ভুটানের উন্নয়ন মডেল

আপডেট: মার্চ ১৫, ২০১৭, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


হিমালয় রাষ্ট্র ভুটান যেসব সূচকে ‘মোট জাতীয় সুখ’ হিসাব করে উন্নয়ন পরিমাপের ধারণা সামনে এনেছে, সেগুলো ব্যবহার করে বিমসটেক দেশগুলোর মানুষের মনোযোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলেছেন দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সাত দেশের এই জোটের মহাসচিব।
ভুটানের রাষ্ট্রীয় দর্শন হল- উৎপাদন বৃদ্ধি উন্নয়নের প্রধান পরিমাপক নয়। সেই উৎপাদন জনগণকে কতোটা সুখি করতে পারছে- সেটাই হওয়া উচিৎ উন্নয়নের মূল কথা।
এর ভিত্তিতেই ভুটান ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ (জিএনএইচ) নামের একটি সূচকের প্রবর্তন করেছে, যেখানে উন্নয়নের সঙ্গে মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
ভুটানের এই ধারণা কী করে বিমসটেক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে তা বুঝতে মঙ্গলবার ঢাকায় একটি গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয়।
কেন ও কীভাবে ‘মোট জাতীয় সুখ’ হিসাব করা হয়- বৈঠকে তা ব্যাখ্যা করেন ‘সেন্টার ফর ভুটান স্টাডিজ অ্যান্ড গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস রিসার্চ’ এর গবেষক ড. দর্জি পেনজোর। জোটের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও এ আলোচনায় অংশ নেন।
পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভুটানের সূচক থেকে কোন কোন ধারণা গ্রহণ করা যায়, তা ভেবে দেখার কথা বলেন বিমসটেক মহাসচিব সুমিত নাকানডালা।
তিনি বলেন, “এই ধারণা আমাদের অচেনা নয়। আমরা প্রায়ই যোগাযোগের কথা বলি। আর এই যোগাযোগ সব সময় ভৌত যোগাযোগ নয়। জিএনএইচের মত মানবিক ধারণাগুলোও আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে খুব ভালোভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
“এর মধ্য দিয়ে আমরা যোগাযোগের ধারণাকে এগিয়ে নেয়ার কথাই বলছি; বাড়িয়ে চলেছি বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোর মানুষে মানুষে মনোযোগাযোগ।”
১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করা বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন- বিমসটেক যুক্ত করেছে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সাত দেশ থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভুটান, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাকে। উন্নয়নের ১৪টি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে যৌথভাবে লক্ষ্যপূরণের কথা বলে আসছেন এই জোটের নেতারা।
জিএনএইচ কী?
জনগণ কতটা সুখী- তার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিমাপের ধারণা ভুটানে একেবারে নতুন নয়। শাসন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের পথে নবযাত্রার সময় থেকেই জিএনএইচ এর ধারণা তাদের রাষ্ট্রীয় দর্শনে যুক্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে এই ধারণা বিশ্বে এতোটাই আলোচিত হয়েছে যে জাতিসংঘও জিএনএইচ নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। ২০১৩ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ২০ মার্চ উদযাপন করা হচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল হ্যাপিনেস ডে’ হিসেবে।
ড. দর্জি পেনজোর গোলটেবিল আলোচনায় বলেন, “দুধের সঙ্গে মাখনের যে সম্পর্ক, ঠিক সেভাবে জিএনএইচ আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে শক্তি যোগাচ্ছে। যখনই কোনো বিদেশি অতিথি ভুটানে আসেন, তাকে এ বিষয়ে অবহিত করি আমরা।”
এই গবেষক মনে করেন, জিএনএইচ এর ধারণা বিশ্বে ভুটানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। ভুটানের চেষ্টাতেই জাতিসংঘ এ বিষয়ে প্রস্তাব পাস করেছে।
“প্রতিটি মানুষের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে সুখী হওয়া- এই বিশ্বাসকে ভিত্তি ধরেই গড়ে উঠেছে জিএনএইচ এর ধারণা। আর এখানে রাষ্ট্রের কাজ হল এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে দেয়া, যাতে নাগরিকরা ভালোভাবে জীবন কাটাতে পারেন।”
ড. পেনজোর বলেন, তাদের এই উন্নয়ন দর্শনে সরকারি নীতি কাঠামোর মাধ্যমে সামষ্টিকভাবে সুখি হওয়ার লক্ষ্যপূরণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে মানুষের ভালো থাকার বিষয়টি সেখানে সকল উন্নয়ন প্রকল্প ও কর্মসূচির অন্যতম শর্ত।
জিএনএইচ পরিমাপের জন্য ২০১৫ সালে ভুটান দ্বিতীয়বারের মত যে জরিপ চালায়, সেখানে অংশ নিয়েছিল আট হাজার মানুষ। ৩৩টি সূচক বুঝতে তাদের প্রত্যেককে দেড় হাজার প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে।
“সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রত্যেকের লেগেছে তিন ঘণ্টা করে। এজন্য তাদের টাকাও দেয়া হয়েছে, কারণ কাজ বাদ দিয়ে ওই সময়টা তারা দিয়েছে।”
দর্জি পেনজোর বলেন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনার জন্য ওই পরিকল্পনা গরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ভিত্তিতে শিগগিরই বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেবে ভূটান সরকার।
দুই জরিপের মধ্যে পার্থক্যগুলো পর্যবেক্ষণ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দেখা গেছে, ভুটানের নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি অসুখি। তবে দ্বিতীয় জরিপে পার্থক্য কিছুটা কমে এসেছে।- বিডিনিউজ