মল্লিকার বিয়ে

আপডেট: এপ্রিল ১৬, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

সিরাজুম মুনির জয়:


সকালের সোনারোদ এসে পড়তেই শানাই-এর সুর ছড়িয়ে পড়লো দিকদ্বিক। বিসমিল্লা খাঁ সাহেবের শানাই। সুরের ইন্দ্রজাল ঘেরা মোহনীয় বিশাল মল্লিক বাড়ি। ঝাঁ চক্চক্ নিকোনো উঠনের এক কোণে শানাই বেজে চলেছে বড় আধুনিক ডেকসেটে। আজ যে মল্লিকার বিয়ে! বিশিষ্ট কাপড় ব্যবসায়ী মল্লিক আহমদের একমাত্র আদুরে কন্যা। শহরে পেল্লাই সাইজের পাঁচ পাঁচটি কাপড়ের দোকান তার। জনা ত্রিশেক মানুষ নিত্য খাটে সেখানে। তিনবিঘা ঘেসো জমির ওপর আলিশান দোতলা বাড়ি। বিয়ের কারণে নতুন রঙের পোঁচ পড়েছে তাতে। সেই সাথে চোখ ধাঁধাঁনো বাহারি আলোকসজ্জা। সব মিলিয়ে একেবারে এলাহী কা-। মল্লিকার আছে রূপ সেই সাথে বিদ্যেও। পড়াশোনাটা সেরেছে এলাকারই সরকারি কলেজে। ইংরেজিতে মাষ্টার্স দিতে না দিতেই বিয়ের ফুল ফুটলো। পাত্র বিস্তর টাকা-পয়সা ওয়ালা। বনেদি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। লেখাপড়াতে একটু পিছিয়ে থাকলেও শহরে তার বিশাল আড়তদারী। তার লেখাপড়ার দৌড় অনার্স পর্যন্তই। মল্লিক সাহেব এটাকে তেমন আমলেই নেননি। তার এককথা-‘আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলে মেয়ের সুখ আসবে কি করে?’ বড় আদরের ধন মল্লিকা। ছেলে বলো মেয়ে বলো তার ওই একজনই। কোকিলের কুহুতানে খেলতে খেলতে কখন যেন মল্লিকা পেরিয়েছে তার জীবনের পঁচিশটি কনক বসন্ত তা বুঝতেই পারেনি। মল্লিক বাড়ির উত্তর দিকে দোতলার বড় কামরা ফুলে ফুলে সাজানো। তাতেই কনের সাজে বসে আছে মল্লিকা। সোনায় মোড়ান শুভ্র অঙ্গ। বিয়ের সাজে অপরূপ লাগছে। দামী বেনারসীর ভাঁজে ভাঁজে আভিজাত্য যেন ঠিক্রে পড়ছে। মল্লিকার চারপাশ তার খেলার সাথি-বান্ধবিতে ঘেরা। খিল খিল হাসির দমক উঠছে থেকে থেকে। সবাই মল্লিকায় মাতোয়ারা। ইয়ার্কি, হাসি-ঠাট্টা-তামাসা সবই চলছে সমানে। মল্লিকার তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। দু’চোখ স্বপ্নাতুর। বরের সাজে হয়তো আর একটু পরেই এসে পড়বে মাসুদ। প্রথম দেখাতেই পছন্দ। যদিও মাসুদের বাবরী কেশের ফাঁকগলে এক চিলতে টাকের উঁকিঝুঁকি আছে। গায়ের শ্যামলা। উচ্চতাও যে আহামরী তেমন কিছু না। তবে ঠোঁটের কোণের ছড়ান মিষ্টি হাসি তা সত্যি ঘায়ের করতে পারে অনেককে। আর তাতেই পটে গেল মল্লিকা। মাসুদও মা-বাবা’র একমাত্র সন্তান। আর্থিক অবস্থা খুব ভালো। মল্লিকাকে ও সুখী করতে পারবে নিশ্চয়ই। মল্লিকা সহজ-সরল মেেেয়। ওর চাওয়া-পাওয়া খুব সামান্যই। মল্লিকার কানে বান্ধবীদের খুনসুটি ঢুকছে না যেন কারণ ও তো মাসুদের ভাবনায় বিভোর। এইতো সেদিন পড়ন্ত বিকেলে মাসুদের বাড়ি থেকে লোকজন এসে দেখে গেলো মল্লিকাকে। সোনার ওপর কারুকাজ করা গোলাপী মুক্তোর আট আনা ওজনের চমৎকার আংটি পরিয়ে দিয়ে গেল মাসুদের বাবা। মল্লিকার মনের ক্যানভাসে এখন দোলা দিচ্ছে ও সবই। এদিকে মল্লিক সাহেব ভীষণ ব্যাস্ত। গাঁয়ের সবাই নিমন্ত্রিত। বড়সর আয়োজন। চারটা বড় গরু আর গোটা দশেক রাম-খাসী জবাই হয়েছে। রান্নাও প্রায় শেষ হয়ে এলো। নিবিড় তদারকীতে মল্লিক সাহেব। ডেক্চিতে ডেক্চিতে মাংস পোলাও আর জর্দা পোলাওয়ের সুঘ্রাণ। মল্লিক বাড়ির সামনে বিশাল প্যান্ডেল। ওপরে ত্রিপল দিয়ে ঢাকা তার নিচে বেশ পরিপাটি করে টেবিল-চেয়ার সাজানো। অতিথির খাওয়ার আয়োজন সুসম্পন্ন হয়েছে। এখন বরসহ বরযাত্রী এসে পড়লেই হল। এদিকে বেলা গড়িয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় প্রায় একটা ছুঁই-ছুঁই।

মল্লিক সাহেব মুঠোফোনে বরযাত্রীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন ঘন ঘন। সাতটা মাইক্রো, দু’টা যাত্রিবাহী বড় বাস আর একটি ট্যাক্সি সমেত ওরা রওনা দিয়েছে। পথতো বেশি দূরের না এই প্রায় চল্লিশ কিলো রাস্তা হবে। ওরা এই এসে পড়লো বলে। দুটি তোরণসহ অনিন্দ্য সুন্দর একটা গেট সাজানো হয়েছে। তার পাশে জনা চল্লিশেক যুবক-যুবতীর হল্লা। গেট ধরার আয়োজনে তারা ব্যতিব্যাস্ত সবাই। এমন সময় মল্লিক সাহেবের মুঠোফোন বেজে উঠলো। ফোন ধরেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। কথা বেরুচ্ছেনা যেন মল্লিক সাহেবের। চাঁপা আর্তস্বরে শুধু বলতে পারলেন-হায়! সবশেষ। একি হল আমার? হায় আল্লাহ্ গো।

তাড়াতাড়ি তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন সেট ছিনিয়ে নিলেন মল্লিকার ছোট চাচা। কি হয়েছে জানার চেষ্টা আর কি। ওপাশ থেকে জানাগেল বর মাসুদের ট্যাক্সি দুর্ঘটনায় কবলিত। মাসুদ স্পট ডেড! হায় হায় রোল পড়লো চারদিকে। সহসা থেমে গেল শানাই-এর সুর। গোটা মল্লিক বাড়িতে পিন পতন নীরবতা। যেন কালবোশেখির আঘাতে সাজানো বাগান ল-ভ-। মল্লিকার মার আহাজারিতে সবাই স্তব্ধ। বার বার মূর্চ্ছা যাচ্ছে মল্লিকা। তার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গের। গোটা গ্রাম মুহূর্তে শোকে মুহ্যমান। মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে এলো মল্লিক বাড়ির আকাশ-বাতাস।