ভেঙে পড়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা || পুরো নগরী আবর্জনার ভাগাড়

আপডেট: জুলাই ১২, ২০১৭, ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


নগরী পরিণত হয়েছে আবর্জনার স্তুপে। গতকাল সকালে নাকে হাত চাপা দিয়ে নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকায় হেটে যাচ্ছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী সোনার দেশ

বিশ্বের নির্মল বাতাসের শহর খ্যাত রাজশাহী নগরী এখন আবর্জনার ছড়াছড়ি। কর্মচারী আন্দোলনের জেরে টানা তিনদিন ধরে বন্ধ আছে নগরীর বর্জ্য অপসারণ। বিভিন্ন পয়েন্টে জমা হয়েছে গৃহস্থালি ও বিপণি-বিতানের বর্জ্য। এর ফলে  পথচারীসহ নগরবাসী পড়েছেন দুর্ভোগে। পাশাপাশি ভেঙে পড়েছে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
নগরবাসী বলছেন, এ ধরনের দুর্ভোগ তারা আগে পড়েন নি। বাড়ি থেকে বের হলেই পাড়ার রাস্তাতেই ময়লা আর আবর্জনার ছড়াছড়ি। দুর্গন্ধে নাক চেপেও চলাফেরা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে নগরীবাসী বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হবে। বিশেষ করে শিশুরা রয়েছে সবচেয়ে ঝুঁকিতে। অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে আর্বজনা অপসারণ না করলে, বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রতিদিন নগরীর বাসা বাড়ি থেকে ভ্যানে করে ময়লা সংগ্রহ করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। কোথাও কোথাও নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করেন তারা। এরপর সেগুলো নেয়া হয় সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনগুলোয়। সেখান থেকে প্রতিরাতেই বর্জ্য সরিয়ে নেয়া হয় নগরীর সিটিহাট সংলগ্ন ভাগাড়ে। এছাড়া প্রতিরাতেই নগরীর ময়লা-আবর্জনা ঝাড়– দিয়ে সরিয়ে নেয় রাসিক। ভোরে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন নগর পান বাসিন্দারা। আর পুরো এ কার্যক্রমে নিয়োজিত দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীরা। কিন্তু গত রোববার থেকে ১১ দফা দাবিতে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছেন এসব কর্মচারী। সেদিন থেকেই কর্মবিরতি চলছে। ফলে সরেনি নগরীর বর্জ্য। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে জনদুর্ভোগ।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা দেখা গেছে, নির্ধারিত ডাস্টবিন উপচে পড়ছে গৃহস্থালি বর্জ্য। কোথাও কোথাও রাস্তার উপরেই ফেলে রাখা হয়েছে ময়লা। সেকন্ডোরি ট্রান্সফার স্টেশনগুলোও আবর্জনায় পূর্ণ। উপচে পড়েছে আশেপাশের রাস্তায়। অপসারণ না করায় উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এরই মধ্যে থেমে থেমে নামছে বৃষ্টি। ফলে ময়লা-কাদাজলে একাকার।
রাসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ বলছে, সংস্থাটির পরিবহন শাখায় তালা দিয়েছে আন্দোলনকারী কর্মচারীরা। এর ফলে ময়লা সংগ্রহে নিয়োজিত একটি গাড়িও বের হতে পারেনি। আন্দোলনকারীদের বাধায় নামেনি ভ্যানগুলো। রাত্রিকালীন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও তাদের কাজ থেকে বিরত থেকেছেন। ফলে ময়লা-আবর্জনায় পরিণত হয়েছে নগরী। তবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ভাষ্য, দাবি আদায়ের জন্যই তাদের এ কর্মবিরতি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ময়লা সংগ্রহ করা শুরু করেন। সড়কের ময়লাও রাতেই মধ্যে পরিষ্কার করা হয়। এর ফলে সারাদেশের মধ্যে রাজশাহী নগরী একটি পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

এদিকে বর্জ্যরে কারণে নগরবাসী পড়েছে ভোগান্তির মধ্যে। বিষয়টি নিয়ে তারা গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। নগরীর উপকণ্ঠ কোর্টস্টেশন সংলগ্ন সিটি বাইপাশ এলাকায় রয়েছে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন। এ স্টেশন থেকে প্রতি রাতে বর্জ্য অপসারণ করা হয়। কিন্তু গত তিনদিন পরিচ্ছন্নকর্মীরা সেখান থেকে বর্জ্য অপসারণ না করায় এলাকাটি দুর্গন্ধময় হয়ে উঠেছে। সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনের ময়লা উপচে পড়েছে রাস্তায়। ব্যস্ততম মহাসড়ক হবার কারণে বর্জ্য পরিহনের চাকার সাথে তা ছড়িয়ে পড়েছে।
এলাকার বাসিন্দা আতাউর রহমান বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মহাসড়কের আধা কিলোমিটার এলাকা ময়লা আর্বজনায় সয়লাব হয়ে পড়েছে।  এলাকা দিয়ে চলাফেরা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ময়লাগুলো কাকসহ বিভিন্ন পাখি টেনে নিয়ে এদিক- সেদিক ছড়াচ্ছে। এছাড়া কুকুরের উপদ্রব তো রয়েছেই। আমরা এ ধরনের নাগরিক ভোগান্তি চাই না। অচিরেই এর একটি সমাধান চাই।’
অপরদিকে ময়লা জমেছে নগরীর অন্যতম পাইকারি সবজিবাজার সাহেববাজার মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজারেও। এনিয়ে ভোগান্তির অন্ত নেই ক্রেতাবিক্রেতাদের। এ বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, কাঁচা তরিতরকারি বিক্রি করার কারণে অধিকাংশ সময় এ এলাকাটি ময়লা আর্বজনায় ভর্তি হয়ে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্বজনা না সরানো। ফলে বৃষ্টিতে এলাকাটি  কর্দমাক্ত হয়ে উঠেছে। চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে উঠেছে। একই অবস্থা নগরীর হড়গ্রাম, লক্ষ্মীপুর ও শালবাগানসহ অন্য কাঁচা বাজারগুলোর।
এদিকে এসব বর্জ্যরে কারণে ছড়াচ্ছে রোগ-জীবাণু। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন নগরবাসী। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষিত এই বর্জ্যরে ভেতর ক্যালিফরম, সালমোনেলা ও সিগেলা জাতীয় ভয়ঙ্কর ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এসব জীবাণু থেকে জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সি মানুষের।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফয়সাল আলম বলেন, বর্জ্যে থাকা জীবাণুগুলো এতো ভয়ঙ্কর, যেগুলো সহজে মরে না। এসব বর্জ্য একটু শুকালে ধুলা হয়ে বাতাসে মিশছে। তার সঙ্গে ছড়াচ্ছে রোগ-জীবাণু। এর ফলে বাচ্চাদের নিউমোনিয়াসহ নানা ধরনের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) রাজশাহী অঞ্চলের সমন্বয়কারী তন্ময় স্যানাল বলেন, নির্মল বাতাসের জন্য রাজশাহী বিশ্বের সেরা শহর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু এই শহরেই দূষিত বর্জ্য অপসারণে এমন বেহাল চিত্র দেখা যাচ্ছে। আমি অতিদ্রুত বর্জ্য অপসারণের দাবি জানাচ্ছি।
এ ব্যাপরে ক্ষোভ প্রকাশ করে ছয় নম্বর ওয়ার্ডের নুরুজ্জামান টুকু বলেন, পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে রাজশাহীর সুনাম রয়েছে। কিন্তু নগরীটি ময়লা আবর্জনায় নষ্ট হয়ে গেলো। আমরা এর দ্রুত অবসান চাই। আমি বিশ্বাস করি, মেয়র আন্দোলনকারীদের নিয়ে বসলেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।
রাসিকের প্রধান পরিচ্ছন্না কর্মকর্তা শেখ মো. মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অচিরেই এ সমস্যার সমাধান হবে। সিটি করপোরেশনের শালবাগানে যে গ্যারেজ রয়েছে, সেখান থেকে ময়লা অপসারণের গাড়িগুলো (গতকাল মঙ্গলবার রাত নয়টায়) বের হতে শুরু করেছে। আশা করছি, আগামিকালের মধ্যে (আজ বুধবার) এ সমস্যার সমাধান হবে। রাজশাহী নগরী আবারো পূর্বের চেহারায় ফিরে আসবে।
এ ব্যাপারে সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, বর্তমান মেয়রের সঙ্গে শ্রমিক ও কর্মচারীদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আর একারণেই এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমি ইতোমধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ সকল সেবা বিভাগের কর্মচারীদের কাজ করার আহবান জানিয়েছে। তারা আমার আহবানে সাড়া দেবেন বলে বিশ্বাস করি। অল্প সময়ের মধ্যেই নাগরিক ভোগান্তির অবসান হবে বলে আমি আশাবাদী।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ