ভয়

আপডেট: মার্চ ২৬, ২০১৭, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

সুখেন মুখোপাধ্যায়



সপাটে ব্যাট চালাল দরদ। বল একেবারে উড়ে গিয়ে পড়ল ওই দক্ষিণের ঘিঞ্জি জলাটার দিকে। জলাটার উত্তরে একটা হালফ্যাসানের তেতলা বাড়ি। বাড়িটার তেতলায় থাকে বাড়িওলা নিজে। আর অবশিষ্ট দুটোতে থাকে দুজন ভাড়াটে। বাড়িওয়ালা আহম্মদ সাহেব একজন রিয়ালএস্টেট ব্যবসায়ী। জলাটার অর্দ্ধেকসহ আশেপাশের অনেকটাই তার দখলে। বাকি দুজন ভাড়াটে হচ্ছে সেনবাবু আর বড়–য়া সাহেব। ওরা দুজনেই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ওরা একই দালানে থাকে; কিন্তু আন্তরিকতা নেই। তেল জলের মতো দূরে দূরে থাকে।
এদের বর্জেই জলাটার পাড়ের বিশাল আবর্জনার স্তুপ, জলাটাকে আড়াল করে রেখেছে। আহম্মদ সাহেবের ইচ্ছে, এই বর্জই একদিন জলাটা ভরাটে ব্যবহার করবে।
লোকালয়ের আড়ালে থাকায় এ জলাটার দিকে যেতে কেমন যেন ভয় ভয় লাগে। সহজে কেউই মাড়াতে চায় না ওদিকটা। ক্রিকেট বলটা ওই জলাটার দিকে পড়তেই খেলোয়াড় দলের উৎসাহ থমকে গেল। সবাই মুুখ চাওয়া-চাউয়ি করছে। সাথীদের দ্বিধা দেখে ঋষিপাড়ার মারকুটে ব্যাটসম্যান দরদ মুখ খোলেÑ কী রে, স্কুলের হেডস্যারের সবক ভুলে গেলি? স্যার বলেছেন না, সাহসের থেকে বড় অস্ত্র আর নাই। চল সবাই একজোট হয়ে বলটা কুড়িয়ে আনি। দরদের কথা শেষ হতেই অংকুর মুখ খোলেÑ সে না হয় যাচ্ছি। কিন্তু ওই বলটা কী ওভার বাউন্ডারি হবে?
কেন নয়? বলটা কি সীমানা পেরোয়নি?
সার্জনের উক্তিকে পাত্তা না দিয়ে অংকুর বলেÑ কিন্তু আমরা তো সবাই মাঠ ছেড়ে বাইরে যাচ্ছি। খেলা আর রইল কই?
এটা একটা মহাপাকু। ক্লাস সিক্সে দুবার গাড্ডা। বেশি বকবক করবি না।
দরদের কথাকে সমর্থন জানায় ডাবলু।
টুলু বললÑ ছিদ্র অন্বেষণ ওর ধর্ম-কর্ম। দরদ সবাইকে তাড়া দিয়ে বললÑ চল্, এগোই। এ বলেই জলার দিকে পা চালাল। পেছনে ডানপিটে দংগল।
আবর্জনা স্তুপের মাথার উপরে বসে ক্রিকেট বলটা জপ করছে। দরদ এ ঢিবি ও ঢিবি করে যখন বলটা হাতে তুলেছে, ঠিক তখনি ভয়ংকর একটা শব্দে ও কেঁপে ওঠে। গা ছমছম ভয়ে আড়ষ্ট হলেও সবাইকে সাহস যুগিয়ে বলেÑ ভয় নাই, আমি আছি তোদের… কথা শেষ করতে পারে না দরদ। জলার জলে মাতন দেখে ও হাকুপাকু করে বন্ধুদের কাছে নেমে আসে।
জলার জলে পাক লেগেছে। কে যেন ঘড়া খড়া জল শুষে নিয়ে আকাশে ছুড়ে দিচ্ছে। শয়ে শয়ে মাছ দম হারিয়ে জলের ওপর খাবি খাচ্ছে। নজরের নাগালে মাছ দেখে দুটো মাছরাঙা ছোঁ মেরেই বেহাল। কোনো রকমে ছিটকে পালিয়ে এসে তেঁতুলের ডালে বসল। তাদের চোখেও অনুসন্ধিৎসা। বার বার ঠোঁট বাঁকিয়ে জল জরিপ করতে লাগল।
জল পাখি মাছের নাজেহাল অবস্থায় হতবাক বালকের দল এবারে ভয়ে শিউরে ওঠে। দেখে কি, প্রকা- শিংওলা মাথা ওই ভাসমান মাছগুলোকে কপ কপ করে গিলছে। ভাল করে ঠাওর করে দেখে, ওটা প্রকা- একটা সাপ। বুনো, মোষের মত ওদের দিকে তেড়ে আসছে। এবারে দরদের দল রণে ভঙ্গ দেয়।
একছুটে দরদ বন্ধুদের নিয়ে খেলার মাঠের চাঁপা গাছের তলায় এসে বসে। সবাই চুপচাপ। কণ্ঠ দিয়ে স্বর বেরুতে চায় না। তবু দরদই প্রথম মুখ খোলেÑ ভয়ানক বিপদ রে! সাপটা আজ জলা জব্দ করছে। কাল মহল¬া সাবাড় করবে। চল আগে জলার ধারের বাড়ির বাসিন্দাদের সাবধান করি। তারপর আমাদের মহল¬ার কথা ভাবব।
ওরা তোর কথা শুনবে? এই যে তুই ক্লাস এইটে বৃত্তি পেলি। কিন্তু মুচি বলে তার কদরই দিল না। সার্জনের মন্তব্যে দরদ হতাশা বোধ করে। কিন্তু পরক্ষণেই জবাব দেয়Ñ সার্জন, তোর কথা ঠিক, কিন্তু মানুষের কাজ তো মানুষের পাশে দাঁড়ান। ওসব সাতপাঁচ না ভেবে, চল ওদেরকে এই ঘটনাটা জানাই।
দরদের কথা ওরা কেউ ফেলতে পারে না। সবাই দল বেঁধে প্রথমেই গেল নিচতলার সেনবাবুর ফ্ল্যাটে। সেনবাবু দরজা তো খুলল¬ই না; বরং তার ভাতঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় দুকথা শুনিয়ে দিল। দ্বিতীয় তলার বড়–য়া সাহেব ওদেরকে এক রকম ঠেলেঠুলেই নিজের গাড়ির দিকে পা চালাল। ঠিক তখুনি বাড়ির মালিক আহম্মদ সাহেব নিচে নেমেই ওদের মুখোমুখি হলÑ কী ব্যাপার? জটলা কিসের? কী করতে এসেছ তোমরা?
স্যার, আপনার পাশের জলায় একটা ভয়ানক সাপ, জল ওলটপালট করছে।
অংকুরের জবাবে আহম্মদ সাহেব বেজায় চটে যায়Ñ সাপ তো জলজঙ্গলেই থাকে। তোমাদের মতলবখানা কী? চাঁদা তুলতে বেরিয়েছ নাকি?
অবস্থা বেগতি দেখে দরদ উত্তর দেয়Ñ না কাকা, সাপটা বড় খতরনাক, তাই আপনাকে সাবধান করতে এলাম।
সাটআপ বেয়াদব! পুচকে একটি ছেলে আমাকে সাবধান করতে এসেছে। মেরাজ এদের এখুনি এখান থেকে বের করে দে। মেরাজ আসার আগেই ওরা রাস্তায় নেমে আসে। হাঁটতে হাঁটতে দরদ মন্তব্য করেÑ অংকুর, আমরা সর্বনাশের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছি। বিপর্যয়ের আর দেরি নেই।
ওরা তো তা বুঝল না। তুই এতসব ভাবছিস কেন?
তুই আমিও যে বাদ যাব নারে। সাপটা আহম্মদ কাকাদের তো খাবেই; আবার আমাদেরকেও ছাড়বে না।
সার্জন বলেÑ অত ভাবাভাবি বাদ দিয়ে কী করতে হবে তাই বল।
একটা লোহার জাল বানিয়ে সাপটাকে কয়েদ করতে হবে।
ঠিক বলেছিস দরদ, চল আজই কাজে লেগে পড়ি।
ক্রিকেট আর জমল না। শলা-পরামর্শ সারতে সারতেই সন্ধ্যা হয়ে এল। ঠিক হলো সবাই সন্ধ্যার পাঠ সেরে, দরদের বাড়িতে জাল তৈরির কাজে লাগবে।
২.
শেয়ালের হাঁকডাকে সন্ধ্যা ঘন হয়ে রাত নামল। জলার কালো জলে টান পড়ল। জল ঠেলে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল ভয়ানক আজদাহার মাথা। জলের ধারেই কয়েকটা নিশাচর পাখি ফুটফাট করছিল। জল আর আজদাহার শারীরিক ঘর্ষণের দমফাটা শব্দে ওরাও সব একেবারে চুপ। জল ভেঙে বিশাল সরিসৃপ ডাঙায় উঠল। তারপর এগুলো সেনমহলের দিকে। সেনমহলে সেনবাবু তখন একা। পরিজন বায়ু বদলে বাইরে আছে। ঢোপের মুরগিগুলোর সন্ত্রস্ত চিৎকারে সেনবাবুর তন্দ্রা টুটে যায়। টর্চ বাগিয়ে ছুটে আসতে না আসতেই সাপটা মুরগিগুলো চেটেপুটে সাবাড় করে দিল। তারপর সেনবাবুকেও মুখের মধ্যে সুড়–ত করে টেনে নিল।
মুরগি মানুষ গিলে সাপটার শরীরের আকার আরো বেড়ে গেল। আর তার সাথে পাল¬া দিয়ে বাড়তে লাগল রাক্ষুসে খিদে। আরো খাবার চাই, আরো মানুষ। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে ও ওর মাথার ওপরে খাবারের সন্ধান পেয়ে গেল।
আহম্মদ ভবনের পিছনে জলের পাইপ বেয়ে সোৎসাহে এগুতে লাগল বিশালবপু আজদাহা। পেছনে পড়ে রইল সেনবাবুর বন্ধ ফ্ল্যাট।
লক লকে জিহ্বা নাড়াতে নাড়াতে মূর্তিমান বিভীষিকা খিড়কি ভেঙে দোতলার মহলে ঢুকল। বিশ্রী বিটকেল দুর্গন্ধ নাকে লাগতেই দাঁড়ের টিয়েটা ক্যাঁ ক্যাঁ করে উঠলো। কিন্তু তা আর কতক্ষণ! মুহূর্তেই টিয়েটা সাপের পেটে চালান হয়ে গেল।
বড়–য়া সাহেব আর তার বউ, ঠাকুরকে শয়ান দিয়ে যেই বারান্দায় পা রাখলো; অমনি সাপের মুখে। সাপটা টুপ করে বড়ুয়াবউকে মুখে তুলতেই, ও তারস্বরে চিৎকার করতে করতে ক্রমান্বয়ে সাপটার প্রকা- হাঁ-এর মধ্যে হারিয়ে যেতে লাগলো। তা দেখে বড়–য়া সাহেব উদ্ধশ্বাসে ছুটে গিয়ে ছেলে অমলকে ডাক দিতেই, অমল তড়িঘড়ি বাইরে এসেই আঁৎকে উঠলো। ততক্ষণে বড়ুয়া সাহেবও সাপের মুখে। রাগে ক্ষোভে অমল একটা বটি নিয়ে সাপটার দিকে তেড়ে গেল। কিন্তু লেজের বাড়িতে মেঝের উপর ছিটকে পড়লো সে। ত্রাসে তটস্থ অমল পড়িমরি করে দৌড় দিল তেতলায় আহম্মদ সাহেবের বাড়ির দিকে। পেছনে ক্ষুধার্ত অহিরাজ।
আহম্মদ ভবনের মালিক তখন মধ্যরাতের টক্শো দেখতে ব্যস্ত। কড়ানাড়ার প্রচ- শব্দে বড্ড বিরক্ত আহম্মদ সাহেব দরজা খুলে দেখে অমল।
এত রাতে, কী দরকার? সকালে আসলেই তো পারতে?
ন্না, সাপ!
সাপ তো তাড়িয়ে দাও। রাত দুপুরে উৎপাত! কথা শেষ করে দরজা বন্ধ করার জন্য আহম্মদ সাহেব কপাটে হাত রাখতে গিয়েই আচমকা এক ধাক্কায় মেঝেতে উল্টে পড়ে যায়। সভয়ে তাকিয়ে দেখে অমল সাপের গালে ঝুলছে। আহম্মদ সাহেব প্রাণভয়ে দৌড় লাগায়; কিন্তু সাপটা মুহূর্তেই তাকে মুখের মধ্যে পুরে নিল। একে একে আহম্মদ সাহেবের পাঁচ ছেলেকে গিলে একটা লম্বা ঢেকুর তুলল। তারপর হেলে দুলে আহ্লাদে নিচে নামতে নামতে হঠাৎ তার কানে ভেসে এল একটা ভয়ানক ধাতব শব্দ। কারা যেন বিশাল কোন লোহার বস্তু গড়িয়ে গড়িয়ে আনছে।
ধাতব শব্দ ছাপিয়ে একটা কলরব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, বড় হচ্ছে। ভয়ঙ্কর সরিসৃপটা থমকে দাঁড়াল। তারপর কালবিলম্ব না করে জলার দিকে তার চলার গতি বাড়িয়ে দিল।