মনুষ্যত্বের বিনাশ অভিপ্রেত নয়

আপডেট: অক্টোবর ২৩, ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

আব্দুল মজিদ:


মনুষ্যত্বের উপস্থিতিই মানুষকে সৃষ্টির সেরা বা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর সে জন্যই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে হলে মনুষ্যত্বের বিনাশ নয় বরং তা ধারণ ও লালন করতে হবে নিরবচ্ছিন্নভাবে। মানুষ সামাজিক জীব। জীবন ও জগতের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা তথা সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে হলে অর্থের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য এবং তা অর্জনও করতে হবে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এটি মানুষকে তখনই প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে যখন সে তার গ্রহণযোগ্য অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে অর্থের পেছনে হন্যে হয়ে ছোটে এবং মনুষ্যত্বকে বিকিয়ে দেয় অবলীলায়। ফলে তখন তার কাছে নিয়ম নীতি আদর্শ সবই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। যেনতেন প্রকারে অর্থ উপার্জনই হয়ে পড়ে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। এবং তা করার জন্য এমন কোন হীন কাজ নেই যা করতে সে পিছপা হয়। এমনতরো অবস্থায় অনেক সময় সে ন্যায় অন্যায় হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হয়ে পড়ে। অর্থলিপ্সা তার ঘুম কেড়ে নেয়। চিন্তা যায় বেড়ে। একের পর এক সম্পদের পাহাড় গড়তে থাকে। মাদকাসক্তের ন্যায় অর্থাসক্ত হয়ে জনমানুষের অধিকার তথা সমাজের প্রতি দায় দায়িত্বের কথাও বেমালুম ভুলে যায়। মানুষ অর্থ উপার্জন করবে তবে সে ব্যাপারে অবশ্যই বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনেই তা করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে প্রক্রিয়ায় সে অর্থ উপার্জন করবে তা বৈধ কী না। বৈধ পথে অর্থ উপার্জনে কোনো বাধা নেই। তবে তা মানুষকে ঠকিয়ে, প্রতারণা করে, বিপদে ফেলে, দায়িত্বে ফাঁকি দিয়ে বা সেবার নামে মানুষকে কষ্ট দিয়ে অন্যায়ভাবে উপার্জন করা কোনোক্রমেই বিধিসম্মত নয় বরং সেটাকে বলা যায় রীতিমতো পাপের কাজ।
মানুষ প্রায়শই একটি সরল সত্য জিনিস ভুলে যায় আর তা হলো মানুষ ন্যায় অন্যায়ভাবে যা কিছু আয় উপার্জন করে তার কতটুকু সে ভোগ করতে পারে বা করে। অন্যায়ভাবে বা মানুষকে কষ্ট দিয়ে সম্পদ গড়লো অথচ ভেবে দেখলো না যে সে কী করলো! সে-তো নিজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করে ফেললো।
উপার্জিত অর্থের ব্যবহার বা ভোগ করার নিশ্চয়তা আছে কি? যদিওবা থেকেও থাকে তবে তা কতটুকু?
তাহলে কেন এত হা পিত্যেস, কেন এত হাহাকার, কেন এত লোভ? কেন এত অন্যায়? আর সবচেয়ে বড় কথা হলো মানুষের ওপর জুলুম করে যাদের জন্য সম্পদ গড়লো তারা কি তার অন্যায় বা পাপের ভাগ নেবে? দায় স্বীকার করবে? বরং সে বুঝে হোক বা না বুঝে হোক অথবা লোভের বশবর্তী হয়ে যে অন্যায় করলো তার শাস্তি তাকেই ভোগ করতে হবে। কারণ মজলুমের ফরিয়াদ সাধারণত বিফলে যায় না। আশ্চর্যের বিষয় হলো অন্যায়কারী এসব নিয়ে খুব একটা ভাবে বলে মনে হয় না। অনেকে হয়তো অর্বাচীনের মতো ভাবে, যাক কী আর হবে! শেষ সময়ে যেয়ে অর্জিত অর্থের কিছু অংশ দান খয়রাত করবো, হজ্ব করবো, কোরবানি করবো, দ্বীন ধর্মের পথে ব্যয় করবো যাতে করে পাপের বোঝা হালকা হবে। বেহেশত নসিব হবে। সুখে শান্তিতে থাকবো পরকালে। সুতরাং যা ইচ্ছা তাই করো ইহকালে। আরে! বাছাধন জীবন অত সোজা না। এমন মিথ্যে শান্ত¦না দিয়ে মনকে বুঝিয়োনা। শেষ রক্ষা হবেনা। কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই। তুমি বহু মানুষের হক নষ্ট করেছো। অনেক মানুষকে কষ্ট দিয়েছো। এজন্য সকল নির্যাতিত মানুষের কাছে তোমার ক্ষমা চাইতে হবে। কিয়ামতের ময়দানে মানুষ তোমাকে ক্ষমা করবে না।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রত্যেক মানুষ বা প্রত্যেক জাতি তার বা তাদের নিজ নিজ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর তাই প্রত্যেক সংবেদনশীল মানুষ কাউকেও তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনে কোনরূপ বাধার সৃষ্টি করবে না। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, হানাহানি, মারামারি, সম্মান হানিকর কোনো কার্যক্রম বা কোনো ধরনের অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিবেনা। সম্প্রতি ধর্ম বিষয়ক যে ন্যক্কারজনক ও দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল তা রীতিমতো অনভিপ্রেত এবং নিন্দার্হ। একমাত্র মনুষ্যত্ববিবর্জিত মানুষই এ ধরনের নেতিবাচক ঘটনার প্রশ্রয় দিতে পারে। প্রকৃত জ্ঞানী গুণী বা ধার্মিক ও মনষ্যত্বসম্পন্ন মানুষ এগুলো সমর্থন করতে পারেনা। মনুষ্যত্বের অবমাননা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তুমি নিশ্চিত থাকো পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা পুতপবিত্র। তিনি তোমার নিকৃষ্ট কর্মকা- কখনোই বরদাস্ত করবেন না। তাঁর জাত বা সত্তা ও বৈশিষ্ট্য বা সিফাতের সাথে খারাপ কাজগুলো কখনোই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তুমি কিছু মানুষকে হয়তো বোঝাতে পারো,স্বার্থান্ধকে মুগ্ধ করতে পারো কিন্তু মহা ক্ষমতাধর সৃষ্টিকর্তাকে প্রলুব্ধ করতে পারবে না কারণ তিনি অভাবী নন। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি দয়ালু দাতা মেহেরবান, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দায়িত্ব, পদমর্যাদা, সম্মান পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নিয়ামত। তুমি কী ভেবে দেখেছো হে বৎস্য! এটা কার জন্য নিয়ামত? এটা ওই ব্যক্তির জন্য যে নিজ দায় দায়িত্বকে পবিত্র আমানত মনে করে পরম নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করে। মনুষ্যত্বের ঝা-া সকল সময়ে উড্ডীন রাখার চেষ্টা করে। মানুষের কষ্টের বা দুঃখের কারণ না হয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটায়। পণ্যের যোগান থাকলে সঠিকভাবে বাজারজাত করতে সচেষ্ট থাকে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেনা। অতি মুনাফার লোভে মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা করেনা। চিকিৎসার নামে মানুষকে নাস্তানাবুদ করেনা। শিক্ষার নামে জনমানুষের মনে বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মনে কুশিক্ষার বীজ বপন করেনা। বরং তাদেরকে সৎ, সুন্দর, মহৎ সর্বোপরি ভালো মানুষ হওয়ার প্রেরণা জোগায়।
যাহোক দিনশেষে বলা যায় সমাজে ভালো মানুষের কদর এখনও রয়েছে। যার ফলে দেখা যায় এখনও এই ভালো মানুষগুলোকে সবাই মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। এঁরা আছেন বলেই সমাজে শান্তির সুবাতাস বয়। সামাজিক স্থিতি ও স্বস্তির পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়। তবে সমাজ বিনির্মাণে যাঁরা ভূমিকা রাখেন তাঁদের নানা রকম ঝক্কিঝামেলা, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। এতকিছুর পরেও তাঁরা বসে থাকেন না এবং পিছপাও হননা। বরং বলা যায় নানা ধরনের বিপত্তির মুখেও তাঁরা এগিয়ে চলছেন বিধায় এখনও সমাজে (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) বড় ধরনের কোনো ছন্দপতন ঘটেনি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো কাজ, ভালো চিন্তা ভাবনা করতে চায়। তারা কাজ করে দেখাতে চায়। তাদের সেই শক্তি সাহস উদ্যম রয়েছে যা কাজে লাগাতে হবে এবং তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে সংশ্লিষ্ট সকলের পূর্ণ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মের সৎসাহসকে বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি করা তথা মনুষ্যত্বের বিকাশে যা যা প্রয়োজন তার সবটুকুই করতে হবে তাহলেই সমাজ থেকে অশুভ সবকিছুই দূর হবে। সমাজে সার্বিক স্বস্তি বিরাজ করবে যেখানে নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে আত্মবিশ্বাসের সাথে তৈরি হবে প্রাণময় পরিবেশ।
লেখক : প্রাক্তন ছাত্র ও শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।