মরার আগেই মৃত্যু নয়

আপডেট: অক্টোবর ২৬, ২০১৯, ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ

মো. সামিউল আলম


হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে যুবক, হাতে হ্যান্ডকাফ। লালিত স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার কষ্টে বাকরুদ্ধ মা। ঝাপসা চোখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বেঁচে থেকেও দুর্গন্ধ লাশে পরিণত সন্তানের আগামী আর কতটা করুণ হতে পারে এই ভেবে বুকের ভিতরে কেমন যেন এক অদ্ভুত বাথার স্রোত বয়ে যাচ্ছে।
স্বামী মারা যাওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ভালই কাটছিল। ছেলেটাও বেশ মেধাবী, গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তারপরই কেমন যেন একটা পরিবর্তন, কথা কম বলে, অল্পতেই রেগে যায়, টাকার চাহিদা বেড়ে যায়। আজ এ বাহনা, কাল ওবাহানা করে টাকা আবদার করে। রাতে জেগে থাকে, দুপুর পর্যন্ত ঘুমায়। এক সময় মা জানতে পারে তার সন্তান নেশাগ্রস্ত। আর আজ ছিনতাই করতে যেয়ে গণপিটুনি খেয়ে পুলিশের হাতে বন্দি হয়ে হাসপাতালে।
মাদক- একটি অভিশাপ, যা শুধুই অপরাধের জন্ম দেয়। জীবন থেকে জীবন কেড়ে নেয়। ডেকে আনে ধ্বংস। মাদকের ভয়াল থাবা এখন আলোকিত নগরীর সীমা পেরিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে। মাদকের বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও অমিত সম্ভাবনা। যুগ পরম্পরায় ন্যায়, সত্য, উন্নয়নের জন্য জীবন উৎসর্গ করে, নতুন জীবনের বাণী রচনাকারী এই তরুণ প্রজন্মই আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
বন্ধু-বান্ধবের প্ররোচনায় বিড়ি-সিগারেটের মাধ্যমে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে মাদকে আসক্তি। পরিণতিতে মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ী, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা কাজে তাদের ব্যবহার করতে থাকে। মাদকের এই নেশার জালে একবার জড়িয়ে পড়লে কেউ আর সহজে এই জাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে মাদকসেবীরা দিনে দিনে আরোও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে কিশোর সন্ত্রাসীর ক্রম বর্ধমান দাপটের যে তথ্য সম্প্রতি পাওয়া যায় তার মূল কারণ সম্ভবত মাদক।
সারা বিশ্বেই মাদকের অপব্যবহার বহুমাত্রিক সমস্যা সৃষ্টি করছে। এটি সরাসরি একটি দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক নানা বিষয়কে প্রভাবিত করে, বাড়িয়ে তোলে অপরাধ প্রবণতা। কারণ নিষিদ্ধ জগতে অস্ত্রের পরেই মাদক সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। বাংলাদেশে সাধারণত মাদকদ্রব্য উৎপাদিত হয় না। শুধু ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ সব ধরনের মাদক চোরাচালান এবং মাদকদ্রব্য পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙ্গে যাওয়া, মাতা-পিতার কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়া, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দাম্পত্য কলহ, অর্থনেতিক সংকট, হতাশা, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের স্খলন, বন্ধুদের চাপে এবং মাদক গ্রহণের মাধ্যমে স্মার্ট হওয়ার প্রবণতা, এন্টি সোসাল পারসনালিটি, মানসিক সমস্যা প্রভৃতি কারণে মাদকাসক্তির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া ইন্টারনেট ও ইনফরমেশন টেকনোলজির অপবব্যবহার এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবেও মাদকের অপব্যবহার বাড়ছে।
মাদক গ্রহণ সমস্যা যত না সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক। অনেকে বিষণ্নতার অজুহাতে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে। মাদক বিষণ্নতা নিরাময়ের কোনো টনিক নয়; বরং বিষণ্নতাকে আরো বিষিয়ে দেয় । বাস্তবতার নিরিখে যেটা দেখা যায়, মাদকের ছোবল সাপের চেয়েও ভয়ঙ্কর। কারণ মাদক জীবন থেকে জীবন কেড়ে নেয়। মাদকের ছোবলে একবার দংশিত হলে সুস্থ হওয়ার আশা সুদূর পরাহত। সঠিক চিকিৎসা ও প্রচণ্ড আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ ছাড়া মাদকের মায়াজাল থেকে বের হতে পারে না।
মাদক এখন কেবল নগরকেন্দ্রিক ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির সমস্যা নয়; মাদকের বিস্তার ঘটেছে শহর-গ্রাম এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মাঝেও। অধিকাংশ স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাদকের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা না ভেবেই বা না জেনেই মাদক গ্রহণ শুরু করে। তারা জানে না, আসক্তি ও নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হয়ে গেলে মাদক প্রত্যাহার সহজ নয় এবং মাদক প্রত্যাহারের মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। তাই উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন বা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পর্যাপ্ত ধারণা দেয়া আবশ্যক। পিতামাতা বা অভিভাবকের অবশ্যই জানতে হবে, তার সন্তান কোন ধরনের বন্ধু-বান্ধব, সঙ্গী-সাথি গ্রহণ করছে। তাদের কাজকর্মের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কেও খেয়াল রাখতে হবে; বাড়াতে হবে ধর্মীয় মূল্যবোধ। বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম সকল প্রকার মাদক তথা নেশাজাতীয় দ্রব্য হারাম ঘোষণা করেছে । অর্থাৎ ধর্মীয় আদর্শ ও মূল্যবোধের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে প্রচার-প্রচারণায় আনতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুবকদের বেশি বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়েছে তাদেরও সহানুভূতির দৃষ্টি দিয়ে সুস্থধারায় ফিরে আনতে হবে। বাড়াতে হবে মাদক নিরাময় কেন্দ্র।
মাদকমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এই শতাব্দীর কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে মাদক ও মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব আরো ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই জরুরি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। চোরাচালান বন্ধের জন্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা দরকার। পাশাপাশি দেশেও যাতে কোনো ধরনের মাদকদ্রব্য উৎপাদিত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকার মাদকের ভয়াবহতা রোধকল্পে সংকল্পবদ্ধ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের ফলে বর্তমানে মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসকল অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী এবং তাদের অনেক গডফাদাররাই আটক হয়েছে ও কয়েকজন অভিযান পরিচালনাকালে নিহত হয়েছে।
সর্বোপরি মাদকাসক্তি একটি সামাজিক সমস্যা, সামাজিক ব্যাধি। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমেই এ সমস্যা নির্মূল করতে হবে। আমরা যে যার অবস্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই কেবল এটা সম্ভব। এটা আমাদের করতেই হবে, কারণ এ সমাজে বাস করবে আমার, আপনার সন্তান। আমাদের সন্তানদের জন্য সুন্দর আগামী আমাদেরই সৃষ্টি করতে হবে।
লেখক: তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী।