মফস্বল সাংবাদিকতা ও আমলা

আপডেট: জুলাই ৯, ২০২০, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


সাংবাদিক যখন কোনো ব্যক্তি গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লেখেন তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। প্রতিপক্ষ যদি ভদ্র হন আইন মেনে চলেন তাহলে তারা প্রথমে সংবাদের প্রতিবাদ করেন। তাতে সন্তুষ্ট না হলে মানহানির মামলা করেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ যদি শক্তিশালী প্রভাবশালী ক্ষমতাধর হন এবং তার গুণ্ডাবাহিনী থাকে তাহলে সাংবাদিককে নিপীড়ন, নির্যাতন এমনকি গুম ও হত্যা পর্যন্ত করেন। আর প্রতিপক্ষ যদি প্রশাসন ও পুলিশ হয় তবে তাদের মধ্যে কূটবুদ্ধিসম্পন্ন অফিসাররা মাদক মামলা, অস্ত্র মামলাসহ তাদের হাতে যত ক্ষমতা আছে তার কোনোটাই প্রয়োগ করতে কুণ্ঠিত হন না। এমন ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। তাই সাংবাদিকদের নির্যাতনের ইতিহাস লিখে শেষ করা যাবে না। অন্যদিকে আছে রাষ্ট্রীয় ৫৭ ধারার চাবুক। এতো ঝুঁকির পরেও সাংবাদিকরা লেখা বন্ধ করেন নি। যার যতোটুকু দায়িত্ববোধ আছে সেখান থেকেই লেখা অব্যাহত রেখেছেন।

এতো প্রতিকূল অবস্থা বিরাজমান থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকরা কিসের মোহে প্রভাবশালী ক্ষমতাধরদের প্রতিপক্ষ হতে যান, তাদের কুকর্ম ও অপরাধ খুঁজে বেড়ান সেটি একটি বড় জিজ্ঞাস্য। তারা কি এ কাজের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত বা কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার নিয়োগপ্রাপ্ত? হলেনই বা নিয়োগপ্রাপ্ত। কিন্তু তিনি তো দিব্যি তাদের উন্নয়নের সংবাদ লিখেই শেষ করতে পারবে না। খামখা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে যাওয়ার কী প্রয়োজন? নাম, যশ, খ্যাতি প্রতিপত্তি, অর্থাপ্রাপ্তি? এক কথায় এর উত্তর নেই। তবে উল্লিখিত প্রাপ্তিগুলোর একটিও নয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করি সেই মোহটি হচ্ছে নৈতিকতা, অন্যায়ের কাছে অবনত না হয়ে লড়াই করার বাসনা। তবে যারা ক্ষমতাধরদের সাথে মিলেমিশে চলেন তাদের কথা বলছি না। আমি তাদের কথাই বলছি যারা নৈতিক বোধসম্পন্ন। যারা বিবেকের কাছে বাঁধা আছেন। তারা সংখ্যায় যদি নগণ্য হয় তবুও তারাই ক্ষমতাধরদের ও তাদের কৃত অপরাধের মুখোশ উম্মোচন করেন। তারাই সমাজকে উজ্জীবিত রেখেছেন, ভালো মন্দের পার্থক্য স্পষ্ট করছেন প্রতিনিয়ত, সমাজকে গতিশীল করে রেখেছেন। মিডিয়া আর সাংবাদিক যদি না থাকতো তবে সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারতো না জগৎ সাংসারে কিছু ঘটছে। যা কিছু স্বচক্ষে দেখতো সেটাই স্বাভাবিক বলে মনে করতো। ন্যায় আর অন্যায়ের ফারাক বুঝতে পারতো না। তাই গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় মিডিয়া ও সাংবাদিকের উপস্থিতি অপরিহার্য। সাংবাদিক আছে বলেই ভালো-মন্দ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মতামত যাচাই হয়, অপরাধ গোপন করার সুযোগ থাকে না। দেশে দেশে সরকারগুলো সাংবাদিকের কলমকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য হাজারো রকমের আইন জারি করে সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, সাংবাদিক নির্যাতন করছে। কিন্তু তার পরেও লেখনি বন্ধ হচ্ছে না। মিডিয়াগুলো চেষ্টা করে যেন ক্ষমতাধরদের রোষের শিকার হতে না হয়। কিন্তু সত্য যখন শক্তভাবে সামনে এসে দাঁড়ায় তখন মিডিয়াগুলো বাধ্য হয় সত্য প্রকাশে ও সত্য উদঘাটনে।

 

প্রসঙ্গক্রমে কয়েকটি কথা বলে রাখি। যখন মফস্বল শহরগুলোতে কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ডিসি, টিএনও, পুলিশ সুপার, সদ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ স্থানীয় সাংবাদিকদের সৌজন্য সাক্ষাৎ বা মতবিনিময় সভা আহ্বান করেন। তখন তারা সাংবাদিকদের খুশি করার জন্যই হোক বা উৎসাহিত করার জন্যই হোক বা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই হোক- বলেন, সাংবাদিকরা সমাজের দর্পন বা বিবেক। যাবতীয় ভালো কর্ম করার দায়িত্ব তাদের। তারপর সারা বছর আর ওই বিবেকদের প্রয়োজন হয় না তাদের। এ সংস্কৃতি বহুকাল ধরেই চলে আসছে। বিবেক একটু এদিক ওদিক হলে তারা স্টিম রোলার চালাতে একটু কুণ্ঠিত হন না। একদিন এমন এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বলেছিলাম, শুধু সাংবাদিকরাই সমাজের বিবেক। আর আপনারা বড় বড় কর্মকর্তা জনপ্রতিনিধিরা কি অবিবেক? ওই বিবেকের লাইসেন্সটা শুধু সাংবাদিকদের না দিয়ে আপনারাও গ্রহণ করুণ- সমাজটা এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে। এমন উত্তরে তারা অপ্রস্তুত হয়েছিলেন। প্রতি উত্তরে কিছু বলতে পারেন নি। মাঝে মাঝে কিছু চামচা শ্রেণির লোকদের বলতে শুনি এরা তো সাংবাদিক নয়, সাংঘাতিক। নিশ্চিতভাবে বুঝে নিবেন ওই চামচা কোনো না কোনো সময়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে।

 

শুরু করেছিলাম সাংবাদিকদের নির্যাতনের বিষয় নিয়ে। তাই বলে রাখি যে, নির্যাতিত সাংবাদিকদের ৮০/৯০ ভাগই মফস্বলের। সাম্প্রতিককালে এমন একটি ঘটনা পত্রিকায় এসেছে। গত ৫ জুলাই দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায়। খবরটির শিরোনাম ছিলো “সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট”। কুড়িগ্রামে মধ্যরাতে সাংবাদিক আটক ও সাজাদানকারী ভ্রাম্যমান আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট বলেছেন, তিনি সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছেন। গভীর রাতে আরডিসি নাজিম উদ্দিন জেলা প্রশাসকের নির্দেশের দোহাই দিয়ে তাকে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেন। প্রায় ১৮ ঘণ্টা পরে প্রসিকিউশন পক্ষকে ডিসি অফিসে ডেকে এনে নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়। বিভাগীয় মামলায় অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে উল্লিখিত ভ্রাম্যমান আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রট রিন্টু বিকাশ চাকমা এ সব কথা বলেছেন। জানা যায়, ১৪ মার্চ গভীর রাতে নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তাকে ধরে নিয়ে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত এক বছরের কারাদণ্ড দেয়। তার বাড়িতে আধ বোতল মদ ও গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং দেশি বিদেশি গণমাধ্যমে এ ঘটনা ফলাও করে প্রচার হয়।

 

অন্যদিকে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের আত্মীয় স্বজন, অন্যান্য সাংবাদিক ও বহিরাগত লোকজন ডিসি অফিসে উপস্থিত হলে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং ঘটনার বিভাগীয় তদন্তসহ বিচার দাবি করা হয়। প্রেক্ষিতে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভিন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন ও ২ জন সহকারী কমিশনার এসএম রাহাতুল ইসলাম ও মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমাকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু পুরো মাদক মামলার বিষয়টির নাটের গুরু জেলা প্রশাসকের অনুগত আরডিসি নাজিম উদ্দিন পরিচালনা করেন। আর সাংবাদিক আরিফুলের বিরুদ্ধে এ সব ষড়যন্ত্রের কারণ হচ্ছে জেলা প্রশাসকের অনিয়মের বিরুদ্ধে আরিফুলের রিপোর্টিং। পরবর্তীতে রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার এর তদন্ত প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে বিভাগীয় মামলা করা হলেও প্রশাসনের প্রতি জনসাধরণের বিশ^াসের জায়গাটুকু নড়বড়ে হয়ে গেছে। আর এমন অসংখ্য ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।

 

এই ঘটনার সাথে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা যোগ করি। প্রায় ২৯ বছর আগে ১৯৯১ সালে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর গম ৪টি ভ্যানে ২০ বস্তা উপজেলা গুদাম থেকে জনৈক ব্যবসায়ীর দোকানে যাওয়ার প্রাক্কালে ছাত্ররা আটক করে থানায় নিয়ে যায় এবং শেষ অবধি একটা মামলাও হয়। পত্র-পত্রিকায় নিউজ হয়। বেকায়দায় পড়েন জেলা প্রশাসক। এ সময় প্রথম আলোর সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন দিলু এ সম্পর্কিত আরো তথ্য নেওয়ার জন্য টিএনও অফিসে যান। কিন্তু তাকে তথ্য না দিয়ে দুর্ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দানের অভিযোগে তৎকালীন টিএনও কর্তৃক এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেফতার করে জেল-হাজতে পাঠানো হয়। এই অন্যায় ও মিথ্যা মামলা এবং গ্রেফতারের প্রতিবাদে আমার আহ্বানে আন্দোলনে নামে স্থানীয় সাংবাদিকরা। স্মারকলিপি দেওয়া হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। এ ছাড়া ডিসির আরো অনিয়ম ও দুর্নীতির নিউজ চলতে থাকে। ডিসি আশরাফ আলী ভীষণ ক্ষিপ্ত হলেন আমার উপর। যেহেতু আমার নেতৃত্বে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিলাম। ডিসির প্রচণ্ড আক্রোশের শিকার হলাম আমি। ডিসি মার্কেটের একটি দোকান ৫০ হাজার টাকায় আমার নামে বরাদ্দের অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিলো সেটা প্রথমে তিনি বাতিল করলেন। এরপর ওই মার্কেটের তত্ত্বাবধায়ক কমিটিতে আমার সদস্যপদ বাতিল করলেন। এরপর আমার নিউজপ্রিন্টের ডিলারশিপ বাতিল করলেন। এরপর আমার দাদার (ভারতবাসী) নামীয় সম্পত্তির অংশ বিশেষ শুত্রু সম্পত্তি তালিকাভুক্তির সুযোগে আমার বাবার বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা দিলেন দুর্নীতি দমন বিভাগে এবং সর্বশেষ ওই জমি জনৈক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের নামে লিজ দিয়ে আমাকে রক্তাক্ত পথে ঠেলে দিলেন। অবশেষে তিনি সব মামলাতেই হেরে যান। এ ঘটনার আদ্যপান্ত আমার লেখা “সাংবাদিকতার ত্রিশ বছর” গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে।

 

আমার প্রশ্ন হচ্ছে একজন সাংবাদিককে বিনা অপরাধে একজন আমলা একাধিক মিথ্যা ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দিয়ে আর্থিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যন্ত করে ক্ষমতার যে অপব্যবহার করলেন তার বিচার হলো কি? একইভাবে কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের আমলারা মিথ্যা মাদক মামলা দিয়ে তার জীবনকে দুর্বিসহ করা যে ভয়ানক অপরাধ করা হয়েছে তার বিচার কি ওএসডি আর বদলী? চাকরি তো কারো যাবে না। তাহলে প্রকৃত বিচার হলো না তো। যদি একই কাজটা সাংবাদিক করতো তাহলে আমলারা তাকে জেল খাটিয়ে ছেড়ে দিতো।