ভুলের সংস্কৃতি, খেসারত দেবে কে?

আপডেট: জুন ৮, ২০২০, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


‘ভূল’ নাকি ভুল। ভুল থেকেই ‘ভূল’। তা না হলে একটু ভুলের জন্য একেবারে স্বর্গ থেকে মর্তে পতন। শুরুটাই ভুল দিয়ে। শেষটাও হয়তো ভুল দিয়েই হবে। মানুষ ভুল করতে পছন্দ করতে পারে না। কেননা ভুল করার কারণে অনেকে বিব্রতবোধ করেন, হতাশ হয়ে পড়েন, হীনমন্যতায় ভুগেন। একটা সুন্দর লেখাকে ম্লান করে দিতে একটি ভুল বানানই যথেষ্ট। অনেকে বলেন ভুলকে ভুল বলা ভুল। কারণ মানুষ ভুল করলেই সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন, সমৃদ্ধ হন, সঠিক পথে চলেন। তাই ভুলই হচ্ছে সঠিক পথের সোপান। এ জন্য ভুলকে ভুল মনে করাটা মস্তবড় ভুল। ভুলতো মানুষ মাত্রই হয়। তবে সেই ভুল শুধরে নিয়ে জীবনটাকে নতুন করে সাজিয়ে নেওয়া মানুষের উচিত। লেখাপড়া শেখাতো ভুল শুধরানোর জন্যই।
ভুলকে কেন্দ্র করে কবি, লেখক, সাহিত্যিক, দার্শনিকদের অনেক কথা গান গল্প আবেগ ছড়িয়ে রয়েছে। যা বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যা লিখে শেষ করা যাবে না। তাই সেগুলোর দু/চার পংক্তি তুলে ধরছি। ভুল আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথী এবং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ থেকে মুক্ত আমরা কেউ নই। একটি ভুলকে সঠিক প্রমাণ করতে হাজারটা মিথ্যা বলতে হয়। কিন্তু ভুল থেকেই যায়। ভুল পথে গেলে জীবনটাও শেষ হয়ে যেতে পারে। একটি ভুল হাজারটা ভুলের জন্ম দেয়। একটা ভুল খবর গোটা জাতিকে বিভ্রান্ত করতে পারে। ভুল কথা ছুঁড়ে দিলে তা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না এবং তার প্রতিক্রিয়া হয় নেতিবাচক। ভুল করে ভালোবাসলে পস্তাতে হয়। জীবনে ব্যর্থ লোকেরা বলে, ভুলে ভুলেই জীবনটা চলে গেল, কিছু করতে পারলাম না। সবাই বলে ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আবারো সেই ভুলই করে। অনেক ভুল আপাত দৃষ্টিতে ভুল মনে হলেও কালের প্রবাহে সেটা শেষ অবধি ঠিক বলে প্রমাণিত হয়। বড় বড় ক্ষমতাধর ও রাজনীতিবিদরা যখন ক্ষমতা হারান তখন বলেন উমুক উমুক কাজ ও সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। অন্যের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। সেরকম মানুষ হওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখুন। কিছু কিছু প্রশ্ন থাকে তার উত্তর কখনো মিলে না, কিছু কিছু ভুল থাকে যা শুধরানো যায় না, কিছু কিছু কষ্ট থাকে যা কাউকে বলা যায় না। ভুল নিয়ে অনেক গান আছে।
ভুল সবই ভুল, এ জীবনের পাতা পাতায় যা লেখা ভুল সবই ভুল
ভুল করেছি, কুল হারিয়েছি, এ ভুল করো না, এ ফুল ছিড়ো না, তিলে তিলে গড়ে উঠুক উদ্যান
ভালোবেসে ভুল করিনি, ভুল করে ভালোবাসিনি
ভুল না হয় আমারই ছিলো, করনি ক্ষমা, করেছো দোষী
ভুলে আর ভুল বোঝ না, ভুলে যায় চলো ভুল ছিলো যা,
ভুলে ভুলে গড়া কতো সুখে দুখে ভুলেছি যে শত কাজ
প্রতি দীর্ঘশ^াসে ভাসে যেন একটি কথা, বড় ভুল করেছিলাম তোমায় ভালোবেসে
ভুলে জন্ম ভুলে মৃত্যু ভুলেই বসবাস ভুলের ছায়ায় করি নিত্য ভুলের চাষ
ভুল করে এসেছিনু ভুলে ভালোসেছিনু
ভুলকে ইংরেজিতে বলা হয় Wrong বা Mistake এই Mistake আবার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে যেমন- Clerical mistake, Print mistake, Digital mistake, Gross mistake, Spelling mistake ইত্যাদি। ভুল যতো প্রকারেরই হোক আর কবি সাহিত্যিকরা যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন না কেন অন্যজন ভুল করবে আর খেসারত দেবে আরেকজন- এটা কেউ মেনে নিবে না। তারপরেও এ সংস্কৃতি চালু আছে সমাজে, এমনকি সরকারি পর্যায়ে। সরকারের লোকজন ভুল করছে আর খেসারত দিচ্ছে জনসাধারণ। এ ঘটনা একটি দুটি নয়, হাজারে হাজার। ভূমি বিভাগের জরিপে দেখা যায় খতিয়ানে ভুল, দাগে ভুল, পরিমাণে ভুল, রেকর্ডে ভুল, নকশায় ভুল, ভূমির রকমে ভুল। এ ছাড়াও রয়েছে খারিজে ভুল, রেজিস্ট্রি জমিকে খাস খতিয়ানে নেওয়ার ভুল। এমন অসংখ্য ভুলে ভরা এই ভূমি বিভাগ। ভুল সংশোধন করার জন্য ভুক্তভোগীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ খরচা দিতে হয়। উকিল নিয়োগ করতে হয়, দিনের পর দিন অফিসে হাজিরা দিতে হয়, ৫/১০ বছর পর্যন্ত লাগে, পেরেশানির শেষ থাকে না। ভূমি বিভাগের লোকজনের ভুলের খেসারত জনসাধারণকে কেন দিতে হবে? অন্যদিকে তাদের ভুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই কেন? ভুল ঠিক করে দেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজ ও নৈতিক দায়িত্ব। কারণ ভুলটা তাদেরই। ভূমি বিভাগের এ ভুলগুলো কমপক্ষে ৫০ বছরের। ভূমি জরিপের স্তুপিকৃত এই ভুলের প্রতিকার পেতে ২০০৪ সালের পূর্বের আইন সংশোধন করে ১২টি ট্রাইবুন্যাল গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ট্রাইবুন্যালের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৪৫টি করে। সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ৪৫টি ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যালে ৩ লাখ ৩ হাজার ৩৫টি ভূমি জরিপে ভুল সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ হাজার ১৪৫টি মামলা ঝুলে আছে ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আর উচ্চ উদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে ১৬৮টি। এক একটি ট্রাইবুনালে ৩০ থেকে ৪০ হাজার পর্যন্ত মামলা রয়েছে। বর্তমানে একজন করে যুগ্ম জেলা জজ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনালের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই বিপুল পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি করা একজনের পক্ষে সম্ভব নয় বলে যুগ্ম জেলা জজের পাশাপাশি যেন সিনিয়র সহকারী ও সহকারী জজরাও এই মামলাগুলোর বিচার করতে পারেন। এমন একটি আইন সংশোধনের জন্য তা সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ভূমি সংক্রান্ত ভুলের আরো অসংখ্য মামলা জেলা প্রশাসকের রেভেনিউ শাখায় পড়ে আছে। যার সহজ সমাধান করা হচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশন নতুন জাতীয়পত্র দিয়েছে তাতে অসংখ্য ভুল। জেলা উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচন অফিসগুলোতে প্রতি মাসে ২/৩ শত করে ভুল সংশোধনের জন্য আবেদন পড়ছে। প্রতিটি ভুলের জন্য ২০০ টাকা ফি এবং ভ্যাট ৩০ টাকার ট্রেজারি চালান করে আবেদনপত্র পূরণ করে জমা দিতে হয়। ফি ও ট্যাক্স ছাড়াও ফটোস্ট্যাট কম্পোজ ফরমের দামসহ ১০০ টাকা খরচ করতে হয়। ভুলটা ঠিক করে দেওয়ার জন্য ভোটারকে কেন খরচ করতে হবে। ভোটার যদি তথ্য দিতে ভুল করে সেক্ষেত্রে ভোটার সংশোধনের জন্য ফি দিতে বাধ্য। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের লোকজন সে ভুল করে থাকে তবে সেই খেসারত ভোটার দেবে কেন? সেক্ষেত্রে ফি আদায় করাতো নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। উপরন্তু সংশোধিত কার্ডটি কখন পাবে তার কোনো দিনক্ষণ বা সময় দেওয়া হয় না। অথচ আইডি কার্ডটি পাসপোর্ট, ভিসা, জমিজমা রেজিস্ট্রি, ব্যাংক একাউন্ট, ভতির্, চাকরির আবেদনপত্র, বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন জরুরি কাজে ব্যবহার হয়। অন্যথায় সে কাজ হয় না। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কোনো তোয়াক্কা নেই। ভুগতে হয় ভোটারকে।
পুলিশ ভুল করে একই নামের অন্য ব্যক্তিকে আসামী হিসেবে আটক করে হাজতবাস করানো, না বুঝে নাবালেগ শিশুকে আসামী করা, ভুল চার্জশিট দিয়ে একপক্ষের ক্ষতি করার ঘটনা অহরহই ঘটে। এ সব ঘটনার যারা শিকার হন তাদের যন্ত্রণা কি পুলিশ বোঝে? এমন ভুলের জন্য শাস্তি ক’জনের হয়েছে? আর এখনতো সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা মানে নিজেকে হয়রান হওয়া। জনসাধারণ যাবে কোথায়? পরীক্ষার ফলাফল ভুল। পাস করা ছাত্র ফেল করছে, প্রাপ্ত নম্বর না দিয়ে ভুল করে কম নম্বর দেওয়া প্রাথিত গ্রেড পাচ্ছে না। এ সব কারণে ভুক্তভোগীকেই ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়। যদি ঘটনা সত্য বলে প্রমাণ হয় তবে তার দেওয়া ফি’টা ফেরত দেওয়া হবে না কেন এই সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে এ জন্য জবাবদিহি বা শাস্তির ব্যবস্থা আছে কি? ডাক্তারদের একটু ভুল প্রেসক্রিপশান, ভুল ইঞ্জেকশন, ভুল অপারেশন, ভুল করে অপারেশনের স্থানে গজ-তুলা-ব্লেড রেখে দেওয়া প্রভৃতি কারণে রোগীর জীবন বিপন্ন হচ্ছে। এ জন্য কি ডাক্তাররা শাস্তি পেয়েছে? সাংবাদিকরা ভুল রিপোর্ট করায় একজন ভালো মানুষের সামাজিক মানহানি হচ্ছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্নাম হচ্ছেÑ এর প্রতিকার ক’জন পেয়েছে? রাজনীতিবিদরা একে অপরের বিরুদ্ধে ভুল ও অপবাদ দেন, রাজনীতিবিদদের ভুল রাজনীতির কারণে গোটা জাতি ভুলের শিকার হয়। এর বিচার কেউ করতে পেরেছে কি? ভুল করে ভুল পথে যানবাহন চালালে দুর্ঘটনা ঘটে। আহত নিহত হয়। তারপরও যদি চালক বলে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে এটাতো বলে কয়ে আসে না। তাহলে তো দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কে তা চিহ্নিত করা যাবে না। তাই দুর্ঘটনাকে নেহায়েতই দুর্ঘটনা আর ভুলকে ভুল বলে দায় শেষ করা যাবে না। প্রভাবশালীর ছেলে গরিবের ছেলেকে অকারণে মারধর করলো। সমাজ বসলো। প্রভাবশালীর ছেলের ভুলে হয়েছে বলে ক্ষমা চাইলো, সমাজ বললো ভুল স্বীকার করেছে, মাফ চেয়েছে তাকে মাফ করে দাও বাবা। এ ঘটনা যদি গরিবের ছেলে ঘটাতো তাহলে সমাজ কখনোই গরিবের ছেলেকে মাফ করতো না। দায়ীকে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা যেমন করতে হবে তেমনি উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে এমন অসংখ্য ভুল হচ্ছে যা বলে শেষ করা যাবে না। তাই বলে সেটাকে ভুলের সংস্কৃতি বলে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না মোটেও।
একজন প্রবীণ আইনজীবী বললেন, ভুলের কোনো মামলা হয় না। তাই ভুলকে অন্যায় হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে শাস্তির বিধান আছে। ইতোপূর্বে বলা হয়েছে কর্তৃপক্ষের ভুল হলে ফি দিয়ে সংশোধন করতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ফি নেওয়াটা যে আইনসঙ্গত নয় তা প্রমাণ করতে হবে ভুক্তভোগীকেই। তাহলেই তার বিরুদ্ধে মামলাসহ শাস্তির ব্যবস্থা হতে পারে। প্রমাণ করার কাজ একজন সাধারণ ব্যক্তির কাজ নয়। এ জন্য সরকারি বিধান আবশ্যক।
লেখক : সাংবাদিক