ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক ও খেতমজুরেরা কেমন আছে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২২, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


নিজের জমি অথবা বর্গা নেওয়া জমিতে শ্রম দিয়ে যারা ফসল উৎপাদন করেন তারাই কৃষক। কিন্তু অগ্রসরমান অর্থনীতিতে কৃষক বলতে বুঝায় যাদের জমি বা খামার আছে। আর জমিতে নিয়োজিত কর্মীরা খামারকর্মী বা খেতমজুর। কৃষি বিভাগ কৃষকদের ৫টি শ্রেণিতে বিভক্ত করে। এরা হচ্ছে ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ধনী কৃষক। শূন্য থেকে ০২ হেক্টর পর্যন্ত জমি যাদের আছে তারা ভূমিহীন কৃষক এরা সংখ্যায় প্রায় ৪৯ লাখ। ০২ থেকে, ২ হেক্টর পর্যন্ত যাদের জমি আছে তারা প্রান্তিক কৃষক এরা সংখ্যায় প্রায় ৭৩ লাখ। ২ থেকে ১ হেক্টর পর্যন্ত যাদের জমি আছে তারা ক্ষুদ্র কৃষক- এরা সংখ্যায় প্রায় ৫৩ লাখ। ১ থেকে ৩ হেক্টর পর্যন্ত যাদের জমি আছে তারা মাঝারি কৃষক-এরা সংখ্যায় প্রায় ২৯ লাখ এবং ৩ হেক্টরের উর্দ্ধে যাদের জমি আছে তারা ধনী কৃষক। এরা সংখ্যায় ৭ লাখ। অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি ১১ লাখ বিভিন্ন শ্রেণির কৃষক রয়েছে দেশে। এ বিশাল সংখ্যক কৃষক শুধু তার নিজ প্রয়োজনেই ফসল উৎপাদন করেনা, করে দেশবাসীর জন্যও। এছাড়া কমপক্ষে ১ কোটি মানুষ যাদের খেতমজুর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যাদের ঘামে ভেজা শ্রমেই সেই খাদ্য উৎপাদিত হয়। তাদের কোনো সম্পদ সম্পত্তি নেই। হাত পা ছাড়া এবং অন্য কোনো কাজ নেই- জমিতে শ্রম দেওয়া ছাড়া।
দেশের ২ কোটি কৃষক আজ সারের জন্য হাহাকার করছেন। প্রতিদিন পত্র-পত্রিকায় সোস্যাল মিডিয়ায় খবর আসছে সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের। আর এই অতিরিক্ত মূল্য আদায় করছেন নিবন্ধিত সার ডিলারেরা। প্রশাসনসহ সারের লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠান কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তাগণ এজন্য মাঠে নামেছেন, ডিলারদের জরিমানাও করেছেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে প্রচন্ড খরা, প্রয়োজনীয় বৃষ্টির অভাব কৃষকদের বেকায়দায় ফেলেছে। সারা দেশে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৮০ ভাগ পূরণ হবে কিনা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। প্রতি বছরই এ ধরনের কোনো না কোনো সংকট দেখা যায়। যেমন- খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা, সেচের পানির সংকট, সেচের উচ্চমূল্য ও সর্বোপরি ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়া। তারপরেও তারা দেশবাসীর খাদ্য যোগান দেন। অথচ তারা নিজেরা বঞ্চিত থেকে যান। বছরের পর বছর ধরে ধান চাষ করে তারা পরিবারের সচ্ছলতা আনতে পারেন না। বিশেষত ১ কোটি ২২ লাখ ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকরা। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে অনেকেই ধান আবাদ পরিত্যাগ করে আমের চাষ করে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
কৃষিনির্ভর এই দেশে কৃষকদের অবস্থা কী তা সরেজমিনে গিয়ে দেখা যাক। চলতি আমন মৌসুমে ধান আবাদের চিত্র কেমন। ১ বিঘা জমতে ধান আবাদ করতে প্রথমে জমির আইল কাটা ও বাঁধার জন্য ৩ জন মজুর, তারপরে হালচাষ করতে ৪ জন মজুর এবং ২বার নিড়ানি দিতে ৫ জন মজুর দরকার। অর্থাৎ মোট ১২ জন মজুর এর দৈনিক ৪০০ টাকা হিসেবে ৪ হাজার ৮০০ টাকা, বিঘাপ্রতি সেচ ১ হাজার ৫০০ টাকা, তিন ধরনের সার ৮০ কেজি যার সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৬০ টাকা, কীটনাশক প্রায় ১ হাজার টাকা, সার ও কীটনাশক ছিটানোর জন্য ১ হাজার টাকা এবং কৃষকের নিজের শ্রম ধান বীজ মাড়াই বা জিন বাবদ সর্ব নি¤œ ১ হাজার ৩৪০ টাকা ধরা হলে মোট খরচ হয় ১১ হাজার টাকা। ধরে নিলাম এক বিঘাতে সর্বোচ্চ ২০ মণ ধান উৎপাদিত হলো। যার বর্তমান বাজার মূল্য মণপ্রতি ১ হাজার টাকা হিসেবে ২০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিলে কৃষকের হাতে থাকে মাত্র ৯ মণ ধান বা ৯ হাজার টাকা এবং এক বছরে দুটি ফসল নিশ্চিত করতে পারলে পাবে ১৮ হাজার টাকা। যদি তার ১ বিঘা জমি থাকে। মাত্র ১৮ হাজার টাকায় কী একটা কৃষক পরিবার সারা বছর চলতে পারে ? আদৌ না। তাছাড়া ১ কোটি ২২ লাখ ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকের ৯০ শতাংশের ১ বিঘা জমিই নেই। এর সাথে আর ১ কোটি খেতমজুর (যারা সারা বছর কাজ পায়না, ৬ মাস পর্যন্ত বেকার থাকে ) যুক্ত হয় তাহলে প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ পরিবারের ৮/৯ কোটি মানষের (যা দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক) বেঁচে থাকা কত কঠিন তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া চা শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক, বেসরকারি কল-কারখানা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, বস্তিবাসীসহ বহু শ্রমিক মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের কথা না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু উল্লিখিত ভূমিহীন প্রান্তিক ও খেতমজুরদেরর জীবন কি দারিদ্রসীমার উপরে বলা যায়? এদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান নিশ্চিত নয়। আর এদের উন্নয়ন নিশ্চিত না করে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ যেমন সম্ভব নয়- তেমনি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিবেচনা করাও সম্ভব নয়।
লেখক : সাংবাদিক