তোমার কাছে যদি তোমার এলাকার সবচেয়ে ধনীব্যক্তি ভিক্ষা চায় তাহলে সামর্থ অনুযায়ী তা দিতে হবে। আমিও তাকে হাদিস টেনে শুনিয়ে দিলাম। কোন প্রকার সম্পত্তি থাকা অবস্থায় ভিক্ষা করা হারাম। ওই বেটির কাজ করে খাওয়ার সামর্থ আছে তাকে ভিক্ষা দিতে হবে কেন! সে কি ভিক্ষা চায়চে? সে একটা পান খেতে চেয়েছে। চকুরির সুবাদে থাকি জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে। একদিন আমি এক দোকানে বসে আছি। দোকানের সামনে খুব অসুস্থ্য ব্যক্তি করুণ সুরে বলছে তার চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। তাকে দেখে খুব দয়া হল। তার বাম হাতে ক্যাথেডারের ব্যাগ ধরে আছে। হালকা হলুদ রঙের মূত্রে ব্যাগের অর্ধেক ভরা। কথা বলছে মিনমিন করে। তাকে ১০ টাকা দেয়ার পর দোকানদার কড়া মেজাজে আমাকে বলল তাকে টাকা দিলেন ক্যান! তার সম্পর্কে আপনি
জানেন? আপনার মত আমার মনে কি দয়া নাই? আমি তাকে টাকা দিতাম না! কিন্তু তাকে দেখলে এখন আমার পিত্তি জ্বালা করে। কেন?
তাহলে শুনুন। ময়মনসিংহ থেকে যমুনা ট্রেনে আসছি। জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে দেখি এই ব্যাটা। তার কোন রোগ নাই। ট্রেনের মধ্যে তার পরিচিত কে যেন ছিল। হাসতে হাসতে দৌড়ে গিয়ে ট্রেনে চড়ল। তার পরের দিনই এই বেশে ঢং ধরে চিকিৎসার নামে টাকা চায়। দেশের মধ্যে রাজশাহীত শহরকে বহু নামে ডাকা হয়। সত্যিই রাজশাহী শহরের সাথে দেশের অন্য শহরের তুলনা হয় না। আমার পকেটে এই শহর থেকেই এক টাকার কয়েন পকেটে উঠেছিল। স্টেশন থেকে সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে যাওয়ার পর অটোআলা সাত টাকা ভাড়া রেখে তিন টাকা ফেরত দিয়েছিল। জামালপুরে এসে এক আন্ধভিক্ষুককে পকেট থেকে বের করে একটা কয়েন দিলাম। সেটা পাওয়ার পর ভিক্ষুকেরর কি রাগ! তাকে অন্ধ বলে
নাকি এক টাকার কয়েন দিয়ে অপমান করছি। সে ধমক দিয়ে বলল, এক টাকার কয়েন চলে না। আপনে দিবেন না, দিয়েন না। আমাকে তা ফেরত নিতে হয়েছিল। বিয়ের মাস দুই পর জামালপুর থেকে শ্বশুর বাড়ি গেছি। আমাদের দু’জনকে দেখে ভাবিরা মশকরা করে বলছে জামালপুরের ফকির এসেছে। সত্যিই জামালপুর জেলা প্রশাসক সারা জেলা প্রচার করে পোস্টার লাগিয়েছে। ভিক্ষুকের লাগাম টেনে ধার জন্য। এজন্য এনজিও’র মাধ্যমে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। স্থানীয় এক এনজিও’র কর্মসূচিতে খুব ভোরে জামাল ভাই আমাকে ধরে নিয়ে গেল। সেখানে যাওয়ার পর দেখা গেল দুই খাছি মুরগি নিয়ে দু’জন বসে আছেন। জামাল ভাইয়ের কাজ সেসব মুরগিকে ভ্যাকসিন দেয়া। আমাদের কাজ শেষ না হতেই একজন দ্’ুজন করে লোক আশা শুরু হল। তাদের দেখে কাউকে ভিক্ষুক মনে হল না। সবাইকে তিনটি করে মুরগি দেখানো হল। এই তিনটি মুরগি পেয়েই তারা স্বাবলম্বী হয়ে যাবে! এমন ধারণা এনজিও’র। এসময় একটু দেরি
হচ্ছে দেখে বেশ কয়েকজন তাড়াহুড়ো শুরু করে দিল। তাদের কালেকশনে (ভিক্ষা করতে) যেতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন বললেন, তিনটি মুরগি দিবে জানলে আসতামই না। একদিন কালেকশন করলে এরকম পাঁচ সাতটা মুরগি কেনা যাবে। অযথা সময় নষ্ট করা। মুরগি পাললে এখন তিনটি মুরগির খাবারও কালেকশন করতে হবে। সব ঝামেলা। একদিন সরিষাবাড়ীর ঝালুপাড়া মোড়ে সোহাগ ভাইয়ের দোকানে বসে আছি। একজন লোক দোকানের সামনে এলো। তার হাতে একটা লাঠি। তার গায়ে যা শক্তি আছে সে লাঠি দিয়ে দু’চার দশ জনকে পিটিয়ে জখম করার ক্ষমতা রাখে। সোহাগ ভাই তাকে জিজ্ঞেস করলো তার নানা শ্বশুরের চল্লিশার দিনে যায়নি কেন। সে লোক সহসা জবাব দিল দাওয়াত খেয়ে লাভ কি? বড় জোর যাওয়া আশার ভাড়া আর দুপুরে খাবারের পর পাঁচ’শ টাকা দিত। তার চেয়ে সেদিন কামাই বেশি হয়। বুঝতে না পেরে সোহাগ ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম ব্যাপার কি? সোহাগ ভাই বলল, ব্যাপার কিছু না। আমার নানা শ্বশুর মারা গেছে। চল্লিশ দিন পর নাকি ফকির খাওয়াতে হয়। তাই ফকির খোঁজে দাওয়াত দিয়েছিলাম। কোন ফকির মরার বাড়ি শুধু দাওয়াত খেতে আসবে না। পরে হাটের দিনে আরামনগর বাজারে তাদের সদ্দারকে খুঁজে বের করে দাওয়াত দেয়া হল। তখন শর্ত দিল তাদের মধ্যে যারা যেতে রাজি হবে তাদের সকলকে পাঁচ’শ করে টাকা দিতে হবে। আসা যাওয়ার ভ্যান ভাড়া দিতে হবে।