মউনটেন ফুজি-ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের এক অপার আনন্দঘন মুহূর্ত

আপডেট: জুলাই ৩, ২০১৭, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

ড. সুলতানা নাজনীন


৩১ ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ সাইকোলজিতে অংশ নিতে সপরিবারে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের বিমানে জাপানের নারিতা এয়ারপোর্টে যাত্রা করি। ২৪ থেকে ২৯ জুলাই ছয় দিনব্যাপি সাইকোলজিকাল কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় জাপানের ইয়োকহোমার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে।
এই মনোবিজ্ঞান সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল উরাবৎংরঃু রহ ঐধৎসড়হু, রহংরমযঃং ভৎড়স চংুপযড়ষড়মু. ৯৬টি দেশ থেকে ৮০৬০ জন মনোবিজ্ঞানী এই কংগ্রেসে অংশ নেন।
এই সম্মেলনে স্বামী, ছেলে মেয়েসহ  অংশ  নেয়ার সৌভাগ্য হয় আমার।
জাপানের টোকিও শহর থেকে ১০০ কি.মি দূরে অবস্থিত মাউটেন ফুজি পৃথিবীর জীবন্ত আগ্নেয়গিরির একটি। সাধারণভাবে যা ফুজি স্যান (ঋঁলর ঝধহ) নামে পরিচিত এর সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ৩,৭৭৬ মিটারস। এই জীবন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে শেষ উদগিরণ হয়েছিল ১৭০৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
ঊষবাধঃরড়হ    : ১২,৩৮৮, খধংঃ ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ: উবপবসনবৎ ১৬, ১৭০৭, চৎড়সরহবহপব: ১২,৩৮৮, ঋরৎংঃ অংপবহঃ: ৬৬৩ অউঊধংরবংঃ জড়ঁঃব : ঐরশরহম চবড়ঢ়ষব ধষংড় ংবধৎপয ভধৎ ঠরবি ১০+সড়ৎব
এই পর্বতটি ুধসধহধংযর এবং ঝযরুঁড়শধ এর মধ্যবর্তী বর্ডারে অবস্থিত এবং রাজধানী টোকিও ও ইয়োকোহোমা থেকে পরিষ‹ার আকাশ সমৃদ্ধ দিনে বহু দূরে খালি চোখে দেখা যায়।
মাউনটেন্ট ফুজি দেখার আর একটি সহজ উপায় হলো, টোকিও ও ঙংধশধ’র মধ্যে ট্রেন ট্রিপের সময়। বেশি ভাগ সময় মাউন্ট ফুজি চোখে দেখার ক্ষেত্রে মেঘ বাধা হয়ে দাঁড়ায়- যদি ফুজি খালি চোখে পরিস্কার দেখতে পাওয়া যায় তা হবে কারও জন্য অতি সৌভাগ্যের ব্যাপার। সামার সিজনের চাইতে শীত সিজনে এবং দিনের মধ্যভাগের চাইতে খুব সকাল ও বিকালের দিকে ফুজির ারংরনরষরঃু বেশি থাকে।
যদি কেউ মাউন্ট ফুজির পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে চায় তবে তাকে, ফুজিগোকো রিজিওনে অর্থাৎ ফুজির উত্তর সীমার পাদদেশ কোন (হট স্প্রিং) গরম পানির ঝর্ণা সমৃদ্ধ রিসোটর্  থেকে দেখতে যেতে হবে। ফুজি মাউন্টেনের সবচাইতে সুন্দর ছবি উপভোগ করা যাবে ঝযরহ-ঋঁলর ঝঃধঃরড়হ এর ট্রেনের ডান পাশের দিক থেকে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের ট্রেন জার্নির সময়।
আসল মাউন্টেন ফুজির পাশে রয়েছে, গড়ঁহঃ কবহধংযর – ৬,৪৪৪, গড়ঁহঃ ঞধশধড়- ১৯৬৫, গড়ঁহঃ ঞংঁৎঁমর- ৯,৮৩৯, গড়ঁহঃ করংড়শড়সধ-৯,৬৯৮, গড়ঁহঃ করঃধ- ১০,৪৭৬
আমরা কনভেনশন সেন্টার থেকে ২য় দিনে সকালে বাসে করে ওড়াওরা স্টেশনে পৌছি।
গ্রেট মাউন্ট ফুজি দেখার জন্য আমরা ওডাওরা স্টেশন থেকে ৯০০০ ণ দিয়ে হাকোনে ফ্রি পাস জোগাড় করি। হাকোনে সেই স্থান যেটি অনেক কিছুর কানেকটিং পয়েন্ট। রেলপথের জংশনে যেমন অনেক ট্রেন অনেক লাইনের সংযোগ ও সমন্বয় ঘটে তেমনি হাকোনে অনেক যাতায়াত ব্যবস্থার সংযোগ ও সমন্বয় স্থান। হাকোনে থেকে গ্রেট মাউন্ট ফুজি যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা হাকোনে তোজা ট্রেনে রওনা হই তখন জাপানের সময় সকাল প্রায় ১০টা। হাকোনের অধো মেঘলা আকাশে তখন সূর্যের আলোর উঁকিঝুকি। এই হাকোন টোজান ট্রেন (ঐধশড়হব ঞড়ুধহ ঞৎধরহ) টি ওডাওড়া (ঙফধধিৎধ) থেকে যাবে হাকোন ইয়েমোটো স্টেশন আবার ইয়োমোটো থেকে গোরায়। ঐধশড়হ জাপানের সবচেয়ে পরিচিত ট্যুরিস্ট এরিয়া, যেখানে এসে ভ্রমণ পিপাসুরা সারাবছর মাউন্ট ফুজির ইতিহাস, কৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
ঙফধশুঁ ইলেক্ট্রিক রেলওয়ে স্টেশন থেকে চারজনের জড়ঁহফ-ঃৎরঢ় ঃৎধাবষ ঃড় ঐধশড়হব ড়হ ঙফধশুঁ টিকেট কেটে আমরা রওনা হই। জড়ঁহফ-ঃৎরঢ় ঃৎধাবষ ঃড় ঐধশড়হব ড়হ ঙফধশুঁ খরহব এই ট্রিপটি এমন ছিল ঐধশড়হব ঞড়ুধহ খরহব, ঐধশড়হব ঞড়ুধহ ইঁং,ঐধশড়হধ ঃড়ুহধহ ঈধনষবপধৎ, ঐধশড়হধ জড়ঢ়বধিু, ঐধশড়হব ঝরমযঃংববরহম ঈৎঁরংব, ঙফধশুঁ ঐধশড়হধ ঐরমযধিু নঁং . এভাবে আমরা পুরো ফুজি ভ্রমণ উপভোগ করি।
কেবল কারের স্টার্টিঙে ঘটাং ঘটাং শব্দ করে শুরু করলো যাত্রা। দূর্গম পাহাড়ি পথে ইলেকট্রিক তারে ঝুলে কেবল কারের যাত্রা শুরুটা বোধ হয় এমনই হয়। মনে পড়ে যায়, ৯৫ সালে মালয়েশিয়ায় এমন কেবল কারে জীবনে প্রথম উঠেছিলাম তা ছিল খুবই কম উচ্চতার পাহাড়ের উপর আরোহণ।
আমরা যখন কেবল কারে ফুজি দেখার লাস্ট স্টেশনে পৌঁছে গেলাম তখন কেন যেন আমার খুব ভয় হতে লাগলো। চারিপাশে আকাশ ছোঁয়া পর্বতমালা, কোথাও রোদের ঝিলিক, কোথাও পাহাড়ের ছায়া। কেবল কারে উঠার সময় ট্যুর অপারেটর সবার হাতে ভেজা ছোট ছোট টাওয়েল রুমাল দিল। সে সময় ফুজির আসেপাশের কিছু পাহাড়ে ভলকানাইজিং শুরু হয়েছে। বিষাক্ত সালকার মিশ্রিত ধোয়ায় কেউ যেন অসুস্থ হয়ে না পড়ে- নাকে চোখে ব্যবহারের জন্য এই সতর্ক ব্যবস্থা। শেষ স্টেশনে পৌঁছার আগ দিয়ে সেই ভয়ংকর ধোয়ার উদগিরণ লক্ষ্য করা গেল কেবল কারের মধ্যে শুধু স্বামী ছেলেমেয়েসহ আমরা চার জন। অন্য লাইনে অন্য কেবল কার ইলেক্ট্রিক তার বেয়ে নেমে আসছে। আমাদের ক্রস করলো বেশ কয়েকটি কেবল কার। এখানে ওভারটেকের কোন সিস্টেম নাই।
এয়ার টাইট কাচের মোটা জানালা দরজা বেষ্টিত চালকহীন কেবল কারে কখনও বসে, কখনো ছবি তুলে, কখনও ভিডিও করে আমরা যে অপার আনন্দ উপভোগ করলাম তা বর্ণনার ভাষা আমার নেই। এত উঁচু পাহাড় পর্বত বেষ্টিত কেবল কারে কখনো কখনো মনে হলো আমি মহাশূন্যে ঝুলে আছি। ১৭০৭ সালে শেষ এই জীবন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে উত্তপ্ত লাভার উদগিরণ হয়েছিল- সে মতে যে কোনো দিন যে কোনো সময়ে ফুজি থেকে উদগিরণ হতে পারে। তখন কী হবে আমাদের অবস্থা যদি এ মূহুর্তটি হয় সে মহাপ্রলয়ংকর মূহুর্ত। ভাবতে যেয়ে ভাবনার সূতোটা ছিঁড়ে যায়। অবাক বিস্ময়ে দেখি মাউন্ট ফুজির কেবল কারের উঠতি পথে এই দূর্গম পাহাড় কেটে সমতল ভূমি করে গলফ খেলার কোট করা হয়েছে। রয়েছে ছোট ছোট কটেজ ও গেস্ট হাউজ। পাহাড়ি সৌন্দর্যের অপার ভূমিতে নাম না জানা ফুলের সমারোহ। সব শেষে শেষ স্টেশন ছুঁয়ে আবার ফিরতি যাত্রা। সুদীর্ঘ পথ পরিক্রম করে আবার কখন ফিরে এলাম নিচে- সমতল ভূমিতে। শুধু লাখ শুকরিয়া আদায় করলাম সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে। এই সৌন্দর্য শুধু মহাবিস্ময়কর নয়, ভয়ংকর সৌন্দর্য অর্থাৎ প্রতি মূহুর্ত প্রলয়ের সম্ভাবনা একেবারেই নাকোচ করে দেয়া যায় না। মাউন্ট ফুজি দেখার সৌভাগ্য জাপানে যারা বসবাস করেন তারাও অনেকে পান না। জীবনের সায়ান্তে এসে এ এক ভয়ংকর সৌন্দর্য উপভোগের সৌভাগ্য আমার।
এর নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে আমরা ইয়োকোহোমার কেন্দ্রে অবস্থিত জাল ইন্টার ন্যাশনাল হোটেলে ফিরে আসি তখন জাপানের ঘড়িতে রাত ১০ টার কাঁটা ছুঁই ছুঁই করছে। ক্লান্ত স্মৃাতিমধুর একটি দিনের উপহার ইতিহাস সাক্ষি হয়ে রইলো বাঙালি একটি পরিবারের জাপানের বিশ্ববিখ্যাত মাউন্ট ফুজি দেখার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়ে।
লেখক: চিকিৎসক