ভ্রমণ ও ভ্রু-যুগল

আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০২২, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

কবীর রানা


[কথা, অযথাঃ হরিণগাছী, আমার গ্রাম। কুষ্টিয়া, জেলা। শৈশবে যখন শ্রবণে, দর্শণে, স্পর্শে, ঘ্রানে, স্বাদে আমি আমার চারপাশকে জানছিলাম- সেই জানার ভেতর সঙ্গি হলো, আবিষ্কার হলো এ গ্রামের অসংখ্য গান, কথা, উপকথা এবং আরো কতো কি যে। এ গ্রামের এসবের ভেতর দেখি অনন্য হয়ে
আছে এক বিশেষ প্রবণতা- জন্ম হওয়া বিষয়ক উপকথা। এ গ্রামের মানুষেরা সকল কিছুর জন্ম হলো কিভাবে সে সব উপকথা তারা বলতে, শুনতে, নির্মাণ করতে ভালোবেসেছে। যেভাবে ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে মানুষ বা পৃথিবীর জন্ম বৃত্তান্ত বিবৃত আছে সেভাবে এ গ্রামের গল্পের স্রোতে ছিলো মানুষের জন্ম হলো কিভাবে, তার অঙ্গ-প্রতঙ্গের জন্ম হলো কিভাবে, বৃক্ষ সমূহ, মেঘ সমূহ, নদী সমূহ প্রভৃতির জন্ম হলো কিভাবে সে সব এবং অতি অবশ্যই- আমাদের এ গ্রামের জন্ম হলো কিভাবে সেটি। আমার শৈশবের সে গ্রাম শহর আর প্রযুক্তির আক্রমনে ক্ষত-বিক্ষত শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে। তার সে কথা, উপকথা বিলুপ্ত। বিলুপ্ত তারা বিলুপ্ত পাখীর মতো। তারপরও কথা এই যে, বিলুপ্ত পাখীর উড়াল যেমন আকাশ ধরে রাখে তার অবচেতন আয়তনে, তেমনি হরিণগাছী গ্রামের
কিছু গল্প রয়েছে আমার অবচেতন আয়তনে। সে সকল গল্প হরিণগাছীবাসীরা ছাড়া কে-বা জানে! হরিণগাছী গ্রামের একজন, আমি সে সকল গল্পের কথক হতে গিয়ে দেখি সে সকল গল্পের শরীর নাই কেবলি ছায়া। ছায়ারও মায়া কম নয়। সম্প্রতি আমি সে সকল গল্পের ছায়া আঁকছি অসামান্য ভুলে, সামান্য নির্ভুলে। সে সকল ছায়ার একটি “ভ্রমন ও ভ্রুযুগল”। এ কথাগুলো আমার কাছে চির আশ্রয় জল, অন্যের কাছে হয়তোবা শুধু কথা, অযথা। চারিদিকে যখন মৃত্যুর গল্প তখন জন্মাবার গল্প তো এক টুকরো রোদ]
দু’টো পাতার হঠাৎই মন খারাপ হয়। তখন বিকেল বেলা। রোদ হাত নাড়তে নাড়তে দূরে চলে যাচ্ছে। অন্যান্য পাতাগুলো বাতাসের সাথে কথা বলছে। আর এ দু’টো পাতার ভীষণ মন খারাপ করলে দেখি তারা বাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। বাড়ি তাদের বন, ঘর তাদের গাছ। তারা বন, গাছ, ছাড়িয়ে উড়তে থাকে। তারা জেনেছে মন খারাপ হলে সকল কিছু বড় হতে চায়, বাড়িত্যাগী হয় বড় হবার উদ্দেশ্যে। তারা বাড়িত্যাগী এখন-উড়ছে বড় হবার উদ্দেশ্যে। উড়তে উড়তে তারা বন ছাড়িয়ে যায়, গাছ ছাড়িয়ে যায়। গাছে কি মা ছিলো, বাবা ছিলো, বোন ছিলো, ভাই ছিলো-যদি তাই, তবে তারা মা-বাবা-বোন-ভাই ছাড়িয়ে যায়। বিকেলের কিছু মেঘ নদীর ওপর ছায়া তৈরির খেলা খেলছিলো। তারা মেঘেদের সংগী হয়। এ মেঘ গুচ্ছ কোথা থেকে এসেছে, কোন গৃহ ত্যাগ করে, কোন ছোটত্ব ত্যাগ করে জানে না তারা। এই মেঘগুচ্ছের সঙ্গে পাতা দু’টোর বন্ধুত্ব হয়। তারা জানে, পাঠ করে মেঘগুলোর নিকট থেকে আকাশের মানচিত্র, জলের মানচিত্র। পুকুর, নদী, সমুদ্র কতো নিকট কতো দূর; লাল, নীল, হলুদ আকাশ কতো নিকট, কতো দূর। মেঘেদের সংগে উড়তে উড়তে তাদের মন ভালো হয়ে যায়। তারা দেখে মন ভালো হয়ে গেলেও তাদের সেই বনে, সেই গাছে, সেই গৃহে আর ফিরতে ইচ্ছে হয় না। সেই বন, সেই গাছ, সেই গৃহ এখন দৃষ্টির বাইরে
চলে যায়, মনের বাইরে চলে যায়। তাদের বাইরে চলে যায়। ছায়ার বাইরে চলে যায়। তারা উড়ে ঐ মেঘগুলোর সংগে। মেঘেদের গল্প তারা শেখে। তারা দূরের গল্প শেখায়, তারা নিকটের গল্প শেখায়। মেঘগুলোর সংগে খেলে আর চলে। নিচে কতো কিছু- গ্রাম, শহর, মানুষ, মানুষের গৃহ। খেলতে খেলতে, চলতে চলতে মেঘেরা ক্লান্ত। মেঘেদের ক্লান্তি সংক্রামিত হলে তারাও ক্লান্ত। তারা দেখে ভালোলাগাও ক্লান্ত হয়, আনন্দও ক্লান্ত হয়। ক্লান্ত হলে সবকিছু অবস্থান বদলায়, রূপ বদলায়- মেঘগুলো অবস্থান বদলায়, রূপ বদলায়। তারা জল হয়। জলবিন্দু হয়। তখন পতন। মেঘগুলো, জলবিন্দু হয়ে পতিত হলে তাদের সাথে পাতা দু’টোও পতিত হয়। তারা পতিত হয় জলের
পিঠে-সেটা কি, পুকুর, সেটা কি নদী, সেটা কি সমুদ্র! পাতা দু’টো দেখে তারা পড়েছে সমুদ্রের পিঠে। তারা দেখে পতন ভালো। পতনের ভেতরেও কি বিপুল বৃহৎ। সমুদ্রের ভেতর মেঘ কোথায়। কোথায় তাদের আকাশ বন্ধু মেঘগুলো। তারা গলিত জল। দেখে বন্ধুরা আয়তন পাল্টায়, বন্ধুরা রূপ পাল্টায়, বন্ধুরা অবন্ধু হয়। বন্ধু তবে বদলাতে হয় তাদেরকেও। মেঘ বন্ধু না হয়ে গেলে সমুদ্রের জল বন্ধু তবে হ্যাঁ হোক। এ বিশাল জল বন্ধুর কোথায় তারা বসবে, দাঁড়াবে, ঘুমাবে। তারা, দু’টি পাতা, দু’টি পাতা, বিপুল সমুদ্রকে বন্ধু করতে ভীত হয়। কতো দূর সীমানা তার। কতো কতো কক্ষ তার, কতো কতো অধিবাসী। পাতা দু’টোর বৃহত্বের ভয় জাগলে ক্ষুদ্রত্বের আকাঙ্খা বিশাল সমুদ্রের ভেতর তারা প্রার্থনা করে ছোট বন্ধুত্বের। তারা বৃহৎ সমুদ্রের ভেতর আবিষ্কার করে ক্ষুদ্রত্ব।
সমুদ্রের ছোট ছোট মাছ তাদের ভালো লাগলে তারা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বে যায়। রূপালি মাছ, বাদামী মাছ, হলুদ মাছ- তাদের নিকট থেকে পাতা দু’টো জলের নিয়ম শেখে, জল যা কি না ভেদ করতে হয়। জলের দেয়াল ভেদে তাদের কি আনন্দ! একদিন- কতোদিন। কতোদিন পর তাদের মন খারাপ হয়। তারা দেখে প্রতিটি ভালো লাগার ভেতর কি ভীষণ মন খারাপ। মন খারাপ হলে আবারো গৃহত্যাগী হতে হয়। পাতা দু’টো সমুদ্র থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। ছোট ছোট মাছ তারা সাহায্যে
সদয় হয়। ছোট ছোট মাছ তারা ছোটর খবর রাখে। তারা পাতা দু’টোকে পথ দেখায়। পাতা দু’টো ঢেউয়ে ঢেউয়ে সমুদ্রের, বৃহতের বাইরে যেতে থাকে। তখন তবে তারা পৌঁছায় নদীতে। পুনরায় দেখি, পাতা দু’টো নতুন বন্ধু খোজে। তারা দেখে তারা বন্ধুহীন, বন্ধনহীন থাকতে পারছে না। তারা নদীর ধারে ধারে ঘোরে। সেখানে ছোট ছোট মাছ। তারা ছোট ছোট মাছের সঙ্গি হয়। তারা জানে এ সকল মাছ ও তাদের বন্ধুত্বও স্বল্পস্থায়ী। মাছগুলো জালে আটকায়। চিৎকার করে। সাহায্য কোথায়। জলের ভেতরের চিৎকার জলে মিশে যায়। প্রতিনিয়ত এভাবে ছোট ছোট মাছগুলোর সাথে তাদের বন্ধুত্ব হয়, বন্ধুত্ব ছিন্ন হয়। তারা টের পায় বন্ধুত্বের নিরাপত্তহীনতা। তবে নদী আর কতোকাল।
তাদের আবারো মন খারাপ হয়। আর মন খারাপ হলে তারা জানে সে স্থান ত্যাগ করতে হয়। বর্তমান সঙ্গ ত্যাগ করতে হয়। নদীর সঙ্গ ত্যাগ করার জন্য পাতা দু’টো নিজেদের শরীরের দিকে তাকায়, নিজেদের মনের দিকে তাকায়। এতো টুকটুক দু’টো শরীর কোন আশ্রয়ে যাবে। নদীর পাড়ে ঘাট। তার সংগে গ্রাম। গ্রাম থেকে শরীরের ময়লা দূর করতে, মনের ময়লা দূর করতে স্নানের সন্ধানে কারা কারা আসে এ ঘটে। তারা নারী, তারা পুরষ, তারা কিশোর, তারা কিশোরী- মানুষের
বয়সের আরো কতো কতো ভাগ। পাতা দু’টো একদিন এক সন্ধ্যায় একটা কিশোরীকে ঘাটে পায়। কিশোরীর শরীর তখন জলে সিক্ত। সে ডুব দেয়। ভাসে। ময়লা ভেসে যায়, মন ভেসে যায়, স্নান ভেসে যায়। পাতা দু’টো স্থান বদলানো রপ্ত করেছে দারুণ। এখন তারা স্থান বদলাতে, মন খারাপ করা বিষয়টি তাড়াতে কিশোরীটির দু’চোখের উপর বসে যায়। কিশোরীটি স্নান সেরে বাড়িতে এসে আয়নার ভেতর নিজেকে খুঁজতে গিয়ে কি বিষ্ময় তার। তার চোখের উপর কারা বসে আছে। এই একটা বিষ্ময় হাজির তার মুখে, তার আয়নায়। এই বিষ্ময় একটা প্রশ্ন হয়ে যায়। চোখের ওপর দু’টি সরু পাতা। তারপর মা-কি ওটা; তারপর বাবা- কি ওটা; তারপর ভাই-বোন-কি ওটা? কতো কতো প্রশ্ন। তারপর পাতা দু’টো চিহ্নিত হয়। মুখের ওপর কিছুই থাকে না অচিহ্নিত। তাদের নাম তবে হয়ে যায় ভ্র, একত্রে হোক ভ্র-যুগল। আবার যদি কখানো মন খারাপ মাঝে মাঝে- তারা ওড়া ভুলে গেলে স্থান বদলাবে কিভাবে। চিরকাল ওড়া যায় না। যখন এখন তারা স্থান বদলাতে পারে না, শোনে তারা গাছের, অরণ্যের, আকাশের, মেঘের, সমুদ্রের নদীর আহবান। তারা, পাতা দু’টো আজ স্থির হয়, ছোট হয় গাছ পেরিয়ে, বন পেরিয়ে, আকাশ পেরিয়ে, সমুদ্র পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে- এবং আরো আশ্চর্য তারা দেখে ভেতরে ভেতরে ছোট হচ্ছে না তারা। এই ভ্রুযুগল কিশোরীটির চোখ দু’টো নিয়ে
বৃক্ষে, বনে, আকাশে, সমুদ্রে, নদীতে যায়- আর কিশোরীটিকে উপহার দেয় কতো শত বৃহত্বের আহবান, বৃহত্বের স্মৃতি। তবে বলি, প্রার্থনায়, অতি অবশেষে, ভ্রুযুগল, তাদের তলায় কিশোরীটির যে চক্ষুদ্বয় সেখান থেকে সন্ধ্যা ঝরনা হোক চিরপ্রবাহমান।