ভ্রমণ : পার্থ থেকে মেলবোর্ন

আপডেট: জানুয়ারি ২০, ২০১৭, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

ওসমান গনি তালুকদার

…গত সংখ্যার পর

কুলগার্ডি থেকে কায়গুনা- ১
পরদিন অর্থাৎ ১৬ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নিলাম। পূর্বের মত মালপত্র বাঁধা হল গাড়িতে। ট্যাংকির খালি অংশ পেট্রোল ভরতে ভুললাম না। সকাল ৮:৩০ টায় কেবিনের চাবি ফেরত দিয়ে কায়গুনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। জেসমিন গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে। সে একটানা ১০০ কিলোমিটার চালিয়ে গাড়ি ঢুকিয়ে নিল রাস্তার ধারের এক পার্কে। আমরা চা-নাস্তা সারছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল পার্কের পাশ ঘেঁষে একটি বড় বিল। সেই বিলে দৃষ্টিসীমার মধ্যে অনেকটা দূরে উড়ে বেড়াচ্ছে ঝাঁক ঝাঁক হাঁসজাতীয় পাখি। তাদের উপস্থিতিই জানিয়ে দিচ্ছে সেখানে পানির অস্তিত্বের কথা। তবে দেখা যাচ্ছিল পুরো বিলটা যেন গাড় লাল রঙে রাঙ্গা। মনে পড়ল কুলগার্ডিতে আসার পথেও রাস্তার পাশে এরকম লাল রঙের জলাশয় দেখেছি। কিন্তু বুঝতে পারি নি কেন ওরকম রঙিন দেখাচ্ছিল। এবার আর কৌতুহল সংবরণ করতে পারলাম না, বেরিয়ে পড়লাম অনুসন্ধানে। জেসমিন সঙ্গি হতে রাজি হল না, তাই আমি আর অভি স্টিল ক্যামেরাসহ এগিয়ে গেলাম। নিকটে গিয়ে বুঝতে পারলাম বিলের শুকিয়ে যাওয়া মাটির রং গাঢ় লাল। আমাদের দেশের কোথাও কোথাও লাল মাটি দেখা যায় তবে এত গাঢ় নয়। মনে পড়ল আয়রনের আধিক্য থাকলে মাটি লাল দেখায়। মঙ্গলগ্রহও লাল দেখায় কারণ, সেখানকার মাটিতে আয়রনের আধিক্য আছে। তবে সে লাল এ রকম গাঢ় কী না জানি না। দূরবীণ দিয়ে গ্রহটি দেখার সৌভাগ্য হয়নি কখনো। ভাবলাম এ এলাকার মাটির উপরিভাগে লোহার আধিক্য আর নিচে সোনার খনি। তাহলে কি মঙ্গলগ্রহের সব জায়গায় মাটির নিচে সোনার খনি আছে? যদি তাই-ই হয় তাহলে আমাদের ভবিষ্যত বংশধরেরা সেখান থেকে সোনা আহরণে পিছ পা হবে না। সেই প্রজন্মের মেয়েরা ছেলেদেরকে বলতে পারে: ‘এক শর্তে তোমায় আমি করতে পারি বিয়া/ গহনা যদি বানিয়ে দাও মঙ্গলের সোনা দিয়া’।
যা হোক, সেই বিলের ২/১টি ছবি ক্যামেরায় ধারণ করে ফিরে এলাম পার্কে। এবার ড্রাইভিং সিটে আমি। পার্ক থেকে একটানা ৭০ কিলোমিটার চালিয়ে এসে পৌঁছলাম নর্সম্যান (ঘড়ৎংবসধহ) শহরে। কুলগার্ডি হতে প্রায় সোজা দক্ষিণ দিকে ১৬৭ কি. মি. দূরে। এ শহরটি কাওয়ান হ্রদের (খধশব ড়ভ ঈড়ধিহ) দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। এ অঞ্চলে ছোট বড় মিলিয়ে ১০/১১টি হ্রদ আছে এবং সেগুলির মধ্যে এটিই সর্ব বৃহৎ। দৈর্ঘে প্রায় ১০০ কিলোমিটার আর প্রস্থে গড়ে ১০ কিলোমিটার।
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বা শেষ বড় শহর। এখানেও সোনার খনি আছে, যেখান থেকে ১৮৯২ সাল হতে সোনা উৎপাদিত হচ্ছে। খনি থেকে তোলা মাটি যেখানে ¯তূপ করা হয়েছে সেটা একটা পাহাড়ের মত দেখা যায়। এর উচ্চতা ৪৫ মিটার আর এটা পৃথিবীর মধ্যে এ জাতীয় সর্ব বৃহৎ ¯তূপ। স্তূপটি রাস্তা থেকেই দেখা যায়। এখানে এসেই গ্রেট ইস্টার্ন হাইওয়ে শেষ হয়েছে। আর শুরু  হয়েছে ইয়ার হাইওয়ে। আমরা এ দুটি হাইওয়ের ঠিক কর্নারে একটি পেট্রল স্টেশনে গাড়ি থামালাম। অবশ্য এটাকে শুধু পেট্রল স্টেশন বললে ভুল হবে। আসলে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পেট্রল স্টেশন ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত ছোট কমপ্লেক্স। এর চতুর্দিকে গাড়ি পার্কের ব্যবস্থা আছে। সুবিধামত একটি জায়গায় গাড়ি পার্ক করলাম। কমপ্লেক্সের ভিতর ঢুকে বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম। ফেরার পথে দেখতে পেলাম সালোয়ার কামিজ পরা এক ভদ্রমহিলা ও একজন ভদ্রলোক ছোট একটা বাচ্চার হাত ধরে সামনে হেঁটে যাচ্ছে। আমাদের দেখে মহিলাটি একটু পিছিয়ে এসে জেসমিনের সাথে আলাপ শুরু করল। আমি এবং অভি চলে এলাম গাড়িতে। আলাপ শেষে জেসমিন এসে জানাল সেই মহিলারা হচ্ছেন পাকিস্তানি অস্ট্রেলিয়ান। তাঁরাও স্ব-পরিবারে পার্থ থেকে ড্রাইভ করে এ্যাডেলেইড যাচ্ছেন। আমরা গাড়ির ভিতরে বসেই দুপুরের খাবার খেলাম। জেসমিন এক কাপ চা তৈরি করে নিল ফ্লাক্সের গরম পানিতে। আমি রেস্টুরেন্ট থেকে এক কাপ গরম কফি নিয়ে এলাম। কফি পান শেষে আবার যাত্রা শুরু করলাম।


ইয়ার হাইওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম সোজা পূর্ব দিকে কায়গুনার উদ্দেশে। উল্লেখ্য, এডওয়ার্ড জন ইয়ার-এর নামানুসারে এই হাইওয়ের নামকরণ করা হয়েছে। জন ইয়ার ১৮৪০ সালের ৩রা নভেম্বর ব্যাক্সটার (ইধীঃধৎ) নামের এক সঙ্গীসহ দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার স্ট্রীকি-বে থেকে যাত্রা শুরু  করেন। পথিমধ্যে ওয়াইলি নামের একজন বয়স্ক আদিবাসি তাদের সহায়তা করার জন্য সে যাত্রায় যোগ দেন। পরবর্তিতে আদিবাসিদের আরো দুই যুবক তাদের সাথে যোগ দেয়। পানীয়ের সঞ্চয় ফুরিয়ে আসছে দেখে একদিন জন ইয়ার বৃদ্ধ ওয়াইলিকে সঙ্গে নিয়ে পানির সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। ফিরে এসে দেখেন যুবকদ্বয় ব্যাক্সটারকে হত্যা করে বেশ কিছু খাদ্য ও পানীয় নিয়ে পালিয়ে গেছে। ব্যাক্সটারকে তারা সেখানে কবর দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন। আর দুর্গম মরু-প্রান্তর পাড়ি দিয়ে ১৯৪১ সালের ১৩ জুলাই গিয়ে পৌঁছান ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান অ্যালবানী শহরে।
স্ট্রীকি-বে থেকে অ্যালবানীর দূরত্ব প্রায় ২০০০ কি. মি. আর সমস্ত এলাকা প্রায় জনশূন্য মরু-প্রান্তর। তবে বিচ্ছিন্নভাবে দু-এক জায়গায় সামান্য কিছু আদিবাসীর বসতি ছিল। বর্তমানে ইয়ার হাইওয়ে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী এ্যাডেলেইড শহর থেকে শুরু করে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার নর্সম্যান পর্যন্ত বি¯তৃত। সর্বমোট দূরত্ব ২,২০০ কিলোমিটার-এর অধিক। এটি নির্মিত হয়েছে ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়। এই হাইওয়ের নাম্বার ১। তবে রাস্তার পাশে সাইনপোস্টের নাম্বার দেখে সঠিক পথে চলছি কী না তা নির্ধারণ করার দরকার পড়েনি। কারণ, মরুভূমির ভিতর দিয়ে এই একটিই রাস্তা। তবে পথিমধ্যে পার্কে যাত্রা বিরতির পর পুনরায় রাস্তায় ওঠার সময় সমূহ সম্ভাবনা ছিল উল্টো পথে যাবার। কারণ, মরু -প্রান্তরে দিক নির্ণয় অত্যন্ত কঠিন আর আমি তো অহরহ শহর এলাকাতেই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ি। তাই কুশেই নগরীর স্কলারের মত ঘটনা যাতে না ঘটে সে দিকে সচেতন দৃষ্টি ছিল সব সময়ই। ঘটনাটা এ রকম- স্কলার সকালে বেরিয়ে পড়লেন তার এক বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশে। বন্ধুর বাড়ি দু তিন দিনের হাঁটা পথ। প্রথম দিন শেষে ঠিক করলেন একটি গাছের নিচে ঘুমিয়ে রাত কাটাবেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভুলোমনের। সব কিছু ভুলে যেতেন খুব সহজেই। ভাবলেন সকালে ঘুম থেকে জেগে যদি বুঝতে না পারেন কোন দিক থেকে এলেন আর কোন দিকে যাবেন। তাই তার হাতের লাঠিটা গন্তব্যের দিকে মুখ করে রাখলেন। রাত্রে কোনভাবে লাঠির দিক উল্টে গেল। সকালে উঠে লাঠির দিক অনুসরণ করে আবার চলতে লাগলেন। প্রায় সারাদিন চলার পর সামনে একটি গ্রাম দেখতে পেলেন। সবকিছু চেনা চেনা মনে হতে লাগল। ভাবলেন বন্ধুর গ্রামটিও তার গ্রামের মতই। আর একটু এগিয়ে ভাবলেন বন্ধুর বাড়ি ঠিক তার বাড়িরই মত। ছেলে-মেয়েদের দেখতে পেয়ে ভাবলেন, বাহ! বন্ধুর ছেলে-মেয়ে দেখতে তার ছেলে-মেয়ের মতই। তারা যখন তাকে আব্বু বলে জড়িয়ে ধরল তিনি অবাক হয়ে ভাবলেন, তিনিও কি তবে দেখতে ঠিক বন্ধুরই মত? বলাই বা-ল্য, উল্টোপথে নিজের বাড়িতেই গিয়েছিলেন তিনি। আমরা কখনও ডান পাশে আবার কখনওবা বাম পাশের পার্কে যাত্রাবিরতি করেছি। যদি ভুলে যেতাম কোন পাশের পার্কে প্রবেশ করেছি, রাস্তায় ওঠার সময় কোন দিকে ঘুরাতে হবে গাড়ির স্টিয়ারিং, তাহলেই ঘটতে পারত এমন ঘটনা। তবে ঘটেনি, কেননা আমরা এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খেয়াল রেখেছিলাম।
ইয়ার হাইওয়েতে উঠার মুখেই দেখতে পেলাম একটি সাইনপোস্ট। তাতে পাশা-পাশি ক্যাঙ্গারু, ওমব্যাট ও উটের ছবি, নিচে লেখা পরবর্তী ১৫০ কি. মি.। উদ্দেশ্য, সতর্ক করে দেওয়া রাস্তার আশে-পাশের প্রান্তরে অন্যান্যের মধ্যে এ তিন জাতীয় প্রাণী আছে। মাঝে মধ্যে সেগুলি এক পাশ হতে রাস্তার উপর দিয়ে অন্য পাশে ছুটে যাওয়ার সময় চলন্ত  গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগে। ফল অধিকাংশ ক্ষেত্রে গাড়ি ও আরোহীদের জীবন বিপন্ন হয়, প্রাণীটিও মারা যায়। এরকম একটি ঘটনা ঘটে ১৯৯৬/৯৭ সালে। ৭/৮ জন বাঙালি মেলবর্ন থেকে সিডনি যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে হঠাৎ গাড়ির সামনে লাফিয়ে পড়ে একটা ক্যাঙ্গরু।  কিছু বুঝে উঠার আগেই লেগে যায় ধাক্কা। ফলে ক্যাঙ্গারুর ভাগ্যে কি ঘটেছিল জানি না, তবে সব আরোহীকে যেতে হয়েছিল হাসপাতালে আর গাড়িটি সারাবার জন্য টেনে নিতে হয়েছিল একটি মেকানিকের ওয়ার্কশপে। পরবর্তীতে ঘটনাটির বর্ণনা শুনেছিলাম ঐ গাড়িরই একজন আরোহীর মুখ থেকে। ক্যাঙ্গারুর মত ওমব্যাটও একটি দেশজ প্রাণী। স্ত্রী জাতীয়ের দেহে বাচ্চা রাখার থলে আছে। আকারে বিড়ালের চেয়ে সামান্য একটু বড়। দেখতে গোলগাল ছোট ভালুকের মত। অত্যন্ত  জেদী প্রকৃতিরÑ কোন কারণে অন্য কোন প্রাণীর সাথে মারামারি লেগে গেলে কখনো পিছু হটবে না। তাই আকারে বড় এবং অনেক বেশি শক্তিশালী প্রাণীও ওমব্যাটকে সমীহ করে চলে। একটা ডকুমেন্টারি ফিল্মে দেখেছি, একটা ওমব্যাট তার থেকে অনেক বড় একটি ক্যাঙ্গারুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হল। আর কিছুক্ষণ পর ক্যাঙ্গারুটি আত্মরক্ষার্থে লাফাতে লাফাতে পালিয়ে গেল।
ড্রাইভারকে সতর্ক করার জন্য প্রাণীর ছবি সম্বলিত সাইনপোস্ট, পার্থ থেকে কুলগার্ডি আসার পথেও দেখেছি। তবে সেখানে ক্যাঙ্গারু  এবং এমুর (ঊসঁ) ছবি ছিল। এমু হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান উটপাখি। সে রাস্তায় ৪/৫ কি. মি. পর পর দু’পাশে মরা ক্যাঙ্গারু পড়ে থাকতে দেখেছি। আর ইয়ার হাইওয়েতে সে সংখ্যা অনেক বেশি। গড়ে প্রতি কিলোমিটারে একটি করে। স্পষ্টত প্রাণীগুলি দুর্ঘটনার শিকার।
চলবে…