মনোনয়নের দৌড়ে আ’লীগ নেতারা, নিরব বিএনপি । । রাজশাহীতে জেলা পরিষদ নির্বাচন

আপডেট: নভেম্বর ২৪, ২০১৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহীতে জেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদনও নিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডে। তবে বিরোধীপক্ষ বিএনপি এখনো নিরব। প্রস্তুতি যেটুকু রয়েছে তা ভেতর ভেতর। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীতা নিয়েও রয়েছে সংশয়। ইতোমধ্যে  দেশজুড়ে আসন্ন এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামি ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচন।
এদিকে রাজশাহী আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত শুক্রবার (১৮ নভেম্বর) ছিলো জেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন জমা দেয়ার শেষ দিন। ওই সময়ের মধ্যে রাজশাহীর ১৪ জন প্রার্থী তাদের আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন।  এরা হলেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জিনাতুন নেছা তালুকদার, জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ও আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য মাহবুব জামান ভুলু, আওয়ামী লীগ নেতা ও রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মোহাম্মাদ আলী সরকার, মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শফিকুর রহমান বাদশা, জেলা কৃষকলীগের সভাপতি রবিউল আলম বাবু, আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খান, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আব্দুস সামাদ, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক লায়েব উদ্দিন লাভলু, আওয়ামী লীগ নেতা শরিফুল ইসলাম শরিফ, শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নুর কুতুব আলম মান্নান, নাসির উদ্দিন বিদ্যুৎ, চারঘাট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফকরুল ইসলাম ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলফোর রহমান।
জানা গেছে, দলীয় মনোনয়ন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা শুরু করেছেন জোর তদবির। চলছে গ্রুপিং লবিংও। তবে এ দৌড়ে অনেকখানি এগিয়ে জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ও আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য মাহবুব জামান ভুলু। অনেকেরই ধারণা, তিনিই দলের প্রার্থী হবেন। দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদি মাহবুব জামান ভুলু নিজেও।
তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময় তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে দায়িত্বপালন করেছেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। প্রাণ সঞ্চার করেছেন রাজশাহী আওয়ামী লীগে। তারই মূল্যায়ন হিসেবে বিগত সময়ে তাকে জেলা পরিষদ প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এবার তিনি নির্বাচিত হয়ে আসতে চান। তার বিশ্বাস তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হয়ে জেলা পরিষদে আসবেন।
তবে কেউ কেউ বলছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীয় জিনাতুন নেসা তালুকদার দলীয় মনোয়ন পেতে পারেন। কারণ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হবার পরে তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন। একারণে তৃণমুল থেকে দলের হাইকমান্ড পর্যন্ত রয়েছে তার ক্লিন ইমেজ। একারণে তাকে দলের মনোনয়ন  দেয়া হকে পারে বলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করছেন।
শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নুর কুতুব আলম মান্নান দীর্ঘদিন থেকে নেতাকর্মীদের পাশে রয়েছেন। সৎ ও পরিশ্রমী হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কা-ারি তিনি। এসব দিক বিবেচনায় এনে তাকে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে বলে আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমাকে মনোনয়ন দিলে একটি স্বচ্ছ ও দুর্র্নীতিমুক্ত জেলা পরিষদ জনগণকে উপহার দিতে চাই। পাশাপাশি আগামি জাতীয় নির্বাচনের জন্য এ অঞ্চলে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করা চাই।
জেলা কৃষকলীগের সভাপতি রবিউল আলম বাবুর প্রতিও রয়েছে নেতাকর্মীদের ইতিবাচক ধারণা। তারা বলছেন, ছাত্র রাজনীতি থেকে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেছেন বাবু। এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং চারদলীয় জোটের নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। পর পর দুইবার জেলা কৃষকলীগের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। জেলায় আওয়ামী লীগ এবং কৃষকলীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার পেছনে বাবুর অবদান রয়েছে। এসব বিষয়গুলো বিবেচনা করে হাইকমান্ড বাবুকে মনোনয়ন দিতে পারে।
আওয়ামী লীগ নেতা ও রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ আলী সরকার দলের কাছে মনোনয়ন চেয়েছেন। তিনি বলেন, আমি চেম্বারের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে রাজশাহীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করেছি। বর্তমানেও তা অব্যাহত আছে। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে এবং নির্বাচিত হলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে রাজশাহীর উন্নয়নে কাজ করবো।
জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আবদুস সামাদের ব্যাপারেও ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে নেতাকর্মীদের। তারা বলছেন, ছাত্রলীগ থেকে শুরু বর্তমানে আওয়ামী লীগের এখন অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তাকে মনোনয়ন দেয়া হলে এবং তিনি নির্বাচিত হলে জেলার উন্নয়ন তরান্বিত হবে।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, রাজশাহীর ১৪ জন  নেতা দলীয় মনোনয়ন পেতে আবেদন জমা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে দলের মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে এসব আবেদন যাচাই বাছাই হয়েছে। চলতি মাসের শেষে অথবা ডিসেম্বরের শুরুতেই এদের মধ্য থেকে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। যোগ্য প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ।
তিনি আরো বলেন, আসন্ন এ  নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। এনিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্য বেড়ে গেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে একাট্টা হয়ে কাজ করবেন সবাই।
তবে আওয়ামী লীগ শিবিরের উল্টো চিত্র বিরোধীপক্ষ বিএনপিতে। এনিয়ে প্রকাশ্যে কোন প্রস্তুতি নেই দলটির।  এ নির্বাচনে দল অংশ নেবে কি না এনিয়ে ও নিশ্চিত নন নেতারা। তবে কেউ কেউ প্রার্থী হতে পারেন এমন খবর রয়েছে। জেলার চারঘাট উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু সাঈদ চাঁদ চেয়ারম্যান পদে লড়তে পারেন বিএনপির হয়ে। কিন্তু বিষয়টি নিশ্চিত করেননি এ বিএনপি নেতা।
কয়েক দফা যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাদিম মোস্তফাকে। তবে জেলা বিএনপির দফতর সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন জানিয়েছেন, নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এটি তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। দলীয় সিদ্ধান্ত হলে দল থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হবে।
জেলা নির্বাচন দফতরের হিসেবে, রাজশাহীতে জেলা পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোটার ১ হাজার ১৭২। এর মধ্যে রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ৪১জন, নয় উপজেলা পরিষদে ২৬জন, ১৪ পৌরসভায় ১৮২জন এবং ৭১ ইউনিয়ন পরিষদে ৯২৩জন। একজন চেয়ারম্যান, ১৫জন সাধারণ ও পাঁচ জন সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত করবেন ভোটাররা।
এদিকে ভোটের হিসেবে, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও নয় উপজেলা পরিষদে বিএনপির ভোটার বেশি। তবে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে অধিকাংশই আওয়ামী লীগের ভোটার। ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা বেশি। আর তাই আসন্ন এ নির্বাচনে ভেবে চিন্তে মাঠে নামছে বিএনপি ও তার রাজনৈতিক মিত্রদলগুলো।
রাজশাহী জেলা পরিষদ সূত্র জানিয়েছে, ২০১১ সালের শেষের দিকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন মাহবুব জামান ভুলু। গত ছয় অর্থ বছরে রাজশাহী জেলা পরিষদে বরাদ্দ এসেছে প্রায় ৩০ কোটি টাকার মত। সর্বশেষ ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে মিলেছে ২ কোটা ৮২ লাখ টাকা। এরই মধ্যে এসব অর্থ ছয়টি খাতে ব্যয় করেছে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এতে বদলে গেছে এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনজীবন। গতি এসেছে অর্থনীতিতে।