মধুসূদন বারবার ফিরে আসবেন

আপডেট: জানুয়ারি ২৫, ২০২২, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

মাইকেল মধুসূদনের জন্মভিটা সাগরদাঁড়ির দত্তবাড়ি

গোলাম কবির


মহাকবি মধুসূদন বঙ্গভূমির প্রতি কবিতায় দেশমাতৃকার কাছে আকুল প্রার্থনা জানিয়েছিলেন:
‘রেখো, মা, দাসেরে মনে,/ এ মিনতি করি পদে।’ (বিবিধ কাব্য, মাইকেল রচনাবলী, ১ম ভাগ পৃষ্ঠা-২) আবার সুদূর প্রবাসে মাতৃভূমির জন্য ব্যাকুল কবি নানা বিষয় ও ব্যক্তির সাথে স্মরণ করেছেন ‘কপোতক্ষ নদ’ সনেটে স্বদেশকে। নদের কাছে কবির বিনীত অনুরোধ, কপোতাক্ষ যতদিন সাগরবক্ষে নিজেকে নিবেদন করে যাবে, ততদিন যেন বঙ্গবাসীর কানে কানে তাঁর দেশপ্রেমের কথা কলধ্বনিতে ব্যক্ত করে যায়।

আজ কপোতাক্ষ মৃতপ্রায়। কে জানে, একদিন হয়তো নদীর নামটি বিস্মৃত ইতিহাস হয়ে যাবে! যেমন অনেক নদী বাংলার ভূখণ্ড থেকে হারিয়ে গেছে। ‘ধলেশ্বরী নদী তীরে পিসিদের গ্রাম’ কথাগুলো হয়তো অনাগতকালের বাঙালি পাঠক মনে রাখবে, তবে ধলেশ্বরীর অস্তিত্ব ততদিনে বিলীন হয়ে যাবে। কপোতাক্ষ কিংবা ধলেশ্বরী কালের করাল গ্রাসে হারিয়ে গেলেও মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ মহাকালের পৃষ্ঠায় অক্ষয় হয়ে থাকবেন।

মধুসূদনের প্রার্থনা ছিলো বাংলা ভাষাভাষি মানুষ যেন তাঁকে ভুলে না যায়। না, ভুলিনি আমরা। যদিও কবির প্রিয় কপোতাক্ষ নদ অদূর ভবিষ্যতে বিস্মরণের পথে চলে যাবে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি মধুসূদন কে ‘ভুলি কেমনে’! অবশ্য আমাদের প্রায় সব স্মরণোৎসব কেবল আড়ম্বরের। তাই বা কম কিসের! আজ পঁচিশে জানুয়ারি তাঁকে স্মরণ করতে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্ম শুভক্ষণকে প্রণতি জানাই।

উনিশ শতকে গোড়ার দিকে নগর কলকাতায় উদীয়মান ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের উজ্জীবনের কালে মধুসূদন রূপকের অন্তরালে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে ক্ষমতাদখলকারী বৃটিশদের স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন শ্রীলংকার স্বাধীনতা হরণের বাল্মীকি কথিত রামায়নকে সামনে রেখে। ‘মেঘনাদবধ’ রচনার প্রায় শতবর্ষ আগে মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজের পরাজয় ও বাংলার স্বাধীনতা হরণকে মধুকবি সেই সূত্রে গেঁথেছেন। আমরা ১৯৭৫ সালের মোস্তাক আহমদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের শিকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাযজ্ঞকে যদি বিভীষণ কিংবা মিরজাফরের অপকর্মের সাথে মিলাই তবে দেখবো, কী আশ্চর্য ইতিহাসের চিরন্তন মিল। চক্রান্তকারীরা চেয়েছিলো রক্তের দামে অর্জিত বাংলাদেশকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে। পারেনি।

কারণ স্বাধীনচেতা দেশমেপ্রমিক বাঙালি স্মরণ কালের ইতিহাসে একদা বিদ্রোহের যে বীজ বপণ হয়েছিলো তার ফল আমরা কালে কালে প্রত্যক্ষ করেছি। মনসা-মঙ্গল কাব্যের কবি কানা হরিদত্তকে দেখা গেছে প্রথাবিরোধী বিদ্রোহ করতে। তারপর চণ্ডীদাস ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ বলে দেবতা আকীর্ণ-বাংলাদেশের মানুষকে সচকিত করেছেন। এতসব প্রতীকী বিদ্রোহের সুরের সাথে মধুসূদনের বিদ্রোহকে আমরা সহজে পৃথক করতে পারি।

মধুসূদন দীর্ঘকালের বাঙালির বিশ্বাস ও সংস্কারের মূলে আঘাত হেনেছেন মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে। বাল্মীকি সৃষ্ট অবতার রামচন্দ্রকে তিনি মানবীয় দোষে-গুণে উপস্থাপন করেছেন। সামাজিক, ধর্মীয় ও অবস্থানগত সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা তিনি সচেতন ভাবে পরিহার করতে চেয়েছেন, বর্তমান বিশ্বে যা অতীব জরুরি।

ইংরেজিসহ কয়েকটি বিদেশিভাষায় ব্যুৎপত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি ‘বঙ্গভাণ্ডারের রত্নরাজিকে অতুল করার সাধনায় নিষ্ঠ ছিলেন। তিনি ‘বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী’ বিদ্যাসাগরের ‘অক্ষয় মনুষ্যত্বে’-র স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে সনেটে যে যশোগাথার মনুমেন্ট নির্মাণ করেছিলেন তার তুলনা খুব বেশি নেই।

মধুসূদন অনন্য দেশপ্রেমিক এবং জীবনাগ্রহী। তিনি জানতেন ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’। তাই একবারের জীবনকে তিনি আকণ্ঠ পান করতে চেয়েছিলেন। সমকাল এমনকি বর্তমানেও বলা হয়; তিনি অস্থির মানসিকতার জন্য এবংবিধ আচরণে অভ্যস্থ হয়েছিলেন। এরিস্টটল মনে করতেন মহৎ প্রতিভাবান মানুষ কিছুটা পাগলাটে হন।

আমরা মনে করি তখনকার পরাধীন, সমাজ ও জীবনে তিনি কেবল ‘আশার ছলনে’ ভুলেছেন। আর সেই ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে তিনি জীবনের ঋণ-শোধ করেছেন। ‘আত্মবিলাপ’ কবিতায় যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনের একটি পর্যায় উন্মুক্ত করতে গিয়ে উচ্চারণ করেছেন: ‘যশোলাভ লোভে আয়ু কত যে ব্যয়িলি হায় কব তা কাহারে।’ মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ’ কাব্য প্রকাশের অনতিকাল পরে সেটি পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়। বালক রবীন্দ্রনাথ ছেলেবেলায় তা পড়েছিলেন। প্রথমদিকে মহাকাব্যের ব্যাকরণের কথা মাথায় রেখে অনন্যসৃষ্টি ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের বিরূপ সমালোচনা করেন। তবে পরিণত বয়সে এর অসামন্যতাকে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করে নেন। যদিও বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথের পূর্বের সমালোচনাকে যথার্থ মনে করেছিলেন। এতে অন্তর্যামী বোধকরি অলক্ষে হেসেছিলেন। তাইতো মধুসূদনের কবিতা দীর্ঘকালের ব্যবধানে অমলিন আছে এবং সগৌরবে পাঠ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

আমরা মধুসূদনকে স্মরণ করছি, বাঙালির প্রতি বাংলাভাষার প্রতি তার অবিস্মরণীয় অবদানকে শ্রদ্ধা জানাতে। আত্মবিস্মৃত বাংলার মানুষ তাঁকে যথার্থ সম্মান দিতে একদা কুণ্ঠিত হয়েছে। আমরা সে পথে যাবনা। তাঁকে স্মরণের মাধ্যমে সর্বজনীন মাতৃভাষা প্রীতি এবং বাংলার সংস্কৃতিকে আগলিয়ে রাখবো, তা সে মধুমেলার আয়োজনে হোক, কিংবা তার কীর্তির বিষয়গুলো পাঠ করে। মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর ছন্দ অনুকরণ করতে গিয়ে অনেকে হাসির পাত্র হয়েছেন। আবার প্রহসনদ্বয়ে তৎকালীন কলকাতার প্রমিত গদ্য ব্যবহার করে হুতমপ্যাঁচার নক্সার লেখক কালিপ্রসন্ন সিংহের প্রভাবিত হয়েছেন, এখন সেই চলিত গদ্য বাঙালির সকল ভাবনা বহন করছে। আজ তাকে স্মরণের ভেতর দিয়ে আমরা সেই ঋণ শোধের চেষ্টা করে যাব। জয়তু দত্তকুলোদ্ভব মধুসূদন দত্ত।
লেখক: সাবেক শিক্ষক রাজশাহী কলেজ